মাযেব বারণ আছে অত বড় মেয়ে পাড়া ছাড়িয়া কোথাও না যায়, দুৰ্গা চুপি চুপি গিয়া দেখিয়া আসিয়া রাজলক্ষ্মীর কাছে আসর-সজ্জা ও বাঁশের গায়ে-ঝুলানো লাল নীল কাগজের অভিনবত্ব সম্বন্ধে গল্প করে, অপুর মনে হয়, যে পঞ্চাননতলায় সে দু’বেলা কড়িখেলা করে, সেই তুচ্ছ অত্যন্ত পবিচিত সামান্য স্থানটাতে আজ বা কাল নীলমণি হাজাবার দলের যাত্রার মতো একটা অভূতপূর্ব অবাস্তব ঘটনা ঘটবে, এও কি সম্ভব? কথাটা যেন তাহার বিশ্বাসই হয় না।
হঠাৎ শুনিতে পাওয়া যায় আজ বিকালেই দল আসিবে। এক ঝলক রক্ত যেন বুক হইতে নাচিয়া চলাকাইয়া একেবারে মাথায় উঠিয়া পড়ে।…
কুমার-পাড়ার মোড়ে দুপুরের পাব হইতেই সকল ছেলের সঙ্গে দাঁড়াইয়া থাকিবার পর দূরে একখানা গরুব গাড়ি তাহার চোখে পড়িল, সাজের বাক্স বোঝাই গাড়ি—এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ খান! পটু একে একে আঙুল দিয়া গুনিয়া খুশির সুরে বলিল–অপুদা, আমরা এদের পেছনে পেছনে এদের বাসায় গিয়ে দেখে আসি, যাবি? সাজের গাড়িগুলার পিছনে দলের লোকেরা যাইতেছে, সকলের মাথায় টেরিকাটা, অনেকের জুতা হাতে। পটু একজন দাড়িওয়ালা লোককে দেখাইয়া কহিল—এ বোধ হয় রাজা সাজে, না অপুদা?
আকাশ-বাতাসের রং একেবারে বদলাইয়া গেল-অপু মহা উৎসাহে বাড়ি ফিরিয়া দেখে তাহার বাবা দাওয়ায় বসিয়া কি লিখিতেছে ও গুনগুনা করিয়া গান করিতেছে। সে ভাবে, যাত্রা আসিবার কথা তাহার বাবাও জানিতে পারিযাছে, তাই এত স্মৃর্তি। উৎসাহে হাত নাড়িয়া বলেসাজ একেবারে পাঁচ গাড়ি বাবা! এ রকম দল!–
হরিহর শিষ্যবাড়ি বিলি করার জন্য বালির কাগজে কবচ লিখিতেছিল, মুখ তুলিয়া বিস্ময়ের সুরে বলে-কিসের সাজ রে খোকা? —
অপু আশ্চর্য হইয়া যায়, এত বড় ঘটনা বাবার জানা নাই! বাবাকে সে নিতান্ত কৃপার পাত্র বিবেচনা করে।
সকালে উঠিয়া অপুকে পড়িতে বসিতে হয়। খানিক পরে সে কাদোকাদো ভাবে বলে-আমি বারোয়ারিতলায় যাবো বাবা, সকলে যাচ্চে আর আমি এখন বুঝি বসে বসে পড়বো? এখখুনি যদি যাত্রা আরম্ভ হয়?
তাহার বাবা বলে-পড়ো, পড়ো, এখন বসে পড়ো, যাত্রা আরম্ভ হলে ঢোল বাজবার শব্দ তো শুনতে পাওয়া যাবে? তখন না হয় যেয়ো এখন। শ্ৰীেড় বয়সের ছেলে, নিজে সব সময়ে আজকাল বিদেশে থাকে, অল্পদিনের জন্য বাড়ি আসিয়া ছেলেকে চোখছাড়া করিতে মন চায় না। অভিমানে বাগে অপুর চোখ দিয়া জল পড়িতে থাকে, সে কান্নাভিরা গলায় আবার শুভঙ্করী শুরু করে-মাস মাহিনা যাব যত দিন তার পড়ে কত?
কিন্তু সকালে যাত্রা বসে না, খবর আসে ওবেলা বসিবে। ওবেলা অপু মায়ের কাছে। যাইয়া কঁদো কাদো ভাবে বাবার অত্যাচারের কাহিনী আনুপূর্বিক বর্ণনা করে। সর্বজয়া আসিয়া বলে–দাও না গো ছেলেটাকে ছেড়ে? বছরকারের দিনটা-তোমার ন মাস বাড়িতে থাকা নেই বছরে, আর ও একদিনের পড়াতে একেবারে তাঙ্কালঙ্কার ঠাকুর হয়ে উঠবে কিনা?
