সঞ্জয় আর ভাবতে পারল না। ঘরে ঢুকে সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি করতে লাগল।
ঝড়ের তাণ্ডব নৃত্য চলল প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে। ঝড় যখন থামল রাত তখন নটা। ভাগ্য ভালো। বৃষ্টি নামেনি।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সঞ্জয় দেখল যশোর রোড একদম ফাঁকা। খাঁ-খাঁ করছে। লোক চলাচল তো নেইই, বাস-ট্যাক্সিও চোখে পড়ল না।
দারুণ দুর্ভাবনায় পড়ল সঞ্জয়। নিশ্চয় রীণার কিছু বিপদ হয়েছে। আর পুপুটা? ভাবতে ভাবতে সঞ্জয় অস্থির হয়ে উঠল।
এখন কি করবে? কোথায় খবর নেবে? পরামর্শ করে এমন কেউ কাছের মানুষ নেই। একবার ভাবল দোতলায় গিয়ে খবর নেয় নিখিলবাবু ফিরেছেন কিনা। এবাড়িতে যত ভাড়াটে আছেন তাদের মধ্যে নিখিলবাবুই একমাত্র সিরিয়াস লোক। ওঁর সঙ্গেই কথা বলা চলে। তবু সঞ্জয় গেল না। কে জানে ভদ্রলোক কী মনে করবেন!
অনেক ভেবে সঞ্জয় ঠিক করল মান্তুদের বাড়িই যাবে। হয়তো ওকে আটকে দিয়েছে।
কিন্তু মান্তুদের বাড়ি তো চেনে না। ঠিকানা? না, ঠিকানাও জানা নেই।
কি মনে হল উঠে ড্রয়ার টেনে মান্তুর চিঠিগুলো খুঁজতে লাগল।
একটা চিঠি পেল।–ভাই রীণা….।
নাঃ, ঠিকানা নেই। শুধু ক্ষীরোদতলা, হাওড়া।
শুধু ক্ষীরোদতলা বললে কি এই রাত্তিরে কারো বাড়ি খোঁজ করা যায়? অসম্ভব।
সঞ্জয় আবার চিঠি খুঁজতে লাগল।
আরো একটা চিঠি।
ভাই রীণা….।
আহা, ঠিকানা ছিল কিন্তু খাম খুলতে গিয়ে ঐ জায়গাটা ছিঁড়ে গেছে।
সঞ্জয় পাগলের মতো ড্রয়ার টেনে খুলে সব কাগজ হাতড়াতে লাগল।
এই যে আরো চিঠি রয়েছে।….
নাঃ–কোনোটাতেই পুরো ঠিকানা নেই।
সঞ্জয় যখন একেবারে হতাশ তখন ড্রয়ারের কোণ থেকে বেরোল দুমড়োনো একটা খাম। তাড়াতাড়ি চিঠিখানা বের করল। এইটে বোধহয় মান্তুর প্রথম চিঠি।
হ্যাঁ, এই যে ঠিকানা রয়েছে।
ঠিকানা লিখে নেবার ধৈর্য তখন আর নেই। চিঠিটা পকেটে পুরেই সঞ্জয় ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
দরজায় তালা লাগাচ্ছে, মনে হল কেউ দ্রুত পায়ে ওপরে আসছে।
সঞ্জয় শিরদাঁড়া খাড়া করে দাঁড়াল। নিশ্চয় কোনো বিপদের
কাকু, আপনার ফোন।
সঞ্জয় দৌড়ে নেমে গেল।
.
০৯.
রীণা কি ফেরেনি
সকাল হতে না হতেই মান্তু কাপড় পরে নিল। কাল সারা রাত রীণার কথা ভেবে ঘুমোতে পারেনি। অমন তো কত জনেই আসবে বলে আসে না বা। আসতে পারে না। তখন মোটেই ভাবনা হয় না। রীণা বলেই এত দুর্ভাবনা। প্রথমত, ও কলকাতায় নতুন। কে জানে কোন বাসে চড়তে কোন্ বাসে চড়ল। কোথায় আসতে কোথায় গিয়ে পড়ল। দ্বিতীয়ত, ও যেন ঠিক সুস্থ নয়। আর যে-মানুয মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে তার সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না।
অথচ একথাটা আগে মনে হয়নি। মনে হলে নিশ্চয় একা আসতে বলত না।
ভাবতে ভাবতে মান্তু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কী যে হলো মেয়েটার!
