অগত্যা বারান্দায় উঠতে হলো। প্রণাম করলাম। উনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার কাজকর্মের কথা জিজ্ঞেস করলেন।
পুলিশের অফিসার হয়েছি শুনে তিনি যেন বিশেষ খুশি হলেন না। শুধু বললেন, ওসব চাকরি বড়ো দায়িত্বজনক। বিপদের সামনে এগোতে হয়। না এগোলে দুর্নাম, এগোলে জীবন সংশয়।
হেসে বললাম, তবু তো পুলিশের কাজ কাউকে না কাউকে করতেই হবে। কেউ পুলিশের কাজ না নিলে চোর-ডাকাতদের ধরবে কে?
আমার কথায় হেরম্ব জ্যাঠা একটু অপ্রস্তুতে পড়লেন। সসংকোচে বললেন, আমি ও ভেবে বলিনি। আসলে এইসব কাজে বিপদ আছে। তুমি আমাদের ঘরের ছেলে বলেই তোমায় বললাম। নইলে আমার কি?
আমি নিতান্তই ওঁকে খুশি করবার জন্যে ভান করে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, দেখুন তো আমার শিগগিরই জীবন সংশয়ের যোগ আছে কিনা।
খুশি হওয়া তো দূরের কথা, উনি যেন একটু বিরক্ত হলেন। বুঝলেন আমি মজা মারছি। তিনি আমার হাতের দিকে তো তাকালেনই না, শুধু চোখের দিকে মিনিট দুয়েক তাকিয়ে থেকে বললেন, ভবিষ্যৎবাণী করাটা ছেলেখেলা নয় সুশান্ত। অন্য কেউ হলে উত্তরই দিতাম না। তুমি বলেই বলছি–জীবন সংশয়ের সম্ভাবনা অতি সন্নিকট।
আমি হেসেই বললাম, কবে?
উনি গম্ভীরভাবে বললেন, এক মাসের মধ্যে।
আমি আবার হাসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, বাঁচবার উপায়?
এই সময়ে বাড়ির ভেতর থেকে তার ডাক পড়ল। স্নানের সময় হয়েছে। তিনি ঘরে যেতে যেতে বললেন–এক মাসের মধ্যে কখনও একা থেকো না। বলেই চলে গেলেন। আমি নিশ্চিন্ত হলাম। এক মাসের মধ্যে একা থাকার সম্ভাবনা নেই।
.
অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা
যদিও হেরম্ব জ্যাঠার কথাটা উড়িয়ে দিয়েছিলাম তবু প্রথম কদিন মাঝে মাঝেই চিন্তা করতাম–কেন তিনি ঐরকম ভবিষ্যৎবাণী করলেন! তিনি তো অন্তত আমাকে মিছিমিছি ভয় দেখাবেন না। তাহলে?
কারও কারও ভবিষ্যত্বাণী তো মিলেও যায় বলে শুনেছি। তাহলে তাহলে কি সত্যিই এক মাসের মধ্যে এমন কোনো বিপদ আসছে যাতে আমার মৃত্যু হতে পারে?
কিন্তু তা সম্ভব কী করে? বিশেষ এটা তো কলকাতা নয় যে পথেঘাটে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এটা শান্ত নির্ঝঞ্ঝাট গ্রাম। আমার নিজের দেশ। এখানে সবাই আমার চেনাজানা। কলকাতায় হলে না হয় বোঝা যেত চোর-ডাকাতের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আমার মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু এখানে? এখানে আমি ছুটিতে। কোথাও ডাকাতি হলেও নিশ্চয় আমায় ছুটতে হবে না। তাহলে এখানে বাকি এই কটা দিনের মধ্যে আমার মৃত্যুর সম্ভাবনা কোথায়? যাই হোক দিন দুয়েকের মধ্যেই আমার মন থেকে হেরম্ব জ্যাঠার কথাটা দূর হয়ে গেল।
কয়েক দিন কেটে গিয়েছে। সুব্বা এ কয়দিনেই আমাদের বাড়ির একজন হয়ে উঠেছে। যদিও ও এখন নিয়মিত তেল মেখে সাবান দিয়ে স্নান করে, নোটনের পুরনো জামাগুলো পরে, তবু যখনই ও আমার ঘরে ঢোকে তখনই হঠাৎ মুহূর্তের জন্যে সেই বিশ্রী গন্ধটা পাই। একদিন স্ত্রীকে গন্ধর কথা বললাম। স্ত্রী অবাক হয়ে বলল কই না তো!
