‘ছোরা, অশোক?’
‘উঁহু, দেশী দা—ভয়ানক ধার। আটকাতে গিয়ে আঙুল দুটো উড়ে গেছে। উড়ে যাওয়া উচিত ছিল মাথাটার, কেন যে গেল না, মাথাটা আজো গরম হয়ে ওঠে।’
সুপ্রিয়া বলল, ‘মাথা গরম করে আর কোজ নেই। দোষ তো তোমার। থানোভরা সেপাই জমাদার, তবু নিজে ডাকাতের সামনে গলা এগিয়ে দেবে, বিবেচনা তো নেই।’
অশোক নির্মমভাবে হাসল। বলল, ‘বিবেচনা করেই গলা বাড়িয়েছিলাম, কর্তব্যের খাতিরে। তুমি যা ভেবেছিলে তা একেবারেই সত্য নয়।’
‘আমি কিছুই ভাবি নি।’
‘ভাব নি? তবে যে ডাকাত ধরতে গেলেই বলতে জেনেশুনে প্ৰাণটা দিতে যাচ্ছি নিজের, খুন হতে যাচ্ছি সাধ করে? আমনি করে অমঙ্গল ডেকে আনতে বলেই তো আঙুল দুটো আমার গেল।’
সুপ্রিয়া বিবৰ্ণ মুখে বলল, ‘কি সব বলছি তুমি? চুপ কর।’
হেরম্ব এতক্ষণ ভেতরে ভেতরে রেগে আগুন হয়ে উঠেছে। মানুষকে ব্যঙ্গ করার যে ধারালো ক্ষমতা সে প্রায় পরিত্যাগ করেছিল, এবার তাই সে কাজে লাগল।
‘আহা বলুক না, সুপ্রিয়া, বলুক। অতিথিকে অশোক এন্টারটেন করছে বুঝতে পারিস না? গৃহস্বামীর এই তো প্রথম কর্তব্য। ওর কথা শুন না, অশোক, তোমার যা বলতে ইচ্ছা হয় এমনি রস দিয়ে বল। তোমার কর্তব্য তুমি করবে বৈকি!’
অশোকের স্তিমিত চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। হেরম্ব স্পষ্ট দেখল। অসুস্থ স্বামীর লাঞ্ছনায় সুপ্রিয়ার মুখও ব্যথায় স্নান হয়ে গেছে। কিন্তু হেরন্ধের মধ্যে যে নিষ্ঠুরতা মরে যাচ্ছিল আজ তা মরণ-কামড় দিতে চায়। গলা নামিয়ে সে যোগ দিল, ‘তুমি গৃহস্বামী যে!’
অশোক দেয়ালের দিকে মুখ করে বলল, ‘না না।’
হেরম্ব শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি না, অশোক?’
‘গৃহস্বামী অসুস্থ। তার কর্তব্য নেই।’ হেরম্ব বলল, ‘তাহলে তোমায় বিরক্ত করা উচিত হবে না। আমরা অন্য ঘরে যাই।’
হেরম্ব ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সুপ্রিয়া তাকে অন্য একটি ঘরে যে ঘরের মেঝেতে শুধু মাদুর পাতা ছিল, নিয়ে গিয়ে বলল, ‘বসুন। ওকে একটু শান্ত করে আসি।’
‘পারবি না, সুপ্রিয়া, ও একটা আস্ত বাঁদর।’
‘গালাগালি কেন?’ বলে সুপ্রিয়া চলে গেল।
শুধু একটি মাদুর বিছানো, একটা বালিশ পর্যন্ত নেই। মাদুর দেয়ালের কাছে সরিয়ে নিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে হেরম্ব আরাম করে বসল। হেরম্বের প্রাণশক্তি অপরিমেয়া, ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাত চেতনার বাদ-বিসংবাদ সহ্য করার ক্ষমতা তার অনমনীয়, কিন্তু আজ সে অপরিসীম শ্ৰান্তি বোধ করল। দুঃখ, বিষাদ বা আত্মগ্লানি নয়, শুধু শ্ৰান্তি। সুপ্রিয়ার প্রত্যাবর্তনের আগে এই বাড়ি ছেড়ে, আনন্দের সঙ্গে দেখা হবার আগে পুরী থেকে পালিয়ে চিরদিনের জন্য নিরুদ্দেশ যাত্রা করতে পেলে সে যেন এখন বেঁচে