ললিতবাবু বললেন, চা খেয়ে যাবে না?
-না। বলেই মান্তু তখনই বেরিয়ে পড়ল। ওর শরীরের ওপর যেন অসময়ে ভারী গরম কোট চাপানো রয়েছে। খুলে ফেললেই আরাম। কিন্তু খুলব বললেই খোলা যাচ্ছে না। মনের মধ্যে কেবলই খারাপ চিন্তা ঘুরে ফিরে আসছে। গিয়ে কি দেখবে! কি শুনবে!
যদি দেখে, রীণা বাড়ি নেই? যদি শোনে রীণা কাল দুপুরে সেই যে হাওড়া যাবে বলে বেরিয়েছিল এখনো পর্যন্ত ফেরেনি?
তাহলে কি করবে?
যদি দেখে বাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে? লোকে ভিড় করে আছে থমথমে মুখে?
তাহলে কি বুঝবে?
কী বুঝবে তা আর কল্পনা করতে হয় না।
মান্তুর বুকের মধ্যে কিরকম করতে লাগল।
একবার ভাবল–গিয়ে দরকার নেই। ফিরেই যাবে। প্রিয়জনের কোনো মর্মান্তিক খবর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে শোেনার শক্তি তার নেই।
তারপরেই ভাবল রীণা না হয়ে যদি তার বাড়ির কেউ হতো তাহলে কি পারত পালিয়ে থাকতে?
না, পারত না। কাজেই এখানেও তাকে মুখোমুখি হতেই হবে, যত খারাপ ঘটনাই ঘটে থাকুক না কেন।
মান্তু এবার যেন মনে জোর পেল।
ক্ষীরোদতলার মোড়ে আসতেই বাস পেয়ে গেল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ময়দানে এসে পৌঁছল। বঙ্গবাসী সিনেমাহলের কাছ থেকে নাগেরবাজারের টানা বাস ছাড়ছিল। বাসটা কালিন্দি, লেকটাউন, বাঙ্গুর হয়ে যাবে। ছুটে এসে হাত তুলে বাস থামিয়ে কোনোরকমে উঠে পড়ল।
এক ঘণ্টার পথ। এত সকাল বলেই বাসে ভিড় ছিল না। জানলার ধারে ভালো সীট পেয়ে গেল। অন্য সময় হলে এইরকম সীটের জন্যে খুশি হতো। কিন্তু আজ মনটাই অন্যরকম হয়ে আছে।
…লেকটাউন, বরাট পার হয়ে গেল। পরের স্টপেজটাই রীণাদের। মান্তু রড ধরে উঠে দাঁড়াল। পা দুটো তখন ওর কাঁপছে।
বড়ো রাস্তা পার হয়ে সরু রাস্তা। মিনিট পাঁচেক পরেই দেখা গেল ওদের বাড়ির গম্বুজটা। মান্তু সমস্ত শক্তি নিয়ে হনহন করে কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকল।
.
১০.
অদৃশ্য মানুষ-দৃশ্য চোখ
সঞ্জয়ের ইচ্ছে ছিল না মান্তুদের বাড়ি রীণা একা যায়। মান্তু অবশ্য দুজনকেই যাবার কথা বলেছিল। কিন্তু সঞ্জয়ের তো সপ্তাহে একটি দিনই ছুটি। আর সপ্তাহে এই একটি দিন সঞ্জয় কোথাও নড়তে চায় না। তাই ছমাসের বেশি হল ওরা এখানে এসেছে, অথচ একদিনও মান্তুর কাছে যাওয়া হয়নি। শেষে মান্তুই একদিন সকালে এসে রীণাকে নিয়ে গিয়ে সেদিনই সন্ধ্যায় পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল। দুই সখীতে ঠিক করেছিল–এরপর রীণা একাই যাবে-আসবে। মান্তুও মাঝে-মাঝে আসবে।
