রাত দুটোয় ডাক্তারকে নিয়ে দীন বাহাদুর সুখমতীর ঠিকানা খোঁজ করতে বেরোল। বেরোবার আগে একটুকরো ন্যাকড়া ডাক্তারের হাতে দিয়ে বলল, এটা সঙ্গে রাখুন সাব। অনিষ্ট করতে পারবে না।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর যে ঠিকানাটা ওরা খুঁজে পেল সেটা একটা ভাঙা ঘর, একেবারে লোকালয়ের বাইরে।
সুখমতী–সুখমতী করে ডাক্তার ডাকাডাকি করলেন। কিন্তু কারো সাড়া পেলেন না। তখন দুজনে দুটো টর্চ জ্বেলে ভেতরে ঢুকলেন। কেউ কোত্থাও নেই। শুধু সুখমতীর ছাড়া কাপড়টা পড়ে আছে।….
এই পর্যন্ত বলে মিস থাম্পি থামলেন।
–খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। এ বিষয়ে আপনার কি মনে হয়? মান্তু জিজ্ঞেস করল।
–আগে ভুটানে গিয়ে সুখমতাঁকে দেখি। নিজে না দেখে, না কথা বলে আমি কোনো কমেন্ট করব না। তবে আমার শুধু একটাই জানার আছে–সুখমতী কেন চাকরি নিল? কেন ডাক্তার কুমারের কাছেই? কিন্তু আর নয়। এবার সবাই শুয়ে পড়ুন।
.
শীতের রাত। গোটা শহর যেন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। সামনে যশোর রোড যেন দেহ প্রসারিত করে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। ওদিকে সঞ্জয় বসে বসেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথাটা হেলে পড়েছে চেয়ারে। শুধু এরা তিন জনই জেগেছিল এতক্ষণ।
এই সময়ে হঠাৎ পুপু কেঁদে উঠল। সেই মর্মান্তিক যন্ত্রণায় কেঁদে ওঠা। রীণা চমকে উঠে ছুটে গিয়ে পুপুকে বুকে তুলে নিল। ঘুম ভেঙে গেল সঞ্জয়ের। লাফিয়ে ছুটে গেল পুপুর বিছানায়। এ কান্না যে তাদের চেনা।
মান্তু কি হল? কি হল? বলে রীণার কাছে গিয়ে বসল। শুধু মিস থাম্পি স্থির হয়ে বসে পুপুর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কান্না থামে না। দেখতে দেখতে পুপুর সমস্ত মুখটা যেন কি রকম হয়ে গেল। রীণা আর্তস্বরে বলে উঠল কী হবে? কান্না থামছে না যে?
রীণা জানে, এ কান্না থামাবার সাধ্য ডাক্তারের নেই।
মিস থাম্পি উঠে দাঁড়ালেন। একবার ভুরু কুঁচকে খোলা দরজা দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালেন। তারপর গায়ের চাদরটা ফেলে দিয়ে পুপুর কাছে এগিয়ে গেলেন। পুপু তখন কাঁদতে কাঁদতে ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। রীণা পাগলের মতো মিস থাম্পির হাত দুটো চেপে ধরে কেঁদে উঠল। কী হবে? এমন করে তো ও কখনো কাঁদে না।
সেই অশরীরীর আবির্ভাব হলেই যে পুপু কেঁদে ওঠে, মিস থাম্পি আগে তা শুনেছিলেন। তিনি একদৃষ্টে কিছুক্ষণ পুপুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার পর আস্তে আস্তে একবার তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। রীণাকে বললেন, তুমি এবার ওকে বুকে তুলে নাও।
–ও ঘুমোত পারবে না। দেখছেন না–
–আমি বলছি, ঘুমোবে। তুমি বুকে নাও। আদেশের সুরে বললেন মিস থাম্পি।
রীণা পুপুকে বুকের কাছে টেনে নিতেই পুপুর কান্না আস্তে আস্তে থেমে গেল। তারপর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল।
এবার মিস থাম্পি উঠে দাঁড়ালেন। স্থির গম্ভীর স্বরে বললেন, সে বোধহয় এসেছে। আপনারা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ুন।
সঞ্জয়ও কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। কিন্তু সে যে আজ কোথায় শোবে ভেবে পেল না।
মিস থাম্পি বললেন, শোবার ব্যবস্থা আমিই করে দিচ্ছি।
-বাইরের ঘরে এই ডিভানে মিসেস গুপ্ত যেমন বাচ্চাকে নিয়ে শুয়েছেন শোন। আপনি শোন মেঝেতে এইখানে। বলে মান্তুকেও জায়গা নির্দেশ করে দিলেন।
–ডাঃ গুপ্ত, আপনি প্লিজ চলে যান ভেতরের ঘরে। নিশ্চিন্তে ঘুমোন গিয়ে।
–আপনি?
