কী টাকা?
এখানে এক লাখ টাকা আছে। বকুলের এক আত্মীয়, দূরসম্পর্কের ভাই, টাকাটা দিয়েছে। মেয়ের লেখাপড়ার খরচ।
বলিস কী?
দুলাভাইকে এই টাকার কথা বলার দরকার নেই। পুলিশের লোক তো, নানান প্রশ্ন করবে। কী দরকার? আরেকটা কথা। আমি কিন্তু ভাত খেয়েই ফুটব।
ফুটব মানে কী? ফুটব মানে হাওয়া হয়ে যাব। Gone with the wind. বাতাসের সঙ্গে বিদায়।
শোভা আপু ঠোঁট টিপে হাসতে হাসতে বলল, এই মেয়েটার ভাগ্য ভালো।
কেন বলো তো?
আজ আমাদের ম্যারেজ ডে। তোর দুলাভাই এই জন্যে বাইরে থেকে নানান খাবারদাবার কিনে এনেছে। ফ্রিজ ভর্তি খাবার। গরম করব। আর তোদের দেব।
গরম করা শুরু কর। সাবধানে গরম করো। শব্দ যেন না হয়। দুলাভাইয়ের ঘুম যেন না ভাঙে।
ও মরণ ঘুম ঘুমায়। একবার ঘুমিয়ে পড়লে কানের কাছে ঢোল বাজালেও ঘুম ভাঙবে না। একবার কী হয়েছে শোন— চোর ঘরে ঢোকার জন্যে জানালার গ্রিল কাটছে। তোর দুলাভাই মারা ঘুম ঘুমাচ্ছে। আমি ঘুম ভাঙানোর জন্যে তাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে মেঝেতে ফেলে দিয়েছি, তারপরেও ঘুম ভাঙে না। হিহিহি।
যে লোক মরণ ঘুম ঘুমায় শোভা আপুর হালকা হি হি হাসিতে তাঁর ঘুম ভাঙল। তিনি উঠে এলেন এবং হতভম্ব হয়ে তাকালেন। আমাকে বললেন, আপনি কে?
আমি বললাম, দুলাভাই আপনার সঙ্গে তো আমার পরিচয় হয়েছে। আমাকে রিমান্ডে নিয়ে গেলেন। ভালো আছেন? হ্যাপী ম্যারেজ ডে।
এইমাত্র ঘুম থেকে উঠে আসার কারণেই হয়তো বেচারা পুরোপুরি হকচাকিয়ে গেছেন। চোখের সামনে আয়না মজিদকে দেখেও কী করবেন বাঁ কী করা উচিত বুঝতে পারছেন না। তিনি আমার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বকুলের দিকে তাকালেন। চাপা গলায় বললেন, এই মেয়ে কে?
আমি বললাম, এর নাম বকুল। এ আয়না মজিদের বোনের মতো। আপনাদের ম্যারেজ ডে উপলক্ষে বকুল আপনাকে গান শোনাবে।
বকুল সঙ্গে সঙ্গে গান ধরল,
পীরিতি করবায় সুমনে
ও সখী, পীরিতি করবায় সুমনে!
গানের মাঝখানেই দুলাভাই বললেন, এই মেয়ে থাকে কোথায়?
শোভা আপু বললেন, তুমি পুলিশী জেরা বন্ধ করা তো। এরা ক্ষিধায় মারা যাচ্ছে। তুমি ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম দাও।
শোভা! তুমি পৃথিবীর সবচে বড় গাধা মেয়ে বলে বুঝতে পারছি না। এরা কারা। দুজনই ভয়ঙ্কর।
আমার ভাই হয়ে গেল ভয়ঙ্কর?
তোমার ভাই? তোমার ভাই হয়েছে কবে? আমাকে ভাই শেখাও?
আজ আমাদের ম্যারেজ ডে, তুমি শুরু করেছ ঝগড়া?
শোভা! তুমি ভয়ঙ্কর একটা ঘটনার গুরুত্বই বুঝতে পারিছ না। তুমি জানো এ কে? এর নাম আয়না মজিদ।
আয়না মজিদ হোক বাঁ চিরুনি মজিদ হোক, এ আমার ভাই।
ভয়ঙ্কর একটা খুনির সঙ্গে ভাই পাতায়ে ফেললে?
