‘কোথায় যাচ্ছ?’
হেরম্ব বলল, ‘একে বাড়ি পৌঁছে দিতে যাচ্ছি।’
‘খেয়ে যাও।’
সুপ্রিয়া এর জবাব দিল। বলল, ‘আমার ওখানে খাবে।’
আনন্দ বলল, ‘পেটে খিদে নিয়ে অদূর যাবে? সকালে উঠে খেতে না পেলে ওর মাথা ঘোরে তা জানেন?
সুপ্রিয়া বলল, ‘মাথা না হয় একদিন ঘুরুলই।’
হেরম্ব অভিভূত হয়ে লক্ষ করল, পরস্পরের চোখের দিকে চেয়ে তারা আর চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে না। সুপ্রিয়ার চোখে গভীর বিদ্বেষ, তাই দেখে আনন্দ অবাক হয়ে গেছে। দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হেরম্ব সসঙ্কোচে বলল, ‘আমার খিদে পায় নি আনন্দ, একটুও পায় নি।’
আনন্দ অভিমান করে বলল, ‘পায় নি? তা পাবে কেন? আমি কিছু বুঝি নে কিনা!’
হেরম্ব তখন নিরুপায় হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘এবার কি কর্তব্য, সুপ্রিয়া?’
তাকে মধ্যস্থ মেনে হেরম্ব একরকম স্পষ্টই ইঙ্গিত করল যে, সে যখন বয়সে বড়, আনন্দের কাছে হার স্বীকার করে তারই উদারতা দেখানো উচিত। সুপ্রিয়া রাগ করে বলল, ‘আমি জানিনে।’
‘এখান থেকেই খেয়ে যাই, কি বলিস?’
‘তাও আমি জানিনে।’
হেরম্ব নিৰ্বাক হয়ে গেল। আনন্দ একটু হেসে বলল, ‘আচ্ছা, আপনি যে এত জোর খাটাচ্ছেন, আপনার কি জোর আছে বলুন তো? ও আমাদের অতিথি, আপনার তো নয়।’
‘আমি ওর বন্ধু।’
আনন্দ আরো ব্যাপকভাবে হেসে বলল, ‘আমিও তো তাই!’
হেরম্ব কখনো কোনো কারণে সুপ্রিয়ার মুখে হিংস্র ব্যঙ্গ শোনে নি, আজ শুনল, হঠাৎ মুচকে হেসে সুপ্রিয়া বলল, ‘তুমি?’-বলে, এই একটিমাত্র শব্দে আনন্দকে একেবারে উড়িয়ে দিয়ে ক্ষণিকের বিরাম নিয়ে সে যোগ দিল, ‘ওর সঙ্গে, আমার যেদিন থেকে বন্ধুত্ব, তোমার তখন জন্মও হয় নি।’
আনন্দ আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘যান! আমার জন্মের সময় আপনার আর কত বয়স ছিল?–কত আর বড় হবেন আপনি আমার চেয়ে? আপনার বয়স উনিশ-কুড়ির বেশি। কখনো নয়।’
সুপ্রিয়া বুঝতে পারল না, হেরম্বই শুধু টের পেল আনন্দের এ প্রশ্ন কৃত্রিম নয়, সে পরিহাস করে নি। সুপ্রিয়ার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। সে যেন হঠাৎ ধমক দিয়ে বলল, ‘তুমি ছেলেমানুষ, তাই তোমাকে কিছু বললাম না। বয়সে যারা বড় আর কখনো তাদের সঙ্গে এ রকম ঠাট্টা কোরো না।’
সুপ্রিয়ার ধমকে মুখ ম্লান করে আনন্দ যা বলেছিল তার কোনো মানে নেই। —শুধু একটি ‘আচ্ছা’। হেরম্ব ভালো করেই জানে সুপ্রিয়ার কাছে সে যে অপমান পেয়েছে তার জন্য আনন্দ তাকেই দায়ী করবে। দায়ী করে সে হয়ে থাকবে বিষণ্ণ। আনন্দের বর্তমান মানসিক অবস্থায় সহজে এর প্রতিকারও করা যাবে না।
গাড়িতে সুপ্রিয়ার সামনের আসনে বসে আনন্দের কথা ভাবা চলছিল। সে উঠে পাশে এসে বসায় হেরাম্বের আর সে ক্ষমতা রইল না।
‘পাশে বসাই নিয়ম, না?’
