সকলের দেখা একে একে হইয়া গেল। দুর্গা চলিয়া যাইতেছিল, বুড়া মুসলমানটি বলিল, দেখবে না খুকি?…
দুৰ্গা ঘাড় নাড়িয়া বলিল, নাঃ-ই-আমার কাছে পয়সা নাই।
লোকটি বলিল, এসো এসো খুকি, দেখে যাও-পয়সা লাগবে না—
দুৰ্গার একটু লজ্জা হইয়াছিল, মুখে বলিল,–নাঃ-কিন্তু আগ্রহে কৌতুহলে তাহার বুকের মধ্যে টিপ, টিপ করিয়া উঠিল।
লোকটি বলিল, এসো এসো, দোষ কি?…এসো, দ্যাখো—
দুৰ্গা উজ্জ্বলমুখে পায়ে পায়ে বাক্সের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল বটে, তবুও সাহস করিয়া মুখটা চোঙের মধ্যে দিতে পারে নাই। লোকটি বলিল, এই নলটার মধ্যে দিয়া তাকাও দিকি খুকি?
দুৰ্গা মাথার উড়ন্ত চুলের গোছা কানের পাশে সরাইয়া দিয়া চাহিয়া দেখিল। পরের দশ মিনিটের কথার সে কোনো বর্ণনা করিতে পারে না। সত্যকারের মানুষ ছবিতে কি করিয়া দেখা যায়? কত সাহেব, মেম, ঘরবাড়ি, যুদ্ধ, সে সব কথা সে বলিতে পারে না! কি জিনিসই। সে দেখিয়াছিল!
অপুকে দেখাইতে বড় ইচ্ছা করে, দুৰ্গা কতবার খুঁজিয়াছে, ও খেলা আর কোনও দিন আসে নাই।
গল্প ভালো করিয়া শেষ হইতে না হইতে দুৰ্গা জুরের ধমকে আর বসিতে পারে না, উঠিয়া ঘরের মধ্যে কাঁথা মুড়ি দিয়া শোয়,
আজকাল বাবা বাড়ি নাই, অপুকে আর খুঁজিয়া মেলা দায়। বই দপ্তরে ঘুণ ধরিবার জোগাড়গ হইয়াছে। সকাল বেলা সেই যে এক পুঁটুলি কড়ি লইয়া বাহির হয়, আর ফেরে একেবারে দুপুর ঘুরিয়া গেলে খাইবার সময়। তাহার মা বকে-ছেলের না নিকুচি করেচে-তোমার লেখাপড়া একেবারে ছিকেয় উঠলো? এবার বাড়ি এলে সব কথা বলে দেবো, দেখো এখন তুমি–
অপু ভয়ে ভয়ে দপ্তর লইয়া বসে। বইগুলো খুব চারিদিকে ছড়ায়। মাকে বলে, একটু খয়ের দাও মা, আমি দোয়াতের কালিতে দেবো।–
পরে সে বসিয়া বসিয়া হাতের লেখা লিখিয়া রৌদ্রে দেয়। শুকাইয়া গেলে খয়ের-ভিজানো কালি চক চক করে–অপু মহাখুশির সহিত সেদিকে, চাহিয়া থাকে-ভাবে-আর একটু খয়ের দেবো কাল থেকে-ওঃ কী চক চক করচে দেখো একবার! পানের বাটা হইতে মাকে লুকাইয়া বড় একখণ্ড খয়ের লইয়া কালির দোয়াতে দেয়। পরে লেখা লিখিয়া শুখাইতে দিয়া কতটা আজ জ্বলজ্বল করে দেখিবার জন্য কৌতুহলের সহিত সেদিকে চাহিয়া থাকে। মনে হয়-আচ্ছা যদি আর একটু দি?
