মিনিট দুয়েক পরে লামা বললেন, আপনি এখন রোগমুক্ত। বলে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। মেমসাহেব তাঁকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি কিছুই নিলেন না।
মেমসাহেব নিজের মনেই শুধু বললেন- am grateful to you Indian yogi–I am grateful.
পরের দিনই সাহেবের চিঠি এল। লিখছেন–একটা মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। যাই হোক ঈশ্বরের কৃপায় এখন আমি বিপন্মুক্ত। রওনা হচ্ছি।
পুনশ্চ দিয়ে লিখেছেন-খুব আশ্চর্য ব্যাপার হঠাৎ কাল আমার ঘরের সামনে একজন ইন্ডিয়ান যোগীকে দেখলাম। তারপরেই অদৃশ্য। সম্ভবত আমার চোখেরই ভুল।
মিস থাম্পি তার কথা শেষ করে একটু থামলেন। তার পর জল খেয়ে রুমালে মুখ মুছলেন।
–এ কাহিনী আপনাদের শোনাবার উদ্দেশ্য এটাই বোঝানো যে, এও এক ধরনের অলৌকিক ক্রিয়া। কিন্তু এটা ম্যাজিক বা যাদু নয়। এ যোগসাধনা। এই যোগের দ্বারাই আপনি এই মুহূর্তে কী ভাবছেন তা বলে দেওয়া যায়। এই যোগের দ্বারাই আগামী চাব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনার জীবনে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটবে কি না জানানো যায়। কঠিন ব্যাধির কারণ ও উৎপত্তিস্থল ধরা যায়।
এই যোগ যাঁর আয়ত্ত তিনি তেমন-তেমন বাড়িতে ঢুকেই বলতে পারেন সেখানে কোনো অশরীরী আত্মার আবির্ভাব ঘটে কিনা। বিজ্ঞানে কিন্তু এর ব্যাখ্যা মেলে না।
অশরীরী আত্মার টের পাওয়া যায়–মিস থাম্পির এই কথায় সকলেই যেন একটু বিচলিত হল।
একটু থেমে মিস থাম্পি বললেন, এরকম অনেক তথ্য রবার্ট ডাল আওয়েল-এর Foot falls on the Boundary of Another World বইটিতে পাওয়া যায়। পুরনো কোনো বড়ো লাইব্রেরিতে খোঁজ করে দেখতে পারেন–of course should you be so interested.
মিস থাম্পি থামলেন। ঘড়ির দিকে তাকালেন। সাড়ে বারোটা।
গল্পে গল্পে অনেক রাত হয়ে গেছে। মিস থাম্পি বললেন, তাহলে এবার শুতে যাওয়া যাক?
মান্তু বলল, কিন্তু আপনি ভুটানে কেন যাচ্ছেন বললেন না তো?
–শুনতে চান?
–নিশ্চয়ই। মান্তু আর রীণা দুজনেই উৎসাহে বলে উঠল।
–আপনি? মিস থাম্পি সহাস্যে সঞ্জয়ের দিকে তাকালেন।
সঞ্জয় সলজ্জভাবে বলল, আমার বড় ঘুম পাচ্ছে। কাল সকালেই তো আবার ছুটতে হবে।
রীণা বলল, তুমি তবে ওঘরে গিয়ে শোও গে।
সঞ্জয় অবশ্য গেল না। আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে চোখ বুজে বসে রইল।
মিস থাম্পি বললেন, বিস্তৃত করে বলতে গেলে রাত শেষ হয়ে যাবে। সংক্ষেপে বলি।ভুটানে যাচ্ছি সেখানকার একটি মেয়েকে স্টাডি করতে। ডাঃ কুমার আমার খুব পরিচিত। তিনি সম্প্রতি সাদার্ন ভুটানের ডিস্ট্রিক্ট টাউন সারভং-এ গিয়েছেন সেখানকার হাসপাতালের এম. ও. হয়ে। ওখান থেকে তিনি আমায় কয়েকখানা চিঠি লিখেছেন।
