তৃষ্ণা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। মনে হয় আমার কথাবার্তায় মজা পাচ্ছিল। সে বলল, আপনি অকারণে গালাগালি করছেন কেন?
ডক্টর জিলুর খান বললেন, গালাগালি করা অবশ্যই ঠিক হচ্ছে না। এই কুত্তার বাচ্চাকে আমি লাখি দিয়ে পানিতে ফেলব। সেটাই হবে সঠিক কাজ।
প্রফেসর সাহেব বাক্য শেষ করার আগেই আতর মিয়া কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দরজা কোনটা ভাঙব?
আমি বললাম, পাশেরটা।
আতরের প্রচণ্ড লাথিতে দরজা ভেঙে গেল। কেবিনে চামচিকার মতো এক প্রৌঢ়, তার পাশে সম্পূর্ণ নগ্ন এক তরুণী। তরুণী আচমকা দরজা খোলায় হকচকিয়ে গেছে। গা ঢাকার কাপড় খুঁজছে। এইসব ক্ষেত্রে যা হয়—কাপড় পাওয়া যাচ্ছে না। মার্ফিস ল কাজ করছে। মার্ফি সাহেবের সূত্র বলে, যখন যেটা প্রয়োজন তখন তুমি তা পাবে না। যখন প্রয়োজন নেই, তখন সেই জিনিসই চোখের সামনে পড়ে থাকবে। কেবিনের ভেতর কোনো মোরগ বা মুরগি দেখা গেল না।
অধ্যাপক সাহেব নগ্ন তরুণী দেখে যথেষ্ট আনন্দ পাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। চোখের পাতা ফেলা সাময়িক বন্ধ রেখেছেন।
আমি আমার গায়ের চাদর বের করে প্রৌঢ়ের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললাম, চাদরটা দিয়ে ঢেকে দিন।
আতর মিয়া বলল, ঐ শিয়ালের বাচ্চা বাইর হ। ফুর্তি অনেক হইছে। ফুর্তি শেষ। বাইর হে কইলাম। এক্ষণ বাইর না হইলে ঘেটি চিপ দিয়া বাইর করব।
গাল ভাঙা চামচিকা মানব বের হয়ে এল। আতর মিয়া ভাঙা দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, সিস্টার, শইল ভালোমতো ঢাকেন। কেয়ামত শুরু হইছে। আর আপনে নেংটিা বসা। এইটা কোনো কথা!
প্রফেসর সাহেব, আতর মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি হঠাৎ এসে কী শুরু করছেন! Who are you?
আতর বলল, ঝিম ধইরা খাড়ায়া থাক। কথা বললে থাপ্পড় খাবি।
তুমি চেনো আমি কে?
চিনার প্রয়োজন নাই। কিয়ামতের দিন কেউ কাউরে চিনবে না। আইজ কিয়ামত। আপনি আমারে চিনেন না, আমিও আপনারে চিনি না।
ফ্রেঞ্চকাট বললেন, কেয়ামত হোক বাঁ না-হোক আমাদের ভদ্রতা শালীনতা বজায় রাখতে হবে।
আতর বলল, এই দেখ আমার ভদ্রতা।
প্রচণ্ড থাপ্নড়ের শব্দ হলো। ডক্টর জিল্লুর খান হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। সেখান থেকে হামাগুড়ি দিয়ে নিজের কেবিনে ঢুকে গেলেন। দৃশ্যটিতে নিশ্চয়ই কিছু হাস্যরস ছিল, তৃষ্ণা হেসে ফেলল। মানুষ ভয়ঙ্কর সময়েও হাসতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনজন রাশিয়ান সৈনিক নাজিদের হাতে ধরা পড়ল। তাদের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। যে কমান্ডার গুলি করার নির্দেশ দিবেন, তিনি হঠাৎ বরফে পা পিছলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। রাশিয়ান সৈন্য দুজন হো হো করে হাসতে লাগল। তাদের মৃত্যু হলো হাসতে হাসতে।
আতর মিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল, হিমু ভাই! আপনি এই চামচিকারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমি একটা চক্কর দিয়া আসি। আইজি রাইতটা যাবে চক্করের উপরে। দুইটা আতরের শিশি পকেটে নিয়া বাইর হইছি, সাথে যন্ত্রপাতি নাই। একটা যন্ত্রের সন্ধান পাইছি। লিঞ্চ মালিকের পোলার লাইসেন্স করা যন্ত্র। ঐটা উদ্ধার করা বিশেষ প্রয়োজন।
আতর মিয়া নিমিষে উধাও হয়ে গেল। আমি চামচিকা মানবকে বললাম, ভাই আছেন কেমন?
