এত কষ্ট করে বরফ সংগ্রহ করে এনেও এক ঘণ্টার বেশি আনন্দের পিঠে ঘষে দেওয়া গোল না। বরফ বড় ঠাণ্ডা। আনন্দ চুপ করে শুয়ে রইল, হাত গুটিয়ে বসে রইল হেরম্ব। যে কোনো কারণেই হোক আনন্দকে মালতী যে এমনভাবে মারতে পারে সে যেন ভাবতেই পারছিল না।
মেঘ কেটে গিয়ে এখন আবার কড়া রোদ উঠেছে। পৃথিবীর উজ্জ্বল মূর্তি এখনো সিক্ত এবং নম। আনন্দকে শুয়ে থাকতে হুকুম দিয়ে হেরম্ব বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
মালতী কখন থেকে বারান্দায় এসে বসে ছিল। হেরম্বকে সে কাছে ডাকিল। হেরম্ব ফিরেও তাকাল না। মালতী টলতে টলতে কাছে এল। বেশ বোঝা যায়, মাত্রা রেখে আজ সে কারণ পান করে নি। কিন্তু নেশায় তার বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়েছে বলে মনে হল না।
‘সাড়া দাও না যে!’
‘কারণ আছে বৈকি।’
মালতী বোধহয় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। সেখানে দুপ করে বসল।—’শুনি, কারণটা শুনি।
‘সেটুকু বুঝবার শক্তি আপনার আছে, মালতী—বৌদি।’
মালতী এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেল। গলা যথাসাধ্য মোলায়েম করে বলল, ‘আর মালতী-বৌদি কেন, হেরম্ব?–কেমন খারাপ শোনায়। ভাবছি আজকালের মধ্যেই তোমাদের কষ্ঠিবদলটা সেরে দেব, আর দেরি করে লাভ কি? কঠিবদলে তোমার আপত্তি নেই তো? আপত্তি কোরো না হেরম্ব। আমরা বৈষ্ণব, তোমার মাস্টারমশায়ের সঙ্গে আমারও কঠিবদল হয়েছিল। তোমাদেরও তাই হোক, তারপর তুমি তোমার তিন আইন চার আইন যা খুশি কর, আমার দায়িত্ব নেই, ধর্মের কাছে আমি খালাস।’
সুপ্রিয়া যতদিন পুরীতে উপস্থিত আছে ততদিন এসব কিছু হওয়া সম্ভব নয়। সুপ্রিয়ার কাছে এখনো সে সেই ছ’মাসের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ, তার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া হয়ে যাওয়া দরকার। আনন্দকে চোখে দেখে গিয়েও সুপ্রিয়া তাকে রেহাই দেয় নি। স্পষ্টই বোঝা যায় সেকালের নবাব—বাদশার মতো সে যদি সুন্দরীদের একটি হারেমে রাখে, সুপ্রিয়া গ্রাহ্য করবে না, তার ভালবাসা পেলেই হল। এমন একদিন হয়তো ছিল যখন দেখা হওয়ামাত্র হেরম্ব সুপ্রিয়ার সঙ্গে তার সেই ছ’মাসের চুক্তি বাতিল করে দিতে পারত। এখন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিতে তার সময় লাগে। কষ্ঠিবদল কিছুদিন এখন স্থগিত না রেখে উপায় নেই।
শুনে মালতী সন্দিগ্ধ হয়ে কারণ জানতে চাইল। হেরম্ব সোজাসুজি মিথ্যা বলল। বলল যে, ‘পূৰ্ণিমা আসুক, আগামী পূর্ণিমায় না হয় হবে। ইতিমধ্যে অনাথ ফিরে আসতে পারে। অনাথের জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করা সঙ্গত নয় কি?’
মালতী সংগ্রহে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার কি মনে হয় হেরম্ব ও আর ফিরবে?’
‘ফিরতে পারেন। বৈকি।’
মালতী বিশ্বাস করল না।’না, সে আর ফিরছে না, হেরম্ব। মিনসে জন্মের মতো গেছে।’
হেরম্ব বলল, ‘নাও যেতে পারেন, হয়তো কালকেই তিনি ফিরে আসবেন। আনন্দকে মিছামিছি মেরেছেন।’
মালতী অল্প একটু গরম হয়ে বলল, ‘মিছামিছি। ওর বাবার ভাগ্যি ভালো ওকে খুন করি নি। কে জানত পেটে আমার এমন শত্তুর হবে!’