ডাঃ কুমার ওখানে কোয়ার্টারে একা থাকেন। রাঁধা-বাড়া করার জন্যে উনি একটি লোক খুঁজছিলেন। অনেক কষ্টে একটি মেয়ে পান। মেয়েটির নাম সুখমতী। বয়েস উনিশ-কুড়ি। মেয়েটি কথা বলে না। কিন্তু সে বোবা নয়। কেননা সে শুনতে পায়। মেয়েটির কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু যন্ত্রের মতো কাজ করে যায়। সে সারাদিন কোয়ার্টারে থাকে। কিন্তু ঠিক রাত নটা বাজলেই সে বাড়ি চলে যায়। ব্যতিক্রম হয় না।
ডাঃ কুমার হুঁশিয়ার লোক। তিনি যখনই কোনো কাজের লোক লাগান তখনই তার ঠিকানা নিয়ে রাখেন। সুখমতীরও ঠিকানা নিয়েছিলেন।
এদিকে সুখমতী কাজে লাগার দু দিন আগে পাহাড়তলীতে একটা জিপ অ্যাকসিডেন্ট হয়। সেটাও নাকি অদ্ভুত ঘটনা। যাই হোক, জিপে যে-সব লোক ছিল তারা সবাই ঘেঁৎলে মরে যায়। ওদের মধ্যে একটি যুবতী মেয়ে ছিল। তার লাশ কিন্তু পাওয়া যায়নি। অথচ সেই নিদারুণ অ্যাকসিডেন্ট থেকে কেউ যে বেঁচে পালাবে তাও নাকি অসম্ভব।
যাই হোক, সেদিনের মতো লাশ তিনটে হাসপাতালের ল্যাবরেটরি-ঘরের কাছে রাখা হয়।
একদিন হাসপাতালের দারোয়ান দীন বাহাদুর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ডাঃ কুমারকে বলল, সাব, বক্সী!
–ওদেশে ভূতকে বক্সী বলে।
ডাঃ কুমার অবাক হয়ে বললেন, বক্সী! কোথায়?
দীন বাহাদুর বলল, ল্যাবরেটরির পাশে যে ঘরে লাশ ছিল সেখানে।
তার বক্তব্য–রাত্রে পাহারা দিতে দিতে ও একটা শব্দ শুনে লাশ-ঘরের দিকে যায়। সেখানে একটা গোঙানি শুনতে পায়। কৌতূহলী হয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে যেখানে তিনটে লাশ ছিল সেখানে একটা মেয়ে শোবার জায়গা করে নিতে চাইছে। কিন্তু যেন কিছুতেই জায়গা পাচ্ছে না। মেয়েটার গায়ে জামা-কাপড় কিছুই ছিল না।
তারপর যে কথাটা দীন বাহাদুর নাকি এতটুকু ইতস্তত না করেই বলে ফেললে তা এই যে–সে মেয়েটি সুখমতী ছাড়া আর কেউ নয়।
ডাক্তার কুমার তো চমকে উঠলেন। তিনি অবিশ্বাস করলেন। দীন বাহাদুর হলপ করে বলল, সে খুব ভালো করে নজর করে দেখেছে সে সুখমতীই।
ডাক্তার কুমার তবু যখন বিশ্বাস করতে চাইলেন না তখন দীন বাহাদুর বলল, ঠিক আছে আজই দেখা যাক, সুখমতী রাত্তিরে কি করে।
সেদিনও সুখমতী ঠিক রাত নটায় কাজ সেরে চলে গেল। দীন বাহাদুর তখন ডাক্তার কুমারের কোয়ার্টারে। সুখমতী যখন চলে যাচ্ছে দীন বাহাদুর তখন ফি ফিস্ করে বলল, সাব, দেখুন ওর হাঁটাটা কি রকম।
ডাঃ কুমার এতদিন লক্ষ্য করেননি। আজ দেখলেন–হ্যাঁ, হাঁটাটা একটু অস্বাভাবিক। কেমন যেন লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে তার লম্বা হাত দুটো যেন বড্ড বেশি দুলছিল।