মিস থাম্পি একটু হাসলেন।–আমি শোব না। বসে থাকব সিঁড়ির মুখে। আজকের রাতের মতো আমার কথা অনুগ্রহ করে শুনবেন। বলে নিজেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউই ঘুমোত পারল না। কিসের যেন দুঃসহ প্রতীক্ষা। তারপর একসময়ে সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল।
.
সবার আগে ঘুম ভাঙল মান্তুর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রীণার। দুজনেই একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। রাত্তিরটা তাহলে নিরাপদেই কেটেছে।
সঞ্জয় তখনো ঘুমোচ্ছ। কিন্তু মিস থাম্পি? তিনি কি এখনও বাইরে বসে আছেন?
তাড়াতাড়ি এরা দুজনে বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল মিস থাম্পি নেই। শূন্য চেয়ারটা শুধু পড়ে রয়েছে।
দুজনের মুখ শুকিয়ে গেল।
–উনি কোথায় গেলেন? মান্তুর গলার স্বর ভয়ে কাঁপছে।
–তাই তো। বলেই রীণা সঞ্জয়কে ঘুম থেকে তুলে সব কথা বলল। সঞ্জয় ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এল।
তখনো ভোর হয়নি। শীতের কুয়াশায় চারিদিক পর্দাটাকা। বাড়ির অন্যান্য ভাড়াটেরা তখনো সুখনিদ্রায় নিশ্চিন্ত।
সঞ্জয় কি করবে ভাবছে। এমনি সময়ে সিঁড়িতে হালকা চটির শব্দ। মিস থাম্পি ওপরে উঠে আসছেন।
বাবাঃ! এই কুয়াশায় কোথায় গিয়েছিলেন?
মিস থাম্পি হেসে বললেন, প্রাতঃভ্রমণে। কম্পাউন্ডের মধ্যেই ঘুরছিলাম। বেশ পুরনো আমলের বাড়ি। ফোয়ারার সামনে যে স্ট্যাচুটা–সেটা কোনো অবস্থাপন্নরই কীর্তি। তাঁর রুচিটা পবিত্র ছিল না। চলুন ভেতরে গিয়ে বসি। একটু গরম কফি খাব।
কফি খেতে খেতে সকলেই উদগ্রীব হয়ে মিস থাম্পির দিকে তাকিয়ে রইল কিছু শোনার অপেক্ষায়। কিন্তু মিস থাম্পি একটি কথাও বললেন না।
কফি খাওয়া শেষ হলে মাকে বললেন, এবার আমাদের যেতে হবে।
সঞ্জয় আর থাকতে পারল না। বলল, কিন্তু কাল রাত্তিরের experience তো কিছু বলছেন না।
বললে কি আপনি বিশ্বাস করবেন?
মিস থাম্পি একটু হাসবার চেষ্টা করলেন।
–শুনতে দোষ কি?
–তবে শুনুন। একটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হিংস্র আত্মা এ বাড়িতে আছেই। সে ক্ষতি না করে যাবে না। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইবেন না। প্রমাণ দিতে পারব না।
