দিবারাত্রির প্রহরী।
কিন্তু উর্দি পরে বন্দুক ঘাড়ে করে দিবারা কেউ তো একটানা টহল দিতে পারে না। এমন বোকা প্ৰভাস নয় যে, এরকম অসম্ভব প্রস্তাব করবে।
দিবারাত্রির প্রহরী মানে চব্বিশ ঘণ্টা এ-বাড়িতেই সে থাকবে সতর্ক হয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকবে।
রাত্রে টহল। দিনে শুধু সতর্ক ও প্রস্তুত হয়ে থাকা।
শরীরের প্রাকৃতিক ক্ৰিয়াকৰ্মাদি চালাবে বৈকি, নেয়ে খেয়ে ঘুমোবে বৈকি, ইচ্ছা হলে অল্পক্ষণের জন্য বাড়িতে গিয়ে ঘুরেও আসতে পারবে বৈকি, কিন্তু দিনের বেলায় সর্বক্ষণ তাকে রেডি হয়ে থাকতে হবে।
দিনের বেলা কিংবা প্রথম রাত্রে অবশ্য গুণ্ডা ডাকাতের অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কা একরকম নেই বললেই চলে। প্রভাসের বাড়িতে অনেক লোক। লাঠিসোটা বর্শা বল্লম বন্দুক ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্রেরও অভাব নেই।
সারা বাড়িটা যখন জেগে আছে তখন হঠাৎ হানা দেবার মতো গুণ্ডা বা ডাকাতের দল রবার্টসন জগৎ খুঁজে পাবে না।
হতাশায় মরিয়া কিছু বাজে লোককে পেতে পারে, তাতে প্রভাস ডরায় না। বন্দুকও দরকার হবে না, চাকর দারোয়ান ভাগে ভাইপোরা লাঠিসোটা নিয়ে হৈহৈ করে বেরোলেই ওরা লেজ গুটিয়ে পালাবে।
তবু ঈশ্বর প্রস্তুত হয়ে থাকবে, সর্বক্ষণ বন্দুক সঙ্গে রাখবে। যেখানে যে অবস্থাতেই থাক, যেন ডাকামাত্র এসে অব্যর্থ লক্ষ্যে ঘায়েল করতে পারে হানাদারদের।
ঈশ্বর সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, দু-চারজনকে মারলে আমার ফাঁসি হবে না তো?
প্রভাস হেসে বলে, ফাসি হলে আমার হবে, তোর হবে কেন? অফিসারের হুকুম মতো পুলিশেরা যে গুলি চালায়, সেজন্যে কি পুলিশেরা দায়িক হয়?
সুযোগ পেলেই ঈশ্বর ঘরে আসে। যতক্ষণ পারে থেকে যায়।
দিনে তো আসেই, প্রভাস মদ খেয়ে এমনভাবে জ্ঞান হারিয়েছে যে, পরদিন বেলা নটা–দশটার আগে তার ঘুম ভাঙার সম্ভাবনা নেই জানতে পারলে রাত্রিটাও ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে আসে।
বিবেক আর কামড়ায় না।
এটা বিশ্বাসঘাতকতা নয়।
সে মনেপ্রাণে জানে যে, প্রভাসের আতঙ্ক অলীক। রবার্টসন আর কোনোদিনই গুণ্ডা ডাকাতের দল পাঠিয়ে তাকে ঘায়েল করার কথা কল্পনাও করবে না।
যদি তাকে জব্দ করতে কি মারতে চায়, অন্যভাবে করবে।
০৯. মাঝরাত্রি পার হয়ে গিয়েছে
মাঝরাত্রি পার হয়ে গিয়েছে।
আকাশে সঞ্চারিত পুঞ্জ পুঞ্জ শরতের মেঘের গর্জন মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে।
কে জানে বর্ষণ হবে কিনা।
বন্দুক ঘাড়ে ফটকে টহল দিতে দিতে আবার ঈশ্বর ফটকের সামনে শান-বাঁধানো সিংহমুখী লম্বা চকে হেলান দিয়ে বসে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়।
তারপর ঝিমোতে শুরু করে।
বিপদটা একেবারে অঘঘারে ঘুমিয়ে পড়ার। নইলে বড় বৈঠকখানায় প্রভাসের নাচগান হৈ-হুল্লোড়ের আসর জমে উঠবার পর সে অনায়াসে নাক ডাকিয়ে কয়েক ঘণ্টা আরামে ঘুমিয়ে নিতে পারে আসর ভাঙার সময় পর্যন্ত।
আলো নেভানো গাড়ি কটার ড্রাইভারেরা যেমন মজা করে নাক ডাকাচ্ছে। ওদের মতো তার ভাগ্যেও আজ অবশ্য জুটেছে পেটতরা মণ্ডা পোলাও ওসব ভরপেট খাওয়ার জন্যেই কি এত ঘুম পাচ্ছে? একেবারেই তো অভ্যেস নেই, পেটের ভার কি ভারি করে দিয়েছে ঘুমকে?