আমার স্ত্রী বা বাড়ির অন্য কেউ যখন গন্ধ পায় না তখন বুঝলাম ওটা আমারই ভুল। প্রথম দিনের সেই বিশ্রী গন্ধটা এখনও আমার নাকে লেগে আছে।
নারকেল গাছটা ছিল বহুকালের। কোন ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি। এত দিন পর তার মৃত্যু হলো বজ্রাঘাতে আমারই চোখের সামনে। দেখতে পাই পাতাগুলো কিরকম জ্বলে গেছে। একটা একটা করে বালদাসুদু পাতা সশব্দে খসে পড়ছে। মনটা খারাপ হয়ে যায়।
কিন্তু এসব সামান্য ব্যাপার নিয়ে মন খারাপ করলে চলবে না। যে জীবনকাহিনিটা লিখতে আরম্ভ করেছি, তাড়াতাড়ি সেটা শেষ করতে হবে। ছুটি ফুরোতে আর বেশি দিন নেই। আর এও জানি কলকাতায় গিয়ে কাজের মধ্যে পড়লে লেখা আর শেষ হবে না।
কিন্তু তাড়াতাড়ি শেষ করব বললেই তো আর শেষ করা যায় না। এই যে সেদিন সন্ধেবেলায় ঘটনাটা ঘটল, যত সামান্যই হোক, তবু তো ভুলতে পারছি না। কেন সুব্বা চুপি চুপি আমার ঘরে ঢুকেছিল, কেনই বা আলো নিভিয়ে দিয়ে আমায় ভয় দেখাতে চেয়েছিল, ঘরের মধ্যে কী এমন দেখে নোটন চিৎকার করে উঠেছিল? যতই সন্তোষজনক উত্তর পাই না, ততই কৌতূহল বাড়ে, ততই কেন যেন সুব্বাকে লক্ষ করি। ওকে বোঝবার চেষ্টা করি। ছেলেটা ঠিক আর-পাঁচটা ছেলের মতো নয়। ওর অদ্ভুত কাজকর্মের কিছু নমুনা নেপালের হোটেলে দেখেছিলাম। অবাক হয়েছিলাম বটে তবু কেমন অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। এখানে এসেও একদিন ঐরকম একটা ঘটনা ঘটিয়ে বসল।
দুপুরবেলায় নোটন ছাদে ঘুড়ি ওড়ায়। নেপালে ঘুড়ি ওড়ে কিনা জানি না তবে সুব্বা কখনো ঘুড়ি দেখেনি। তার খুব উৎসাহ। নোটনের সঙ্গে সেও ছাদে দাপাদাপি করে বেড়ায়।
সেদিন দুপুরে খেয়েদেয়ে নিজের ঘরে বসে লিখছিলাম। হঠাৎ বাড়ির পিছনে মড়মড় শব্দ করে কী যেন ভেঙে পড়ল। চমকে উঠলাম। কী ভাঙল! কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি তো? ছুটে গেলাম ছাদে। ততক্ষণে আমার স্ত্রী, আমার ছোটো ভাই আর ভাইয়ের স্ত্রীও ছাদে ছুটে এসেছে। যে অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম তাতে সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। আমাদের বাড়ি থেকে বিশ ত্রিশ হাত দূরে একটা আমগাছ। দেখি তারই একটা ডাল ধরে সুব্বা ঝুলছে। ঝুলছে নয়, দোল খাচ্ছে। আর নোটন লাটাই হাতে করে স্তম্ভিত হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে।
কী ব্যাপার? ব্যাপারটা এই–নোটনের ঘুড়িটা আমগাছে আটকে গিয়েছিল। কিছুতেই ছাড়াতে পারছিল না। তখন নাকি সুব্বা পাঁচিলে উঠে এক লাফ দিয়ে আমগাছে গিয়ে পড়ল। ঘুড়িটা খুলে নিচে ফেলে দিল। আর তার পরেই গোটা ডালটা মড়মড় করে ভেঙে পড়ে। রাজু ততক্ষণে আর একটা ডাল ধরে ঝুলতে থাকে।