চামচিকা মানবের মোবাইল বেজে উঠেছে। রিং টোন হিসাবে আছে মোরগের ডাক। এতক্ষণে মোরগ রহস্যের সমাধান হলো। চামচিকা মানব মোবাইলে বিড়বিড় করে কিছু কথা বলে মোবাইল পকেটে রেখে দিল। তাকে মোটেই বিব্রত মনে হলো না। থলথলে ভূড়ির নাদুসনুদুস প্রৌঢ়। গায়ের পাঞ্জাবিটা সিস্কের। সে যে পান চিবুচ্ছে তা আগে লক্ষ করি নি। মুখ থেকে জর্দার কড়া গন্ধ আসছে। সে আয়োজন করে রেলিং-এর বাইরে পানের পিক ফেলল।
আমি বললাম, আপনার নাম কী?
রশীদ খান।
আমি বললাম, রশীদ ভাই ভালো আছেন?
রশীদ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে থমথমে গলায় বলল, দরজা যে ভেঙেছে সে কে? তার নাম আতর। বায়তুল মোকাররমে তাঁর একটা আতরের দোকান আছে। দোকানোর নাম দি নিউ মদিনা আতার হাউস।
রশীদ বলল, আমি যদি ঐ শুয়োরের বাচ্চার জান কবজ না করি আমার নাম রশীদ খান না। আমার নাম শুয়োর খান।
আমি বললাম, জানি কবজ করে আজরাইল। আপনি কি আজরাইল?
আমি আজরাইল না। আমি গাৰ্মেন্টের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে বাংলাদেশে আজরাইল ভাড়া পাওয়া যায়।
ভাড়াটে আজরাইল দিয়ে কাজ হবে না। ঢাকা শহরের ভাড়াটে আজরাইল কষ্ট্রোল করে আতর মিয়া। আপনার সঙ্গে তো মোরগ টেলিফোন আছে। মোরগ। ফোনে আপনার ভাড়াটে যে-কোনো আজরাইলের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তাদের জিজ্ঞেস করুন, আতর মিয়াকে চেনে কি না।
আমি কী করব না করব সেটা আমার ব্যাপার। আপনি বলার কে?
আপনার ভালোর জন্য বলছিরে ভাই। আতর মিয়ার বিষয়ে ঠিক ধারণা থাকলে আপনারই সুবিধা। ভুল চাল দিয়ে বিপদে পড়বেন। আতর মিয়ার চড় খেয়ে একজন হামাগুড়ি পর্যায়ে চলে গেল। সে একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছে হামাগুড়ি দিয়ে। এই যাত্রায় উঠে দাঁড়াতে পারবে এরকম মনে হচ্ছে না।
তৃষ্ণা খিলখিল করে হাসছে। এমন আনন্দময় হাসি শুধু কিশোরীরাই হাসতে পারে।
রশীদ খানের পকেটে মোবাইল ফোন বাজছে। মোরগ কোকার কো করেই যাচ্ছে।
আমি বললাম, ভাই মোরগটা ঠান্ডা করুন। দেরি করলে মোরগ ডিম পেড়ে দিতে পারে। আপনার পরিচিত আজরাইলীদের একজন টেলিফোন করেছে।
আপনাকে বলেছে কে?
আমি হাসতে হাসতে বললাম, আমি জানি।