হেরম্ব এবার রূঢ় কণ্ঠে বলল, ‘কি শক্ৰতা করল ভেবে পাই না। টাকা দশটা যোগাড় করে না। পুঞ্জ কি তাঁর যাওয়া হত না যে যেতে চায় অত সহজে তাকে আটকানো যায় না, মালতী-বৌদি।‘
মালতী বলল, ‘তুমি ছাই বোঝ। টাকা যোগাড় করে দেওয়ার জন্য নাকি! আমাকে না। জানিয়ে ও চুপ করে রইল কোন হিসাবে? আমি টের পেলে কি সে যেতে পারত, হেরম্ব!’
দুহাতে ভর দিয়ে পিছনে হেলে মালতী আবার বলল, ‘আদেষ্ট দেখেছ, হেরম্ব? আজ আমার জন্মদিন, জ্বালাতন করব, তাই পালিয়ে গেল।’ মালতীর গাল আর চিবুকের চামড়া কুঞ্চিত হয়ে আসছিল, রক্তবর্ণ চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।’একেবারে পাগল, হেরম্ব, উন্মাদ। গেছে যাক, আজ দেখব কাল দেখব তারপর ঘরদোরে। আমিও ধরিয়ে দেব আগুন। ওলো সর্বনাশি, উঁকি মেরে দেখিস কোন লজ্জায়? আয়, ইদিকে আয়, হতভাগি!’
আনন্দ আসে না। হেরম্ব তাকে ডেকে বলল, ‘এস আনন্দ।’
আনন্দ কুণ্ঠিত পদে কাছে এলে মালতী খপ্ করে তার হাত ধরে ফেলল। কাছে বসিয়ে পিঠের কাপড় সরিয়ে আঘাতের চিহ্ন দেখে বলল, ‘তোর কি মাথা খারাপ হয়েছিল, আনন্দ? লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে, তুই পালিয়ে যেতে পারলি না?’
আনন্দ মুখ গোজ করে বলল, ‘গোলাম তো পালিয়ে।’
‘পালিয়ে গেলি তো এমন করে তোকে মোরল কে শুনি?’ মালতীর গলা হতাশায় ভেঙে এল, ‘গোয়ার! যেমন গোয়ার বাপ তেমনি গোয়ার মেয়ে। ঠায় দাঁড়িয়ে মার খেয়েছে। যত বলি–যা আনন্দ, চোখের সমুখ থেকে সরে যা, মেয়ে তত এগিয়ে এসে মার খায়।’
মাতা ও কন্যার মিলন হল এইভাবে। হেরম্বের না হল আনন্দ, না হল স্বস্তি। নূতন ধরনের যে বিষাদ তার এসেছে তাতে সবই যেন তার মনে হচ্ছে সাধারণ, স্বাভাবিক।
তারপর মালতী জিজ্ঞাসা করল, ‘পিঠে নারকেল তেল দিতে পারিস নি একটু?’
বরফ দেওয়ার কথাটা কেউ উল্লেখ করল না। হেরম্বকে দিয়ে তেলের শিশি আনিয়ে মালতী মেয়ের পিঠে মাখিয়ে দিতে আরম্ভ করল।
আনন্দকে প্রহার করেই মালতী শান্ত হয়ে যাবে হেরম্ব সে আশা করে নি। অনাথ যে সত্যই চিরদিনের মতো চলে গেছে তাতে সেও সন্দেহ করে না। মৃত্যুর চেয়ে এভাবে প্রিয়জনকে হারানো বেশি শোকাবহ। এই শোক মালতীর মধ্যে ঠিক কি ধরনের উন্মত্ততায় অভিব্যক্ত হবে তাই ভেবে হেরম্ব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। মালতীর শান্ত ভাবটা সে ঠিক বুঝতে পারল না। কারণের প্রভাব হওয়াও আশ্চৰ্য নয়।
ওদিকে সুপ্রিয়ার সমস্যা আছে। চারটের মধ্যে সুপ্রিয়ার কাছে তার হাজির হবার কথা। ঘড়ি দেখে বোঝা গেল এখন আর তা সম্ভব নয়, চারটে বাজে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে উপস্থিত হলে দেরি করে যাওয়ার অপরাধ সুপ্রিয়া ধরবে না। যেতেই হেরন্থের ক্লান্তি বোধ হচ্ছে।