পাতাতে হয় নি–আগে থেকেই পাতানো ছিল।
Oh my God!
গড তোমার একার না। আমাদের সবার। বলো On our God. বলে ফ্ৰিজ খুলে খাবার বের করা। যদি তা না কর আমি কিন্তু আগামী সাতদিন কিছুই খাবো না। পানি পর্যন্ত না। আমার ভাই খেয়েদেয়ে চলে যাবে। তারপর তোমার যা ইচ্ছা করবে।
দুলাভাই আরো হকচকিয়ে গেলেন। তারপর তাঁকে রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখা গেল। শোভা আপুগলা নামিয়ে বললেন, আগে একবার রাগ করে চারদিন না খেয়ে ছিলাম। এতেই বাবুর শিক্ষা হয়ে গেছে। দেখিস আর ঝামেলা করবে: না। খেয়েদেয়ে পালিয়ে যাবি। তোর দুলাভাইয়ের মতলব সুবিধার মনে হচ্ছে না। পুলিশ টুলিশ এনে হুলুস্থুল করতে পারে।
বকুলকে নিয়ে খেতে বসেছি। প্রচুর খাদ্য। দেখতেও ভালো লাগছে। চার্লস ডিকেন্স বলেছিলেন, নগরীর এক প্রান্তে প্রচুর খাদ্য কিন্তু কোনো ক্ষুধা নেই। অন্য প্রান্তে প্রচুর ক্ষুধা কিন্তু কোনো খাদ্য নেই। কথায় ভুল আছে। যেখানেই খাদ্য সেখানেই ক্ষুধা।
শোভা আপু বকুলের পিঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। দুলাভাই শোভা আপুর পাশে। তাঁর দৃষ্টি আমার দিকে। সেই দৃষ্টিতে তীব্র ঘৃণা এবং কিছুটা ভয়। হাতের কাছে এত বড় ক্রিমিন্যাল অথচ তিনি কিছুই করতে পারছেন না।
আনন্দে হাবীব ভাইয়ের মাথা মোটামুটি খারাপ
আনন্দে হাবীব ভাইয়ের মাথা মোটামুটি খারাপই হয়েছে বলা যেতে পারে। ডাক্তার আলট্রাসনোগ্রাফি করে বলেছে তার স্ত্রীর যমজ বাচ্চা। ডাবল ফিটাস পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। খবর শোনার পর থেকে তিনি উপহার বিলাতে শুরু করেছেন। যমজ উপহার–যাকে পাঞ্জাবি দিচ্ছেন একই রকম দুটা পাঞ্জাবি। যে শাড়ি পাচ্ছে সেও একই শাড়ি দুটা পাচ্ছে।
আমার জন্যেও তিনি উপহার নিয়ে এলেন–ডাবল মোবাইল। কাচুমাচু মুখ করে বললেন, আপনাকে ভালো কিছু দিতে চাই। এরচে ভালো কিছু আমার মাথায় আসে নাই।
এই যন্ত্ৰ দুটা দিয়ে আমি করব কী?
একটা তো আপনি দুদিন পরেই হারিয়ে ফেলবেন, তখন অন্যটা দিয়ে কথা বলবেন। প্রতিমাসের এক তারিখে আমি দুটা মোবাইলে ফ্লেক্সিলোড করব।
ফ্লেক্সিলোড কী?
টাকা জমা দেবার ব্যবস্থা। আপনি তো দুনিয়ার কিছুই জানেন না। আপনার জানার দরকার নাই, আমরা আছি না? এই বিষয়ে আর কথা বলবেন না হিমু ভাই।
আচ্ছা মোবাইল বিষয়ে কথা শেষ। যমজ বাচ্চার নাম কি আলাল দুলাল ঠিক আছে?
হাবীব ভাই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আপনার ভাবির কথা বিবেচনা করে মেনে নিয়েছি। নয় মাস কষ্ট তো সে-ই করবে। তার একটা দাবি আছে না? তবে আমি আলাল দুলাল ডাকব না। আমার নিজের কথারও তো একটা সম্মান আছে।
আপনি কী ডাকবেন?
আমি বড়টাকে ডাকব আলী, ছোটটাকে দুলা। আলা-দুলা।