যায়। হেরম্বের ঘুম আসে–এক সদয় দেবতার আশীর্বাদের মতো। সে চোখ বোজে। একটা ব্যাপার সে বুঝতে পেরেছে। আনন্দের বিষণু, বিরস প্রহরগুলির জন্ম-ইতিহাস। আর এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যে কারণে না মরে তার পুনর্জন্ম সম্ভব নয়, সেই কারণেই তার ক্ষয় পাওয়া হৃদয়ের পুনরুজ্জীবন অসম্ভব হয়ে গেছে। তার জীবনে প্রেম এসেছে অসময়ে। প্রেমের সে অনুপযুক্ত। বসন্ত-সমাগমে অর্ধমৃত তরুর কতকগুলি পল্লব কুসুমন্তীর্ণ হয়ে গেছে বটে, কিন্তু কত শুষ্ক শাখায় জীবন নেই, কত শাখার বন্ধুল পিপীলিকা—বাস জীর্ণ। তার অকাল বার্ধক্যের সঙ্গে আনন্দের অহরহ। পরিচয় ঘটে, আনন্দের কত খেলা তার প্রিয় নয়, আনন্দের কত উল্লাস তার কাছে অর্থহীন। আনন্দ তা টের পায়। কত দিক দিয়ে আনন্দ তার সাড়া পায় না, যদি-বা পায় তা কৃত্রিম, মন-রাখা সাড়া। আনন্দ বিমৰ্ষ হয়ে যায়। মনে করে, হেরম্বের প্রেম বুঝি মরে যাচ্ছে। হেরম্বের প্রেমই যে দুর্বল এখনো সে তা টের পায় নি।
সুতরাং আনন্দকে সে ঠকিয়েছে। জীৰ্ণবিশিষ্ট যৌবনের সবখানিই প্রায় তাকে ব্যয় করতে হয়েছে আনন্দকে জয় করতে, এখন তাকে দেবার তার কিছু নেই। এ কথা তার জানা ছিল না যে, পরিপূর্ণ প্রেমের অনন্ত দাবি মেটাবার ক্ষমতা আছে একমাত্র অবিলম্বিত অনপচয়িত, সুস্থ ও শুদ্ধ যৌবনের। অভিজ্ঞতার প্রেমের খোরাক নেই, মনস্তত্ত্বে বুৎপত্তি প্রেমকে টিকিয়ে রাখার শক্তি নয়। নারীকে নিয়ে একদিনের জন্যও যে খেয়ালের খেলা খেলেছে, তুচ্ছ সাময়িক খেলা, প্রেমের উপর্যুক্ততা তার ক্ষুন্ন হয়ে গেছে। মানুষের জীবনে তাই প্রেম আসে একবার, আর আসে না, কারণ একটি প্রেমই মানুষের যৌবনকে ব্যবহার করে জীৰ্ণ করে দিয়ে যায়। হৃদয় বলে মানুষের কাব্যে উল্লিখিত একটি যে শতদল আছে, তার বিকাশ স্বাভাবিক নিয়মে একবারই হয়, তারপর শুরু হয় ঝরে যাবার আয়োজন। সাধারণ হৃদয়, প্রতিভাবানের হৃদয়, সমস্ত হৃদয় এই অখণ্ডনীয় নিয়মের অধীন, কারো বেলা এর অন্যথা নেই।
সুপ্রিয়ার ফিরতে দেরি হল। সে একেবারে হেরন্ধের খাবার নিয়ে আসায় বোঝা গেল যে, অশোককে শান্ত করতেই তার এতক্ষণ সময় লাগে নি।
খাবার খেয়ে ঠাণ্ডা হয়ে হেরম্ব বলল, ‘তোর উপরে রাগ হচ্ছিল, সুপ্রিয়া।’
সুপ্রিয়া খুশি হয়ে বলল, ‘সত্যি? কখন?’
‘এই মাত্র। খিদেয় অন্ধকার দেখছিলাম।’
‘খিদেয়? আমাকে না দেখে নয়?’
হেরম্ব হাই তুলে বলল, ‘একটা বালিশ এনে দে তো, ঘুমোব।’
সুপ্রিয়া একটি অত্যন্ত কুটিল প্রশ্ন করল।
’কেন? রাত জাগেন বুঝি, ঘুমোবার সময় পান না?’
হেরম্বও সমান কুটিলতার সঙ্গে জবাব দিল, ‘সময় পাই বৈকি। রাত দশটা বাজতে না বাজতে ওখানকার সবাই, আনন্দসুদ্ধ, ঢুলতে ঢুলতে যে যার ঘরে গিয়ে দরজা দেয়। তারপর সারারাত নিষ্কর্মা ঘুম দিলে আমায় ঠেকায় কে!’
