আরও আশ্চর্যের কথা–পরে জেনেছিলাম সেদিন সুব্বাই চুপি চুপি একা ঘরে ঢুকে আলোটা নিভিয়ে দিয়েছিল। নোটন যে ওকে চুপি চুপি ঘরে ঢুকতে দেখে কৌতূহলের বশেই ঘরে ঢুকেছিল, সুব্বা তা টের পায়নি। ঘর অন্ধকার করে সুব্বা আমাকে ভয় দেখাতে যাচ্ছে ভেবে নোটন জোরে হেসে উঠেছিল।
কিন্তু যে ছেলেটা আমার কথা শুনতে চায় না, ডাকলে সাড়া দেয় না, কাছে ঘেঁষে না, সে কেন ঘর অন্ধকার করে আমার সঙ্গে মজা করতে এল?
এ কথা নিয়ে বাড়িতে কারও সঙ্গে আলোচনা করিনি। নিজের কাছেও সদুত্তর পাইনি।
এ ছাড়া অন্ধকার ঘরে কেন কি দেখে নোটন অমন ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল তাও ঠিক আমার কাছে পরিষ্কার হয়নি। সত্যিই ও ঘরের মধ্যে জ্বলন্ত চোখ দেখেছিল কিনা, কিংবা কার চোখ তাও অমীমাংসিত থেকে গেছে।
.
ভয়ংকর ঘণ্টাকর্ণ
সুব্বাকে পাবার পিছনে একটা বিশেষ ঘটনা আছে।
নেপালের কাঠমাণ্ডুতে যে হোটেলে প্রণবেশ আর আমি উঠেছিলাম, সে হোটেলটি একেবারে শহরের মধ্যে। হোটেলে বেশ কয়েকজন অল্পবয়সী ছোকরা কাজ করত। আমাদের যে দেখাশোনা করত সে নেপালী হলেও বাংলা বুঝত আর মোটামুটি বলতেও পারত। সে বলত–এখানে বাঙালিবাবুরাই বেশি বেড়াতে আসে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাংলা শিখে গেছি।
ওর নাম জং বাহাদুর। ও বাংলা জানায় খুব সহজেই ওর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিলাম। শুনে কষ্ট হলো ওদের মতো যারা হোটেলে কাজ করে তারা খুবই গরিব। তাই অল্পবয়সী ছেলেরাও কাজের খোঁজে ইন্ডিয়ায় চলে যায়। শিলিগুড়ি, কলকাতাই তাদের লক্ষ্য।
আমার তখনই মনে হলো কলকাতায় আমার বাসার জন্যে ঐরকম একটা কাজের ছেলের দরকার। কলকাতায় তো চট করে কাজের ছেলে পাওয়া যায় না। তাই জং বাহাদুরকে বলেছিলাম–তোমার মতো একটা ছেলে পেলে আমিও নিয়ে যাই।
জং বাহাদুর বলেছিল–দেখব।
তারপর ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম–কাঠমাণ্ডুতে দেখবার কী কী আছে?
ও এক নিশ্বাসে অনেকগুলো জায়গার নাম করে গেল বুড়ো নীলকণ্ঠ, স্বয়ম্ভু মন্দির, দক্ষিণাকালী বাড়ি, গুর্জেশ্বরী মন্দির, দেবী কুমারী বা জীবন্ত দেবী আর পশুপতিনাথ তো আছেনই।
জিজ্ঞেস করেছিলাম–এখানে উৎসব কী কী হয়?
ও চটপট উত্তর দিয়েছিল ত্রিবেণী মেলা, শ্রীপঞ্চমী, মাঘী পূর্ণিমা, মহাশিবরাত্রি, হোলি, নববর্ষ
বাধা দিয়ে বলেছিলাম–তা তো বুঝলাম। কিন্তু এখন কোনো উৎসব হয় কি?
–হয় বৈকি। খুব উৎসাহের সঙ্গে ও উত্তর দিয়েছিল–নাগপঞ্চমী, ঘণ্টাকর্ণ। জিজ্ঞেস করেছিলাম–ঘণ্টাকর্ণ কি?