কী উদ্দাম হয়েই না উঠেছে আজ প্রভাসের সবান্ধব সপার্ষদ নাচগানের আসরটা! কলকাতা থেকে এসেছে নাম করা বাঈজী!
নাচগানের পার্ট নিয়ে সে নাকি দু-তিনটে সিনেমাতে নেমেছে।
গাঁয়ের লোকের জানার কথা নয়, তবু কি করে যে চারিদিকে জানাজানি হয়ে যায়!
শুধু তাকে দেখবার জন্য দুপুরের দিকে প্রভাসের বাড়ির গেটে রীতিমতো একটা ভিড় জমে উঠেছিল।
বিকালের দিকে ঘন হয়ে আকাশে মেঘ জমবার পর ভিড়টা ভেঙে গিয়েছে।
হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।
প্রভাসের আজ জন্মদিন।
কে জানে আজ কখন ভাঙবে আসর–কখন সে নিশ্চিন্ত মনে এই শান-বাঁধানো চকে বন্দুকটা পাশে নিয়ে লম্বা হয়ে নাক ডাকতে পারবে অন্দরে বাবুর নেশার ঘোরে সেভেসানি নাক ডাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
বড় বৈঠকখানায় হৈ-হুল্লোড় থেমে গিয়ে আবার সঙ্গতের সঙ্গে মেয়েলি সরু গলার গানের তালে ঘুঙুরের আওয়াজ ভেসে আসে।
একটু ঝিমঝিম ভাবের মধ্যে ঈশ্বর যেন শুনতে পায় তার কচি বাচ্চাটার আরো সরু আরো ঝঙ্কারময় আওয়াজ!
দেড় মাইল দূরের ঘর থেকে তার বাচ্চাটা যেন কলকাতার বাঈজীর গলার রেডিও মারফত সরু গলার কান্না শুনিয়ে তাকে জানিয়ে দিচ্ছে–আমি জ্যান্ত আছি, জ্বরে এখনো মরে যাই নি!
ঘুমিয়ে পড়তে হয় না, শ্রান্তিতে ঝিমোতে ঝিমোতে আধা-সচেতনভাবে স্বপ্ন দেখা যায়। পুরোনো জীর্ণ ঘরটা ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সে স্পষ্ট দেখতে পায় খাটে মা আর পিসি শুয়েছে, মেঝেতে বাচ্চাটাকে পাশে নিয়ে শুয়েছে গৌরী!
বাচ্চাটা চেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কেঁদে উঠছে, গৌরী শীৰ্ণ বুকের প্রায় দুধহীন মাই খুঁজে দিচ্ছে তার মুখে।
স্বপ্ন ছাড়া কি? যে ঘরে এখন মেঘ ঢাকা আকাশের রাত্রির ঘন অন্ধকার সেই ঘরের মধ্যে নইলে মাকে, পিসিকে, গৌরী আর বাচ্চাটাকে এত স্পষ্টভাবে সে দেখতে পায়!
ঝিম টুটে যায় চমক লেগে। বড় বৈঠকখানার নাচগান, হট্টগোলের ফুর্তির আসর ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়ে উঠেছে চিৎকার আর গণ্ডগোল।
এক নিমেষে সজাগ হয়ে তোক করে লাফিয়ে উঠে ঈশ্বর টহল শুরু করে। স্বয়ং প্রভাস টলতে উলতে বাইরের বারান্দায় এসে হেঁড়ে গলায় জড়ানো সুরে হাঁকে, ঈশ্বর! এই ঈশ্বর!
ঈশ্বর ছুটে যায়।
আমার সাথে আয়।
বড় বৈঠকখানার দরজায় গিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বেশিরকম বাবু সাজের মাঝ বয়সী একজনকে দেখিয়ে জড়ানো গলায় প্রভাস হুকুম করে, তা কর–এক গুলিতে মারা চাই কিন্তু হারামজাদা! নইলে তাকে আমি–
