সে প্রীতিকর প্রসন্ন হাসি হেসে বলল, ‘মানুষও রোজ ভালবাসে, আনন্দ। প্রত্যেকটি ঝরে যাওয়া ভালবাসার জায়গায় আবার তেমনি একটি করে ভালবাসা জন্মায়। আমরা মানুষ, গাছপাথরের মতো সীমাবদ্ধ নই। আমাদের চেতনা সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে আছে, পৃথিবীর সমস্ত মানুষের সঙ্গে এক হয়ে আমরা বেঁচে আছি। আমি যেমন সমস্ত মানুষের প্রতিনিধি, সমস্ত মানুষ তেমনি আমার প্রতিনিধি। একটা প্ৰকাণ্ড হৃদয় থেকে একটুকরো ভাগ করে নিয়ে আমার স্বতন্ত্র হৃদয় হয়েছে, কিন্তু নাড়ি কাটার পরেও মা আর ছেলের যেমন নাড়ির যোগ থাকে, সমস্ত মানুষের সমবেত অখণ্ড হৃদয়ের সঙ্গে আমারও তেমনি আত্মীয়তা আছে। তুমি ভাবছ। এ শুধু কল্পনার বাহার। তা নয়, আনন্দ। আকাশ আর বাতাস থেকে আমার মন, আমার হৃদয় নিজেকে সংগ্রহ ও সঞ্চয় করে নি, তাদের প্রত্যেকটি কণা এসেছে মানুষের ভাণ্ডার থেকে। আমরা জনাই একটা শূন্য, আজীবন মানুষের সাধারণ হৃদয়-মনের সম্পত্তি থেকে তিল তিল করে ঐশ্বৰ্য নিয়ে সেই শূন্য পূরণ করি।–আমরা তাই পরস্পর আত্মীয়, আমরা তাই প্রত্যেকে সমস্ত মানুষের মধ্যে নিজেদের অনুভব করতে পারি। তাই আমাদের ভালবাসা যখন মরে যাবে, অন্য মানুষ তখন ভালবাসবে। আমাদের প্রেম ব্যর্থ হবে না।’
আনন্দ মুহ্যমানের মতো তাকিয়ে ছিল। বলল, ‘যাবে না?’
‘কেন। যাবে? আমরা তো একদিন মরে যাব। আমরা যদি মানুষ না হতাম, যদি নিজেদের গণ্ডির মধ্যেই প্রত্যেকে নিজেদের জেল দিতাম তাহলে ভাবতাম, মরে যাব বলে আমাদের জীবন নিরর্থক। কিন্তু যে চেতনা থাকার জন্য আমরা পশুর মতো জীবনের কথা না ভেবে বাঁচি না, মরণের কথা না ভেবে মুরি না, সেই চেতনাই আমাদের বলে দেয় যে মানুষ মরে, মানবতার মৃত্যু নেই। মানুষের জীবন নিয়ে মানবতার অখণ্ড প্রবাহ চলে বলে জীবনও ব্যর্থ নয়। তেমনি —’
‘চুপ কর।’ হেরম্বকে তীব্র ধমক দিয়ে আনন্দ কেঁদে ফেলল।
ধমকের চেয়ে আনন্দের কান্না আরো তীব্র তিরস্কারের মতো হেরম্বকে আঘাত করল। আনন্দ তো। কবি নয়।
মেয়েরা কখনো কবি হয় না। পৌরুষ ও কবিত্ব একধর্ম। নিখিল মানবতার মধ্যে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে স্তব্ধ হৃদয়ের একদা—রণিত ধ্বনির প্রতিধ্বনিকে সে কখনো খুঁজে বেড়াতে পারবে না। জগতে তার দ্বিতীয় প্রতিরূপ নেই, সে বৃহতের অংশ নয়; সম্পূর্ণ এবং ক্ষুদ্র। যে বংশপ্রবাহ মানবতার রূপ, সে তা বোঝে না। অতীত ভবিষ্যতের ভারে তাঁর জীবন পীড়িত নয়, সার্থকও নয়। সৃষ্টির অনন্ত সূত্রে সে গ্রন্থির মতো বিগত ও অনাগতকে নিজের জোরে যুক্ত করে রাখে না। পৃথিবী যেমন মানুষের জড় দেহকে দাঁড়াবার নির্ভর দেয়, মানুষের জীবনকে এরা তেমনি আশ্রয় যোগায়। পৃথিবী জুড়ে হেরম্বের আত্মীয় থাক, আনন্দের কেউ নেই। সে একা।
অনেকক্ষণ কারো মুখে কথা ছিল না। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে প্রথম কথা বলার সাহস করে হত বলা যায় না। এমন সময় হঠাৎ মালতীর তীব্র আর্তনাদ শোনা গেল।
হেরম্ব চমকে বলল, ‘ওকি?’
