‘এ আপনার ঠাট্টা নাকি মালতী—বৌদি?’
মালতী রেগে বলল, ‘কি তবে? সঙ্কেত্তন? আবোল তাবোল বোকো না বাপু, মাথায় আগুন জ্বলছে, মন্দ কিছু বলে বসব। কাল আমার জন্মদিন। জন্মদিনে শ্ৰীচরণে ঠাঁই পাই। বছরে ওর এই একটা দিন-রাক্রির আমার সঙ্গে সম্পর্ক, হেসে কথাও কয়, ভালোও বাসে।-গা ছুঁয়ে বলছি ভালবাসে, হেরম্ব!’ মালতী মুচকে মুচকে হাসে, ‘কেন, তা জান না বুঝি? শোন বলি। সেই গোড়াতে, মাথাটা যখন পর্যন্ত ওর খারাপ হয় নি, তখন পিতিজ্ঞে করিয়ে নিয়েছিলাম, আর যেদিন যা খুশি কর বাপু, কথাটি কাইব না, আমার জন্মদিনে সব হুকুম মেনে চলবে। পাগল হলে কি হবে হেরম্ব, পিতজ্ঞের কথাটি ভোলে নি। মুখ বুজে আজো মেনে চলে।’ মালতী বিজয়-গর্বে হাসে, ‘বিষ খেতে বললে তাও খায়, হেরম্ব।’
অনাথের এটুকু দুর্বলতা হেরম্ব কল্পনা করতে পারে।
‘এবার জন্মদিনে তাই বরং মাস্টারমশাইকে খেতে দেবেন, মালতী-বৌদি।’
শুনে মালতী আগুন হয়ে হেরম্বকে ঘর থেকে বার করে দেয়।
হেরম্ব আর কোথায় যাবে, প্রথম রাত্ৰিতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাড়ির পিছনে প্রাচীর ডিঙিয়ে অদূরবর্তী যে আমবাগান তার চোখে অরণ্যের মতো প্রতিভাত হয়েছিল, বানপ্ৰস্থাবলম্বীর মন নিয়ে হেরম্ব সেইখানে গেল। এখানে আছে ভোরের পাখির ডাক আর অসংখ্য কীটপতঙ্গের প্রণয়। পচা ডোবার জলে হয়তো অ্যামিবা আত্মপ্রণয়ে নিজেকে বিভক্ত করে ফেলেছে, তরু-বন্ধলের আড়ালে পিপীলিকার চলেছে শুড়ে শুড়ে প্রণয়ভাষণ, হেরম্বের পায়ের কাছ দিয়ে এক হয়ে এগিয়ে চলেছে। কর্ণজলৌক দম্পতি, গাছের ডালে ডালে একজোড়া অচেনা পাখির লীলাচাঞ্চল্য।
অনেকক্ষণ পরে সে ঘরে ফিরে আসে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে মন্দির-চত্বরে সমবেত ভক্তবৃন্দের মধ্যে সুপ্রিয়াকে আবিষ্কার করতে তার বেশিক্ষণ দেরি হয় না। তখন পূজা ও আরতি শেষ হয়েছে। মালতী বিতরণ করছে মাদুলি। তার কাছে বসে সুপ্রিয়া তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আনন্দের দিকে। হেরম্ব মিলিয়ে দেখল ক’দিনের বর্ষার পর আজ যে বাঁজালো রোদ উঠেছে, সুপ্রিয়ার চোখের আলোর সঙ্গে তার প্রভেদ নেই।
প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য মালতীর জন্মদিনে অনাথ তার সমস্ত হুকুম মেনে চলে, প্রতিজ্ঞ পালনের জন্যেই এখানে এসে হেরম্ব সুপ্রিয়াকে একখানা পত্র লিখেছিল। সুপ্রিয়া যে তাকে দিয়ে চিঠি লেখার প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল তা নয়, কথা ছিল ঠিকানা জানাবার। চিঠি না লিখে একজনকে ঠিকানা জানানো যায় না বলে হেরম্ব বাধ্য হয়ে একখানা চিঠিই লিখেছিল। ঠিকানা দিয়ে তার দুটি দরকারের কথা সুপ্রিয়া স্বীকার করেছিল! প্রথম, মাঝে মাঝে চিঠি লিখে হেরম্বকে সে তার কথা ভুলতে দেবে না। দ্বিতীয়, হেরম্ব কোথায় আছে জানা না থাকলে তার যে কেবলি মনে হয়। সে হারিয়ে গেছে, অসুখে ভুগছে, বিপদে পড়েছে–এই দুশ্চিন্তাগুলির হাত থেকে সে রেহাই পাবে।
খুশিমতো কাছে এসে হাজির হওয়ার একটা তৃতীয় প্রয়োজনও যে তার থাকতে পারে হেরম্ব আগে তা খেয়াল করে নি। একটা নিশ্বাস ফেলে সে মন্দির-চত্বরে ভক্তদের সভায় গিয়ে বসল।
‘কবে এলি, সুপ্রিয়া?’
