তাদের দুজনকে হেরম্বের ঘরে পৌঁছে দিয়ে আনন্দ চলে গেল। সুপ্রিয়া স্নান হেসে বলল, ‘মেয়েটার বুদ্ধি আছে তো!
হেরম্ব অন্যমনস্ক ছিল। বলল, ‘কার বুদ্ধি আছে? ক্ষেপেছিস। আমাদের ও বুদ্ধি করে একা রেখে যায় নি। কাজ করতে গিয়েছে। কাজ না থাকলে এখান থেকে ও নড়ত না, বসে বসে তোর সঙ্গে গল্প করত।’
‘সত্যি? তাহলে মেয়েটা খুব সরল। আমি বুঝতে পারিনি।’
‘বুঝতে পারিস নি? তুই কি ওর সঙ্গে পাঁচ মিনিটও কথা বলিস নি, সুপ্রিয়া?’
সুপ্রিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। সে নিচু গলায় বলল, ‘তা বলেছি। আমারই বুদ্ধির দোষ। বুদ্ধি ঠিক থাকলে ওই মেয়েটা যে খুব সরল এটা বুঝতে পাঁচ মিনিট সময়ও লগত না।’
সুপ্রিয়ার অপলক দৃষ্টিপাতে হেরম্ব একটু লজ্জা বোধ করল। সরলতার হিসাবে সুপ্রিয়াও যে কারো চেয়ে ছোট নয় এও তো সে জানে। সুপ্রিয়ার অভিজ্ঞতা বেশি, মানুষের মনের জটিল প্রক্রিয়া অনুধাবন করার শক্তি বেশি, সে তাই সাবধানে কথা বলে, হিসাব করে কাজ করে। কিন্তু তার কথা ও কাজে সরলতার অভাব কোনোদিনই হেরন্থের কাছে ধরা পড়ে নি, মিথ্যার মানস-স্বৰ্গ ওর নেই। এও হয়তো সত্য যে, আনন্দের সহজাত সরলতার চেয়ে সুপ্রিয়ার মনোভিজাত্যের সরলতা বেশি। মূল্যবান। একটা ছেলেমানুষ, আর একটা সুশিক্ষা।
হেরম্ব সুর বদলাল।
’ভালো করে বোস সুপ্রিয়া, তোর কষ্ট হচ্ছে।’
‘কষ্ট হওয়া মন্দ কি? তাতে মানুষের দরদ পওয়া যায়। চোখে না দেখলে কেউ তো বোঝে না কারো কষ্ট আছে কি নেই।’
‘কারো কি নিজের কষ্টের কিছু অভাব আছে সুপ্রিয়া, যে পরের মধ্যে কষ্ট খুঁজে বেড়াবে?’
‘সবাই তো সকলের পর নয়।‘
হেরম্ব হেসে বলল, ‘নয়? তুই ছাই জনিস। মোহ-মুদগর, বৈরাগ্যশতক, মহানিৰ্বাণ—তন্ত্র সব লিখেছে—‘
সুপ্রিয়া অত্যন্ত মৃদুস্বরে বলল, ‘কাছে এসে বসুন না? দূরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে লাভ কি?’
‘কোথায় বসব দেখিয়ে দে।’
‘তাহলে থাকুন দাঁড়িয়ে।’ সুপ্রিয়া জানালার সঙ্কীর্ণ স্থানটিতে অত্যন্ত অসুবিধার মধ্যে বসে ছিল; সেখানে তার কাছে বসা অসম্ভব। হেরম্ব বিছানায় বসে তাকে ডাকল, ‘আয় সুপ্রিয়া এখানে বোস। এখুনি এলি, এসেই ঝগড়া জুড়ে দিলি কেন?’
উঠে এসে বিছানায় বসে সুপ্রিয়া বলল, ‘আপনিই-বা শুধু হাল্কা কথা বলছেন কেন? পুরীতে কেন এলাম জিজ্ঞাসা করবেন। কখন?’
‘একেবারেই যদি জিজ্ঞাসা না করি?’
‘তাহলে একটু মুশকিলে পড়ব।’ সুপ্রিয়া এবার হাসল, ‘আপনি এ ঘরে থাকেন না?’
‘হ্যাঁ, একা। আমি এ ঘরে একা থাকি সুপ্রিয়া।’
‘তা জানি না নাকি!’