‘মা বুঝি ডাকল।’
বারান্দায় গিয়ে হেরম্ব বুঝতে পারল, ব্যাপার যাই ঘটে থাক অনাথের ঘরে ঘটেছে। ঘরে ঢুকে সে দেখল, অনাথ অজ্ঞান হয়ে আসনে লুটিয়ে পড়ে আছে, মৃদু ও দ্রুত নিশ্বাস পড়ছে, অতিরিক্ত রক্তের চাপে মুখ অসুস্থ, রাঙা। মালতী পাগলের মতো সেই মুখে করে চলেছে চুম্বনবৃষ্টি!
‘ও মরে গেছে হেরম্ব, আমি ওকে মেরে ফেলেছি।’
হেরম্বের চিকিৎসা চলল আধঘণ্টা। তিনি কলসী জল খরচ হল, মালতীর আউন্সখানেক কারণও কাজে লাগল। তারপর অনাথ চোখ মেলে চাইল।
‘আঃ, কি কর মালতী!’ বলে আরো খানিকটা সচেতন হয়ে অনাথ বিস্মিত দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাতে লাগল।
হেরম্ব জিজ্ঞাসা করল, ‘কি হয়েছিল?’
মালতী কপাল চাপড়ে বলল, ‘আমার যেমন পোড়া কপাল। জন্মদিন বলে একটা প্ৰণাম করতে গিয়েছিলাম, কে জানে তাতেই ভড়কে গিয়ে ভিরমি খাবে?’
অনাথের স্বাভাবিক মৃদুকণ্ঠ আরো ঝিমিয়ে গেছে। সে বলল, ‘আসনে বসলে আমাকে ছুতে তোমায় কতবার বারণ করেছি, মালতী। কঠিন যোগাভ্যাস করছি, হঠাৎ অপবিত্ৰ স্পর্শ পেলে–’
মালতী ইতিমধ্যেই খানিকটা সামলেছে।
’কিসের অপবিত্র স্পর্শ? চান করে আসি নি। আমিঃ এমনি বিদঘুটে স্বভাব জানি বলেই না পুকুরে ড়ুব দিয়ে এলাম।’
‘পুকুরে ডুব দিয়ে এলেই মানুষ যদি পবিত্র হত—’
‘আমার পোড়া কপাল তাই মরণ নেই।’
অনাথ হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘তুমি বুঝতে পার না, মালতী। পবিত্র-অপবিত্র স্পর্শের জন্য শুধু নয়, আসনে আমি যে রকম অবস্থায় থাকি আমাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে হয়, কোনো কারণে হঠাৎ বাহ্যজ্ঞান ফিরলে বিপদ ঘটে। আমি আজ মরেও যেতে পারতাম।’
মালতী কোনো সময় হার স্বীকার করে না। বলল, ‘এমন আসনে তবে বসা কেন?’
অনাথ বলল, ‘সে তুমি বুঝবে না। কিন্তু আজ তোমার জন্মদিন নয়–কাল।’
‘আজ তো আগের দিন–আজ আমার জন্মদিনের পারণ।’
অনাথ আর তর্ক করল না। ঘরের কোণে টাঙানো দড়ি থেকে একখানা শুকনো কাপড় নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল। মালতী বসে রইল মুহ্যমান হয়ে। সেও আগাগোড়া ভিজেছে। তাকে কয়েকটা সদুপদেশ দেবার ইচ্ছা হেরম্ব জোর করে চেপে গেল। এত কাণ্ডের পরেও আনন্দ এ ঘরে আসে নি খেয়াল করে সে উসখুসি করতে লাগল।
‘দেখলে হেরম্ব?’
এ প্রশ্নের জবাব হয় না, মন্তব্য হয়। হেরম্ব সাহস পেল না।
‘এমন জানলে কে মিনাসেকে ঠাট্টা করতে যেত!’