একদিন মার কাছে ধরা পড়িয়া যায়। মা বলে, ছেলের লেখার সঙ্গে খোঁজ নেই। কেবল ড্যালা ড্যালা খয়ের রোজ দরকার।–রেখে দে খায়ের–
ধরা পড়িয়া একটু অপ্রতিভ হইয়া বলে, খয়ের নৈলে কালি হয় বুঝি?…আমি বুঝি এমনি এমনি–
–না খয়ের নৈলে কালি হবে কেন? এইসব রাজ্যির ছেলে আর লেখাপড়া কচ্চে না– তাদের সেরা সোর খয়ের রোজ জোগানো রয়েছে যে দোকানো! যাঃ–
অপু বসিয়া বসিয়া একখানা খাতায় নাটক লেখে। বহু লিখিয়া খাতাখানা সে প্রায় ভরাইয়া ফেলিয়াছে, মন্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতায় রাজা রাজ্য ছাড়িয়া বনে যান, রাজপুত্র নীলাম্বর ও রাজকুমারী অম্বা বনের মধ্যে দসুর হাতে পড়েন, ঘোর যুদ্ধ হয়, পরে রাজকুমারীর মৃতদেহ নদীতীরে দেখা যায়। নাটকে সতু বলিয়া একটি জটিল চরিত্র সৃষ্ট হইবার অল্পপরেই বিশেষ কোনো মারাত্মক দোষের বর্ণনা না থাকা সত্ত্বেও সে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়। নাটকের শেষদিকে রাজপুত্রী অম্বার নারদের বরে পুনজীবন প্রাপ্তি বা বিশ্বস্ত সেনাপতি জীবনকেতুর সহিত তাঁহার বিবাহ প্রভৃতি ঘটনায় যাহারা বলেন যে, গত বৈশাখ মাসে দেখা যাত্রার পালা হইতে এক নামগুলি ছাড়া মূলত কোন অংশই পৃথক নহে, বা সেই হইতেই ইহা হুবহু লওয়া, তাহারা ভুলিয়া যান যে, অতীতের কোনো এক নীরব জ্যোৎস্নময়ী রাত্রিতে নির্জন বাসকক্ষের স্তিমিত দীপশয্যায় এক প্রাচীন কবির নীলমেঘের মতো দৃশ্যমান ময়ুর-নিনাদিত দূর বনভূমির স্বপ্ন যদি কালিদাসকে মুক্ত মেঘের ভ্রমণ বর্ণনে অনুপ্রাণিত করিয়া থাকে, তাহা হইলেই বা কি?…সে বিস্মৃতি শুভ-যামিনীর বন্দনা মানুষে নিজের অজ্ঞাতসারে হাজার বৎসর ধরিয়া করিয়া আসিতেছে।
আগুন দিয়াই আগুন জ্বালানো যায়, ছাই-এর টিপিতে মশাল গুজিয়া কে কোথায় মশাল জুলে?…
দপ্তরে একখানা বই আছে-বইখানার নাম চরিতমালা, লেখা আছে ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর প্রণীত। পুরানো বই, তাহার বাবার নানা জায়গা হইতে ছেলের জন্য বইসংগ্ৰহ করিবার বাতিক আছে, কোথা হইতে একখানা আনিয়াছিল, অপু মাঝে মাঝে খানিকটা পড়িয়া থাকে। বইখানিতে যাঁহাদের গল্প আছে সে ওই রকম হইতে চায়। হাটে আলু বেচিতে পাঠাইলে কৃষকপুত্র রস্কো বেড়ার ধারে বসিয়া বীজগণিতের চর্চা করিত, কাগজের অভাবে চামড়ার পাতে ভোঁতা আল দিয়া অক্ষাকষিত, মেষপালক ড়ুবাল ইতস্তত সঞ্চরণশীল মেঘদলকে যাদৃচ্ছি। বিচরণের সুযোগ দিয়া একমনে গাছতলায় বসিয়া ভুচিত্র পাঠে মগ্ন থাকিত-সে। ওই রকম হইতে চায়।. বীজগণিত’ কি জিনিস? সে বীজগণিত পড়িতে চায় রস্কোর মতো। সে এই হাতের লেখা লিখিতে চায় না, ধারাপাত কি শুভঙ্করী এসব তাহার ভালো লাগে না। ওইরকম নির্জন গাছতলায়, বনের ছায়ায়, কি বেড়ার ধারে বসিয়া বসিয়া সে “ভুচিত্র’ (জিনিসটা কি?) পাতিয়া পড়িবে, বড় বড় বই পড়িবে, পণ্ডিত হইবে ওই রকম। কিন্তু কোথায় পাইবে সে সব জিনিস? কোথায় বা ‘ভূচিত্র’, কোথায় বা ‘বীজগণিত’, কোথায়ই বা ল্যাটিন ব্যাকরণ?—এখানে শুধুই কড়ি কষার আর্য, আর তৃতীয় নামতা।
মা বকিলে কি হইবে, যাহা সে পড়িতে চায়, তাহা এখানে কই?
২৫. কয়দিন খুব বর্ষা চলিতেছে
কয়দিন খুব বর্ষা চলিতেছে। অন্নদা রায়ের চণ্ডীমণ্ডপে সন্ধ্যাবেলায় মজলিশ বসে। সেদিন সেখানে নীলকুঠির ভূয়ো গল্প হইতে শুরু হইয়া পুরীর কোন মন্দিরের মাথায় পাঁচমন ভারী চুম্বক পাথর বসানো আছে, যাহার আকর্ষণের বলে নিকটবতী সমুদ্রগামী জাহাজ প্রায়ই পথভ্ৰষ্ট হইয়া আসিয়া তীরবতী মগ্ন শৈলে লাগিয়া ভাঙিয়া যায় প্রভৃতি-আরব্য উপন্যাসের গল্পের মতো নানা আজগুবি কাহিনীর বর্ণনা চলিতেছিল। শ্রোতাদের কাহারও উঠিবার ইচ্ছা ছিল না, এরকম আজগুবি গল্প ছাড়িয়া কাহারও বাড়ি যাইতে মন সরিতেছিল না। ভূগোল হইতে শীঘ্রই গল্পের ধারা আসিয়া জ্যোতিষে পৌঁছিল। দীনু চৌধুরী বলিতেছিলেন-ভৃগু-সংহিতার মতো আমন বই তো আর নেই! তুমি যাও, শুধু জন্মরাশিটা গিয়ে দিয়ে দাও, তোমার বাবার নাম, কোন কুলে জন্ম, ভূত ভবিষ্যৎ সব বলে দেবে-তুমি মিলিয়ে নাও—গ্রহ ও রাশিচক্রের যত রকম ইয়ে হয়-তা সব দেওয়া আছে কি না? মায় তোমার পূর্বজন্ম পর্যন্ত–
