সুপ্রিয়া লজ্জা পেল।—‘বানিয়ে বানিয়ে এত কথা। আপনি বলতে পারেন! কিন্তু আপনার শরীর যে রেটে খারাপ হয়েছে তাতে মনে হয় না ঠিকমতো আহার-নিদ্রা হয়।’
‘রেটটা তোরও কম নয়, সুপ্রিয়া।’
‘আমার অসুখ, ফিটের ব্যারাম। আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আপনার শরীর খারাপ হবে কেন?’
‘আমারও হয়তো অসুখ, সুপ্রিয়া।’
সুপ্রিয়া হেসে বলল, ‘তর্কে হারাবার উপক্রমেই অসুখ হয়ে গেল? বসুন, বালিশ এনে দিচ্ছি–ওয়াড় পরিয়ে আনতে হবে। এমন আলসে হয়েছি আজকাল, ময়লা বালিশে শুয়ে থাকি তবুওয়াড় বদলাই না। এবার আমি মরব নাকি?’
বালিশ নিয়ে সুপ্রিয়া ফেরার আগে এল অশোক।
’দুপুরে এখানেই খাবেন দাদা।’
তার আমন্ত্রণেই এই অমায়িক সুরে হেরম্ব বুঝতে পারল সুপ্রিয়া সত্য সত্যই অশোককে শান্ত করতে পেরেছে। সুপ্রিয়ার এ ক্ষমতা তার অভিনব মনে হল না। অশোকের প্রতি সুপ্রিয়ার যে গভীর ও আন্তরিক মমতা আছে, অশোকের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি যে নিবিড় মনোযোগ ও অক্লান্ত সেবায় তার এই মমতা প্ৰকাশ পায়, অশোকের অতিরিক্ত দুঃখ ও অপমান মুছে নেবার পক্ষে তাই যথেষ্ট। সুপ্রিয়ার প্রকৃতি শান্ত, সে বিশ্বাস করে মানুষ মাথাপগলা নয়, বাস্তব জগতে ভাব নিয়ে মানুষের দিন কাটে না। যার জীবনে যা কিছু প্রয়োজন তার সে সমস্তই পাওয়া চাই। জীবন নষ্ট করবার জন্য নয়, নিজের জন্য চাইতে এবং নিতে, যতটা পারা যায় পরকে পাইয়ে দিতে, কারো লজ্জা নেই। নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়া চাই, পরের জীবন সাজিয়ে দেওয়া চাই। হেরম্বের জন্য অশান্তি, উদ্বেগ, সন্দেহ, ঈৰ্ষা প্রভৃতি যতগুলি পীড়াদায়ক অনুভূতি আছে তার প্রায় সবগুলি অনুভব করে দিন কাটানোর ফলে ফিটের ব্যারাম জন্মে যাওয়া সত্ত্বেও উপরোক্ত মনোভাবের দরুন সুপ্রিয়ার কথায় ব্যবহারে সর্বদা এমন একটি কোমল ভাব ও সহানুভূতির সঙ্গে চারিদিক হিসাব করে চলবার আন্তরিক চেষ্টা প্রকাশ পায় যে, তার সম্বন্ধেও মানুষকে সে বিবেচনা করে চলতে শেখায়। সে যাকে ব্যথা দেয়, নিদারুণ ক্রোধের সময়ও তাকে স্মরণ রাখতে হয় যে উপায় থাকলে ব্যথা সে দিত না। সুপ্রিয়ার বিরুদ্ধে মনে নালিশ পুষে রাখা কঠিন।
হেরম্ব অশোকের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করল। বলল, ‘বেশ তো।’
‘আর বিকেলে যদি পারেন। ওকে একবার মন্দির স্বৰ্গদ্বার-টার যা দেখবার আছে দেখিয়ে আনবেন। আমার নিজের তো ক্ষমতা নেই নিয়ে যাব।’
‘আচ্ছা।’
অশোক চুপিচুপি বলল, ‘আমার কি ভীষণ সেবাটাই যে ও করছে, দাদা, বললে আপনার বিশ্বাস হবে না। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই, নিজের চোখে যে না দেখেছে–এখনো যথেষ্ট করছে। ও মনে করে আমি বুঝি কিছুই চেয়ে দেখি না, আমার কৃতজ্ঞতা নেই! কিন্তু আপনাকে বলে রাখছি, ওর সেবা। আমি কখনো ভুলব না।’
হেরম্ব বলল, ‘তুমি ভুল করছ, অশোক, ও কৃতজ্ঞতা চায় না।’
‘জানি, জানি। ওর মন কত উঁচু আমি জানি না!’