হেরম্ব একটু ভেবে বলল, ‘অন্তত অনিয়ম নয়।’
সুপ্রিয়া হেসে বলল, ‘আসল কথা, কথা বলব। কে একটা লোক পিছনে উঠে বসেছে, শুনতে পাবে বলে সামনে এগিয়ে এলাম।’
‘তোর প্রগতির অর্থ খুব গভীর, সুপ্রিয়া।’
সুপ্রিয়া একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বলল, ‘আপনার এই কথা বলার ঢং মন্ত্রদাতা গুরুর মতো, চিরকাল এই সুর শুনে আসছি। হাক্কা কথা বলেন, তাও উপদেশের মতো ভারি। আওয়াজ।’
‘একটা কথা ভাবতে ভাবতে অন্য কথার জবাব অমনি করেই দিতে হয়।’
‘ও, আচ্ছ, ভাবুন; আমি চুপ করলাম।’
বাড়ির দরজায় গাড়ি থামা পর্যন্ত সুপ্রিয়া সত্যই চুপ করে রইল। যেখানে তারা বাড়ি নিয়েছে সেখান থেকে সমুদ্রের আওয়াজ শোনা যায় বটে, বাড়ির ছাদে না উঠলে সমুদ্র দেখা যায় না। এবারো সুপ্রিয়া হেরম্বকে বাড়ির বাজে অংশ পার করিয়ে একেবারে তার শোবার ঘরে নিয়ে হাজির করল। হেরম্ব লক্ষ করল ঘরখানা দোকানের মতো সাজানো নয়, শয়নঘরের মতোও নয়। বিদেশ বলে বোধহয় ঘরে আসবাব বেশি নেই, অস্থায়ী বলে সুপ্রিয়ার নেই ঘর সাজাবার উৎসাহী। উৎসাহের অভাব ছাড়া অন্য কারণও হয়তো আছে। এটা যদি সুপ্রিয়ারই শয়নকক্ষ হয় তবে সে এখানে একাই থাকে। ছোট চৌকিতে যে বিছানা পাতা আছে সেটা একজনের পক্ষেও ছোট। অশোক যদিও এখন বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে আছে, এ অধিকার হয়তো তার সাময়িক, হয়তো এ তার নিছক গায়ের জোর। এই সব পলকনিহিত অনুমানের মধ্যেও হেরম্ব কিন্তু টের পাচ্ছিল অশোকের গায়ের জোর বড় আর নেই। সে দুৰ্ভিক্ষপীড়িতের মতো শীর্ণ হয়ে গেছে।
অশোক উঠল না। বলল, ‘হেরম্ববাবু যে!’
হেরম্ব বলল, ‘আমিই। তোমাকে চেনা যাচ্ছে না, অশোক।’
‘যাবেও না। মরে ভৌতিক অবস্থাপ্রাপ্ত হয়েছি যে! এ যা দেখছেন, এ হল সূক্ষ্ম শরীর।’
‘সূক্ষ্ম সন্দেহ নেই।’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার পত্রে জানা গেল এখানকার জল-হাওয়া ভালো। উনি মনে করলেন, আমার অবস্থা বুঝে পুরীতে আমাদের নেমন্তান্নাই বুঝি করছেন ওই কথা লিখে। তাই জোর করে টেনে এনেছেন। ছুটির জন্য বেশি লেখালেখি করতে গিয়ে চাকরিটি প্রায় গিয়েছিল, মশায়।’
আনন্দের সঙ্গে কথা বলবার সময় সুপ্রিয়ার কণ্ঠস্বরে যে ব্যঙ্গ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, অশোকের কথায় যেন তারই ভদ্র, গোপন করা ধ্বনি শোনা যায়। হেরম্ব একটু সাবধান হল।
‘তোমার আঙুল কি হল, অশোক?’
অশোকের ডান হাতের মাঝের আঙুল দুটি কাটা। ঘা শুকিয়ে এসেছে কিন্তু আরক্তভাব এখনো যায় নি, শুকনো ঘায়ের মামড়ি তুলে ফেললে যেমন দেখায়। এ বিষয়ে অশোকের নিজের কৌতূহল বোধহয় এখনো যায় নি, হাতটা চোখের সামনে ধরে সে কাটা আঙুলের গোড়া দুটি পরীক্ষা করে নিল। বলল, ‘একজন ছোরা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।’
