‘কি হয়েছিল?’ হেরম্ব জিজ্ঞাসা করল।
’শুনে অবিচার করবেন না। আমাকে ছাদে ডেকে নিয়ে যাবার সময় ওর কোনো মতলব ছিল। না, শুধু ছেলেমানুষি খেয়াল। আমাকে ধারে দাঁড়াতে দেখে লোভ সামলাতে পারে নি। হঠাৎ ‘সুপ্রিয়া’ বলে চেঁচিয়ে ধাঁ করে আমায় জড়িয়ে ধরলে। আর একটু হলেই দুজনে একসঙ্গে—’
‘তোর কথা আমি বিশ্বাস করি না, সুপ্রিয়া!’
সুপ্রিয়া কোনোদিন কলহ করে নি, আজো করল না। তার চোখে শুধু জল এল। হেরম্ব একটু মুগ্ধ হয়ে বল, ‘তুই ইচ্ছে করে মিথ্যে বলেছিস, তা বলছি না, সুপ্রিয়া। তুই বুঝতে পারিস নি।‘
‘আমি কিছুই বুঝতে পারি না।’
হেরম্ব খানিকক্ষণ স্তব্ধ থেকে বলল, ‘ঝড়বাদলে খোলা ছাদে তোকে কাছে পেয়ে হঠাৎ মনের আবেগে–’
সুপ্রিয়া হাত বাড়িয়ে হেরম্বের পা ছুঁয়ে বলল, ‘বিশ্লেষণ করবেন না, আপনার পায়ে পড়ি। আবেগ!—আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো আবেগ গড়িয়ে পড়ছে।’
হেরম্ব আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘তুই বুঝি আবেগে বিশ্বাস করিস না, সুপ্রিয়া?’
সুপ্রিয়া জবাব না দিয়ে চোখ মুছে ফেলল।
এরা কেউ বিশ্লেষণ ভালবাসে না, সুপ্রিয়াও নয়, আনন্দও নয়। তার একি অভিশাপ যে, এরা কেন বিশ্লেষণ ভালবাসে না বসে বসে তাও বিশ্লেষণ করতে ইচ্ছা হয়? একি জ্ঞানের জন্য? নারীকে জেনে সে কি জীবনের নাড়িজ্ঞান আয়ত্ত করতে চায়? তার লাভ কি হবে? বরং আজ পর্যন্ত তার যা ক্ষতি হয়েছে তার তুলনা নেই। জীবনের সমস্ত সহজ উপভোগ তার বিষাক্ত বিস্বাদ হয়ে যায়।
সুপ্রিয়া তার মুখের ভাব লক্ষ করছিল। একটু ভয়ে ভয়ে বলল, ‘ওকে নামিয়ে আনবেন না? ভিজে ভিজে মারবে নাকি!’
‘না, সেটা ঘটতে দেওয়া উচিত হবে না।’ বলে হেরম্ব উঠে দাঁড়াল।
অশোককে নামিয়ে এনে স্নানাহার করতে বৃষ্টি থেমে গেল। হেরম্ব বিদায় নিল। বলে গেল বিকালে যদি পারে একবার আসবে সুপ্রিয়াকে যে সব জায়গা দেখিয়ে আনবার কথা আছে দেখিয়ে আনবে।
‘যদি পারি কেন?’
‘না পারলে কি করে আসব, সুপ্রিয়া?’
‘চারটের মধ্যে যদি না আসেন তাহলে ধরে নেব। আপনি আর এলেন না।’
‘যদি আসি চারটের মধ্যেই আসব।’
বাগানে ঢুকতেই আনন্দের দেখা পাওয়া গেল। সে রুদ্ধশ্বাসে বলল, ‘এত দেরি করলে! মা এদিকে ক্ষেপে গেছে।’
আনন্দ সংবাদটা এমনভাবে দিল যে হেরম্ব বুঝে নিল মালতীর ক্ষেপবার কারণ সুপ্রিয়ার সঙ্গে গিয়ে তার ফিরতে দেরি করা। সে রুক্ষম্বরে বলল, ‘ক্ষেপলে আমি কি করব?’
আনন্দ বলল, ‘মন্দির থেকে বাড়িতে এসে মা যেই দেখলে বাবা নেই, বাবার কম্বল, বই খাতা এসবও নেই, ঠিক যেন পাগল হয়ে গেল।’
হেরম্ব আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘মাস্টারমশায় গেলেন কোথায়?’
‘বাবা, চলে গেছে।’
‘কোথায় চলে গেছেন?’