সে যেন জানত সুপ্রিয়া পুরীতে আসবে। কবে এসেছে তাই শুধু সে জানে না।
‘এসেছি। পরশু। আপনি এখানে ক’দিন আছেন?’
‘আজি নিয়ে পনের দিন।’
‘দিন গোনার স্বভাব তো আপনার ছিল না?’—বলে সুপ্রিয়া আনন্দের দিকে কুটিল কটাক্ষপাত করল।
হেরম্ব হেসে বলল, ‘এমনি অনেকগুলি স্বভাব আমি অর্জন করেছি। সুপ্রিয়া, যা আমার ছিল না। আগেই তোকে বলে রাখলাম। পরে আর গোল করিসনে।’
মালতী রুক্ষস্বরে বলল, ‘বড় গোল হচ্ছে। এদের ঘরে নিয়ে গিয়ে বস না, আনন্দ? এটা আড্ডা দেবার বৈঠকখানা নয়।’
সুপ্রিয়া এ কথায় অপমানিত বোধ করে বলল, ‘আমি বরং আজ যাই।’
আনন্দ বলল, ‘না না, যাবেন কেন? ঘরে গিয়ে বসবেন চলুন।’
হেরম্ব আমন্ত্রণ জানিয়ে বলল, ‘আয় সুপ্রিয়া।’
অপমান ভুলে সুপ্রিয়া ঘরে গিয়ে বসতে রাজি হল। হেরম্ব জানত রাজি সে হবেই। এতক্ষণ মালতী ও আনন্দের সঙ্গে সুকীৌশলে আলাপ করে সে কতখানি জ্ঞান সঞ্চয় করেছে হেরম্ব তা জানে না, কিন্তু আনন্দকে দেখার পর এই জ্ঞানলাভের পিপাসা তার অবশ্যই এমন তীব্র হয়ে উঠেছে যে, আরো ভালো করে সব জািনবার ও বুঝবার কোনো সুযোগই সহজে আজ সে ত্যাগ করবে না। তার ভালো করে জানা ও বোঝাটাই ঠিক কি ধরনের হবে হেরম্ব তাও অনুমান করতে পারছিল। অনুমান করে তার ভয় হচ্ছিল। ভয়ের কথাই। চোখের সামনে ভবিষ্যতকে ভেঙে গুড়ো হয়ে যেতে দেখে ভয়ঙ্কর না হয়ে ওঠার মতো নিরীহ সুপ্রিয়া এখন আর নেই। মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। গল্প শুনে যে বড় হয়েছিল, বড় হয়ে ছোট ছোট কাজ করে, ছোট ছোট সেবা দিয়ে আর সর্বদা কথা শুনে চলে যে ভালবাসা জানিবার চেষ্টা করেছিল, আজ হেরম্বের সাধ্য নেই তাকে সামলে চলে। অথচ, আজকের এই সঙ্গিন প্রভাতটিতে সে আর আনন্দ দুজনকেই সামলে চলার দায়িত্ব পড়েছে তার উপরে। জীবন-সমুদ্রে তাকে লক্ষ্য করে দুটি বেগবতী অর্ণবপাত ছুটে আসছে, সে সরে দাঁড়ালে তাদের সংঘর্ষ অনিবাৰ্য, সরে না দাঁড়ালে তার যে অবস্থা হওয়া সম্ভব তাও একেবারেই লোভনীয় নয়। আজ পর্যন্ত হেরম্বের জীবনে অনেকবার অনেকগুলি সকাল ও সন্ধ্যায় কাব্যের অন্তৰ্ধান ঘটেছে। আজ সকালে কাব্যলক্ষ্মী শুধু যে পালিয়ে গেলেন তা নয়, তার সিংহাসন যে হৃদয় সেখানে প্রচুর অনর্থ ও রক্তপাতের সম্ভাবনাও ঘনিয়ে এল। অনাথের একটি কথা তার বারংবার মনে পড়তে লাগল : মানুষ যে এক পৃথিবীতে বাঁচতে আসে নি সব সময় তা যদি মানুষের খেয়াল থাকত!