সুপ্রিয়া বালিশ নিয়ে ফিরে আসায় এ প্রসঙ্গ থেমে গেল। অশোককে এ ঘরে দেখে সুপ্রিয়া সন্দিগ্ধভাবে দুজনের মুখের দিকে চেয়ে দেখতে লাগল। বালিশটা মাদুরে ফেলে দিয়ে বলল, ‘হেরম্ববাবু এখন ঘুমোবেন। চল আমরা যাই!’
অশোক উঠল।– ‘আমি ওঁকে এ বেলা খাবার নেমন্তশ্ন করেছি, সুপ্রিয়া।’
‘বেশ করেছি। নিজে রাধাগে, আমি পারব না।’
বলে সুপ্রিয়া হাসল। সুপ্রিয়াকে এত ঠাণ্ডা হেরম্ব আর কখনো দেখে নি।
বজ্ৰপাতের শব্দে ঘুম ভেঙে হেরম্ব দেখতে পায় তার ঘুমের অবসরে আকাশে মেঘের সঞ্চার হয়ে বাইরে দারুণ দুৰ্যোগ ঘনিয়ে এসেছে। বাতাস বইছে শী শী শব্দে, উত্তাল সমুদ্রের গর্জন বেড়ে গেছে। উঠে ঘরের বাইরে যেতে গিয়ে হেরম্ব অবাক হয়ে যায়। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। ডাকাডাকি শুনে সুপ্রিয়া এসে দরজা খুলে দেয়। ভারি তালা খোলার শব্দ হেরম্ব শুনতে পায়।
দরজা খুললে তালাটিকে সে খুঁজে পায় না। সন্দিগ্ধ হয়ে বলে, ‘দেখি তোর হাত? ওটা নয়, আঁচলের নিচে যেটা লুকিয়েছিস।’
‘কেন?’
‘দেখা কি লুকিয়েছিস, তালা বুঝি, দরজায় তালা দেওয়ার মানে?’
সুপ্রিয়া হেসে বলে, ‘মানে আর কি, পালিয়ে না যেতে পারেন। তাই। যে পালাই—পালাই স্বভাব!’
হেরম্ব বলে, ‘আমার ঘুমের মধ্যে অশোক বুঝি ছোরা হাতে এদিকে আসছিল?’
সুপ্রিয়া গলা নামিয়ে বলে, ‘আস্তে কথা কইতে পারেন না?—তা আসে নি। আসতে পারত!’
হেরম্ব হেসে বলে, ‘ও, তোর শুধু সন্দেহ! তুই সত্যি দারগার বৌ, সুপ্রিয়া। সে গেছে কোথায়?’
‘ছাতে।’
‘এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ছাতে?’
‘সমুদ্র দেখতে গেছে। বললে, ঝড় উঠলে সমুদ্র কেমন দেখায় দেখবার এ সুযোগ ছাড়া উচিত নয়। আমাকেও জোর করে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। একটু ধস্তাধস্তি করে পালিয়ে এসেছি।’
‘ধ্বস্তাধস্তি কেন?’
‘কারণ ছিল বৈকি। আমায় ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছিল। যত সব বিদঘুটে খেয়াল!’
হেরম্ব ফিরে গিয়ে মাদুরে বসল। ঘরের জানালা দুটি বায়ুর গতির দিকে খোলে, বন্ধ করার দরকার হয় নি। বাইরে এমন দুৰ্যোগ নামলে আনন্দ তাঁর ঘরে সমুদ্রের ঝিনুক নিয়ে খেলা করে, তার যখন খুশি তাকায়, যখন খুশি কথা বলে। তাদের নিজেদের প্রেমের সমস্যা ছাড়া সে ঘরে দুর্ভাবনার প্রবেশ নিষেধ। কারো জীবনের প্রভাব সেখানে নেই, সুপ্রিয়ারও নয়–তাকে সে ভুলে যায়। কিন্তু সুপ্রিয়ার কাছে থাকলে একটি বেলার জন্যও তার রেহাই নেই। আবহাওয়া অবিলম্বে বৈদ্যুতিক হয়ে ওঠে। দুৰ্ঘটনা ঘটে, দুঃসংবাদ পাওয়া যায়। তাদের মাঝখানে আর একটি জীবনের নাটকীয় অভিনয় ঘটে চলে। বাড়ির ছাদের ভয়ঙ্কর ঘটনাটুকুর সংবাদ সুপ্রিয়া তাকে কেন দিয়েছে বুঝে হেরম্বের বড় কষ্ট হয়। সুপ্রিয়াও কি মালতী হয়ে উঠল?