আনন্দের চোখ ছলছল করে এল।
’তা জানিনে তো। তোমার কাছ থেকে যখন টাকা নিয়ে দিলাম তখন কিছু বললেন না। তোমরা চলে যাবার পর বাবা আমাকে ডেকে চুপিচুপি বললেন, আমি যাচ্ছি। আনন্দ, তোর মাকে বলিস না, গোল করবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় যােচ্ছ বাবা, কবে ফিরবে? বাবা জবাবে বললেন, সে সব কিছু ঠিক নেই। আমি বুঝতে পেরে কাঁদিতে লাগলাম।’
বলে আনন্দ চোখ মুছতে লাগল। হেরম্ব তাকে একটি সান্ত্বনার কথাও বলতে পারল না। বাতাসের নাড়া খেয়ে গাছের পাতা থেকে জল ঝরে পড়ছে, আনন্দ প্ৰায় ভিজে গিয়েছিল। তাকে সঙ্গে করে হেরম্ব ঘরে গেল। জানালা কেউ বন্ধ করে নি। বৃষ্টির জলে মেঝে ভেসে গিয়েছে। হেরম্বের বিছানাও ভিজোছে। বিছানাটা উল্টে নিয়ে হেরম্ব তোশকের নিচে পাতা শুকনো শতরঞ্জিতে বসল। বলার অপেক্ষা না রেখে আনন্দও তার গা ঘেঁষে বসে পড়ল। সে অল্প অল্প কাঁপছিল, জলে ভিজে কিনা বলবার উপায় নেই। হেরম্বের মনে হল, সান্ত্বনার জন্য যত নয়, নির্ভরতার জন্যই আনন্দ ব্যাকুল হয়েছে বেশি। এরকম মনে হওয়ার কোনো সঙ্গত কারণ ভেবে না পেয়ে হেরম্ব তাকে সত্ত্বনাও দিল না, নির্ভরতাও দিল না। সে বরাবর লক্ষ করেছে এরকম অবস্থায় ঠিকমতো না বুঝে কিছু করতে গেলে হিতে বিপরীত হয়।
আনন্দ বলল, ‘মা কি করেছে জােন? বাবাকে টাকা দিয়েছি বলে আমাকে মেরেছে।’ হেরম্বের দিকে পিছন ফিরে পিঠের কাপড় সে সরিয়ে দিল, ‘দ্যাখ কি রকম মেরেছে। এখনো ব্যথা কমে নি। ঘষা লেগে জ্বালা করে বলে জামা গায়ে দিতে পারি নি, শীত করছে, তবু। কি দিয়ে মেরেছে। জান? বাবার ভাঙা ছড়িটা দিয়ে।’
তার সমস্ত পিঠ জুড়ে সত্যই ছড়ির মোটা মোটা দাগ লাল হয়ে উঠেছে। হেরম্ব নিশ্বাস রোধ করে বলল, ‘তোমায় এমন করে মেরেছে!’
আনন্দ পিঠ ঢেকে দিয়ে বলল, ‘আরো মারত, পালিয়ে গেলাম বলে পারে নি। বৃষ্টির সময় মন্দিরে বসে ছিলাম। তুমি যত আসছিলে না, আমি একেবারে মরে যাচ্ছিলাম। তিনি বুঝি আসতে দেন নি, যাঁর সঙ্গে গেলে?’
‘হ্যাঁ, তার স্বামী আমাকে না খাইয়ে ছাড়লে না। পিঠে হাত বুলিয়ে দেব আনন্দ?’
‘না, জ্বালা করবে।’
হেরম্ব ব্যাকুল হয়ে বলল, ‘একটা কিছু করতে হবে তো, নইলে জ্বালা কমবে কেন? আচ্ছা! সেঁক দিলে হয় না?’–বলে হেরম্ব নিজেই আবার বলল, ‘তাতে কি হবে?’
‘এখন জ্বালা কমেছে।’
‘কমে নি, জ্বালা টের পাচ্ছ না। তোমার পিঠ অসাড় হয়ে গেছে। বরফ ঘষে দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হত।’
‘তা হত। কিন্তু বরফ নেই। তুমি বরং আস্তে আস্তে হাত বুলিয়েই দাও।’
‘বস, বরফ নিয়ে আসছি।’
আনন্দের প্রতিবাদ কানে না তুলে হেরম্ব চলে গেল। শহর পর্যন্ত হেঁটে যেতে হল। বরফ কিনে সে ফিরে এল গাড়িতে। আনন্দ ইতিমধ্যে মেঝের জল মুছে ভিজে বিছানা বদলে ফেলেছি। সে যে সোনার পুতুল নয় এই তার প্রমাণ।