ও হঠাৎ চোখ বুঝিয়ে দু হাত জোড় করে কারও উদ্দেশে যেন নমস্কার করল। তার। পর যা বলল তার মানে হলো–ঐ পুজোটা হচ্ছে দানব আর অশুভ আত্মাদের সন্তুষ্ট করার জন্যে। এই জুলাই-আগস্ট মাসে নেপালের পাহাড়ে পাহাড়ে অশুভ শক্তিরা ঘুরে বেড়ায় দানবের মূর্তি ধরে। তাদের সামনে পড়লে মানুষ, জীবজন্তু কারো রক্ষা নেই। তাদের আটকাবার ক্ষমতাও কারো নেই। তাই সেই দানব-দেবতাদের পুজো দিয়ে সন্তুষ্ট করে সসম্মানে বিদেয় করার চেষ্টা। এই জন্যেই ঘণ্টাকর্ণ পুজো।
এইসব অশুভ আত্মা, দানব-দেবতার কথা শুনে ঘণ্টাকর্ণ পুজো দেখবার খুব ইচ্ছে হলো আমাদের। ওকে বলাতে ও খুব উৎসাহ করে কোথা দিয়ে কেমন করে যেতে হবে তার হদিস বলে দিল। শেষে গলার স্বর নিচু করে বললে,–এখানে যাবেন যান। কিন্তু কেউ বললেও যেন দক্ষিণের ঐ উঁচু পাহাড়টার নিচে যাবেন না।
জিজ্ঞেস করলাম–কেন? ওখানে কী আছে?
ও একটু চুপ করে থেকে বললে, ঐ পাহাড়ের নিচে একটা নদী আছে। সেই নদীর ধারে একটা গুহায় ঘণ্টাকর্ণের এক ভয়ংকর মূর্তি আছে। ওখানেও ঘণ্টাকর্ণের পুজো হয়। কিন্তু সে পুজো খুব গোপন। বাইরের লোক তো দূরের কথা–সব নেপালীরাও ওখানে যেতে পারে না। গেলে আর তাদের ফেরা হয় না।
প্রণবেশ ব্যাপারটা আমাকে বুঝিয়ে বললে যে, আমাদের দেশে যেমন নির্জন জায়গায় তান্ত্রিক, কাঁপালিকরা গোপনে কালীপুজো করে, এও সেইরকম। তান্ত্রিক, কাঁপালিকরা যেমন ভয়ংকর প্রকৃতির লোক হয়, এরাও সম্ভবত সেইরকম।
যাই হোক দিন তিনেক পরে জং বাহাদুরই একটা জিপের ব্যবস্থা করে দিল। ড্রাইভার আমাদের কাছাকাছি দুতিন জায়গায় ঘণ্টাকর্ণ পুজো দেখিয়ে আনবে।
বেঁটেখাটো ফর্সা ধবধবে নেপালি ড্রাইভার। ঠিক যেন একটা মেশিন। চমৎকার ড্রাইভ করে নিয়ে গেল পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে।
দুজায়গায় ঘণ্টাকর্ণ পুজো দেখলাম। পাহাড়ের নিচে খানিকটা সমতল জায়গায় বেশ লোকের ভিড়। সেখানে মাদলের মতো একরকম বাজনা বাজছে দ্রিম দ্রিম করে। সারা গায়ে কালো কাপড় জড়িয়ে মুখে ভয়ংকর একটা মুখোশ এঁটে একটা মূর্তি তেড়ে তেড়ে যাচ্ছে। আর একজন পুরোহিতের মতো লোক ফুল ছুঁড়ে ছুঁড়ে তাকে মারছে। জানলাম এইরকম করেই নাকি পুজোর মধ্যে দিয়ে অশুভ শক্তির দানবকে তাড়ানো হয়। ঘণ্টাকর্ণের নকল ভয়ংকর মূর্তি ছাড়া আর কিছুই তেমন মনে দাগ কাটল না।
এবার আমাদের হঠাৎ ইচ্ছে করল সেই পাহাড়ের নিচে নিষিদ্ধ পুজোটা দেখার। কিন্তু ড্রাইভার রাজি হলো না। ওখানকার কথা তুলতেই ভয়ে ওর মুখ শুকিয়ে গেল। ওকে আমরা অনেক করে বোঝালাম যে, কোনোরকম ভয় নেই। ভূত, প্রেত, দানব, অশুভ শক্তি যাই থাকুক না কেন, এই রিভলভারের কাছে সব ঠান্ডা হয়ে যাবে বলে কোটের পকেট থেকে রিভলভার বের করে দেখালাম। তাছাড়া আমরা যে দুজনেই কলকাতার পুলিশের অফিসার তাও জানিয়ে দিলাম।