’জনিস বৈকি। তবু বললাম। রাগিস নে। তোকে তো গোড়াতেই বলেছি, আমার ছিল না। এমন অনেক স্বভাব ইতিমধ্যে আমি অর্জন করে ফেলেছি। বাহুল্য কথা বলা তার মধ্যে একটা। ’
কথা, কথা, কথা! শুধু কথা পাকানো, কথা মোচড়ানো, কথা নিয়ে লড়াই করা। সুপ্রিয়া মাথা নিত করল। এত কথা কি জন্য? পরিচয়ের জন্য নয়, উদ্দেশ্য নির্ণয়ের জন্য নয়, সময় কাটানোর জন্যও নয়। পরিচয় তাদের যা আছে আর তা বাড়বে না, পরস্পরের উদ্দেশ্য সম্বন্ধেও ভুল হবার তাদের কোনো কারণ নেই, কথা না বললেও তাদের সময় কাটবে। তবু প্ৰাণপণে তারা কথা বলছে। চিরকাল এমনিভাবে মানুষ কত কথা বলতে পারে? আজো অনিশ্চয়তা বজায় থাকার অভিমানে সুপ্রিয়া কথা বন্ধ রাখল। হেরম্ব চুপ করল বক্তব্যের অভাবে। এ কথা মিথ্যা নয় যে, কথা নিয়ে লড়াই করাটাই চরম উদ্দেশ্য দাঁড়িয়ে গেছে বলে সুপ্রিয়াকে বলার তার কিছুই নেই।
‘তোমার কাছে টাকা আছে? দশটা টাকা দিতে পারবো?’
‘টাকা কি হবে আনন্দ?’
‘বাবা চাইল।’
হেরম্ব অবাক হয়ে গেল। ’মাস্টারমশাই টাকা চাইলেন? টাকা দিয়ে তিনি কি করবেন?’
আনন্দ এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না। সে জানে না। টাকা নিয়ে সে চলে গেলে হেরম্ব চেয়ে দেখল। সুপ্রিয়া খুব সরলভাবে অত্যন্ত কুটিল হাসি হাসছে। আনন্দের সঙ্গে হেরম্বের আর্থিক সম্পর্কটি আবিষ্কার করামাত্র তার যেন আর কিছু বুঝতে বাকি নেই। এতক্ষণে সে নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হল। প্রতিবাদ করতে গিয়ে হেরম্ব চুপ করে গেল। প্রতিবাদ শুধু নিম্ফল নয়, অশোভন।
সুপ্রিয়া উঠে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, ‘বাড়ি পৌঁছে দেবেন না?’
‘এখুনি যাবি?’
‘আর বসে কি হবে? চলুন পৌঁছে দেবেন।’
‘তুই কি একা এসেছিস নাকি, সুপ্রিয়া? একা এসে থাকলে এক যাওয়াই তো ভালো।’
‘এক কেন আসব? চাকরকে সঙ্গে এনেছিলাম, আপনি আছেন শুনে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। চলুন, যাই।’
ছিলনা নয়, হেরম্ব সত্য সত্যই আলস্য বোধ করে বলল, ‘আর একটু বোস না সুপ্রিয়া?’
সুপ্রিয়া মাথা নেড়ে বলল, ‘না, আর একদণ্ড বসব না। কি করে বসতে বলছেন?’
হেরম্ব আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘তুই আসতে পারিস, আমি তোকে বসতে বলতে পারি না? আমার ভদ্রতা-জ্ঞান নেই?’
সুপ্রিয়া গম্ভীর হয়ে বলল, ‘ভদ্রতা-জ্ঞানটা কোনো কাজের জ্ঞান নয়। আমি এখানে কেন এসেছি। জানা দূরে থাক, পুরীতে কেন এসেছি ও জ্ঞান দিয়ে আপনি তাও অনুমান করতে পারবেন। না। না। যদি যান তো বলুন মুখ ফুটে, এখানে আমার গা কেমন করছে, আমি ছুটে পালিয়ে যাই। পুরী শহরে আপনি আমাকে আজ-কালের মধ্যে খুঁজে বার করতে পারবেন। সে ভরসা আছে।’
হেরম্ব আর কথা না বলে জামা গায়ে দিল। বারান্দা পার হয়ে তারা বাড়ির বাইরে যাবার সরু প্যাসেজটিতে ঢুকবে, ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আনন্দ একরকম তাদের পথরোধ করে দাঁড়াল।