অপু ছুটি পায়। সারা দুপুর তাহার বারোয়ারিতলায় কাটে। বৈকালে যাত্রা বসিবার পূর্বে বাড়িতে খাবার খাইতে আসিল। বাবা রোযাকে বসিয়া কবচ লিখিতেছে। অন্যদিন এ সময। তাহাকে তাহার বাবার কাছে বসিয়া বই পড়িতে হয়। পাছে ছেলে চটিয়া যায়। এই ভয়ে তাহার বাবা তাহাকে খুশি রাখিবার জন্য নানারকম কৌতুকের আয়োজন করে। বলে, খোকা চাটু করে সিলেটে লিখে আনো দিকি, ঐঃ ভূত বাপ রে! অপু সব অদ্ভুত ধরনের কথা শুনিয়া হাসিয়া খুন হয়, তাড়াতাড়ি লিখিয়া আনিয়া দেখায়। বলে-বাবা এইটে হয়ে গেলে আমি কিন্তু চলে যাবো, তাহার বাবা বলে-যেয়ো এখন, যেয়ো এখন, খোকা-আচ্ছা চাটু কবে লিখে আনো দিকি-আর একটা অদ্ভুত কথা বলে। অপু আবার হাসিয়া উঠে।
আজ কিন্তু অপুর মনে হইল, বাহিব হইতে কি একটা প্ৰচণ্ড শক্তি আসিয়া তাহাকে তাহার বাবার নিকট হইতে সরাইযা লইয়া গিযাছে। বাবা নির্জন ছায়াভবা বৈকালে বাঁশ বন ঘেরা বাড়িতে একা বসিয়া বসিয়া লিখিতেছে, কিন্তু এমন শক্তি নাই যে, তাহাকে বসাইয়া রাখে। এখন যদি বলে—খোকা, এসে পড়তে বসো-আমুনি চারিদিক হইতে একটা যেন ভয়ানক প্রতিবাদের হট্টগোল উঠিবে। সকলে যেন বলিবে-না, না, এ হয় না! এ হয় না! যাত্রা যে বসে বসে!…কোনো উল্লাসের প্রবল শক্তি তাহার বাবাকে যেন নিতান্ত অসহায় নিরীহ দুর্বল করিয়া দিয়াছে। সাধ্য নাই যে, তাহার পড়িবার কথা পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করে। বাবার জন্য অপুর মন কেমন করে।
দুৰ্গা বলিল-অপু, তুই মাকে বল না। আমিও দেখতে যাবো। অপু বলে—ম, দিদি কেন আসুক না। আমার সঙ্গে? চিক দিয়ে ঘিরে দিয়েচে, সেইখেনে বসবে?
মা বলে-এখন থাক, আমি ওই ওদের বাড়ির মেয়েরা যাবে, তাদের সঙ্গে যাবো,-আমার সঙ্গে যাবে এখন।
বারোয়ারিতলায় যাইবার সময় দুৰ্গা পিছন হইতে তাহাকে ডাকিল-শোন অপু। পরে সে কাছে আসিয়া হাসি-হাসি মুখে বলিল-হোত পাত দিকি! অপু হাত পাতিতেই দুৰ্গা তাহার হাতে দুটা পয়সা রাখিয়াই তাহার হাতটা নিজের দুহাতের মধ্যে লইয়া মুঠা পাকাইয়া দিয়া বলিল-দু দায়সায় মুড়কি কিনে খাস, নয়তো যদি নিচু বিক্রি হয় তো কিনে খাস।
ইহার দিনসাতেক পূর্বে একদিন অপু আসিয়া চুপি চুপি দিদিকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল–তোর পুতুলের বাক্সে পয়সা আছে? একটা দিবি? দুর্গা বলিয়াছিল–কি হবে পয়সা তোর? অপু দিদির মুখের দিকে চাহিয়া একটুখানি হাসিয়া বলিল-নিচু খাবো-কথা শেষ করিয়া সে পুনরায় লজ্জার হাসি হাসিল। কৈফিয়তের সুরে বলে-বোষ্টমদের বাগানে ওরা মাচা বেঁধেচে দিদি, অনেক নিচু পেড়েচে, দু-কুড়ি-ইই-এক পয়সার ছটা, এই এত বড় বড়, একেবারে সিঁদুরের মতো রাঙা, সত্যু কিনলে সাধন। কিনলে-পরে একটু থামিয়া জিজ্ঞাসা করিল–আছে দিদি?
