ডিমটা হাতে করিয়া তাহার মনটা যেন ফু-দেওয়া রবারের বেলুনের মতো হালকা হইয়া ফুলিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা সন্দেহের ছায়া তাহার মনে আসিয়া পৌঁছিল, এটুকু এতক্ষণ ছিল না, ডিম হাতে পাওয়ার পর হইতে যেন কোথা হইতে ওটুকু দেখা দিল খুব অস্পষ্ট। সন্ধ্যার আগে আপনমনে নেড়াদের জামগাছের কাটা গুড়ির উপর বসিয়া সে ভাবিতে লাগিল, সত্যি সত্যি উড়া যাইবে তো! সে উড়িয়া কোথায় যাইবে? মামার বাড়ির দেশে? বাবা যেখানে আছে সেখানে? নদীর ওপারে? শালিখা পাখি ময়না পাখির মতো ওই আকাশের গায়ে তারাটা যেখানে উঠিয়াছে?
সেই দিনই, কি তাহার পরদিন। সন্ধ্যার একটু আগে দুৰ্গা সলিতার জন্য ছেড়া নেকড়া খুঁজিতেছিল। তাকের হ্যাঁড়ি-কলসির পাশে গোঁজা সলিতা পাকাইবার ছোড়া-খোড়া কাপড়ের টুকরার তাল হাতড়াইতে হাতড়াইতে কি যেন ঠিক করিয়া তাহার পিছন হইতে গড়াইয়া মেজের উপর পড়িয়া গেল। ঘরের ভিতর অন্ধকার, ভালো দেখা যায় না, দুৰ্গা মেজে হইতে উঠাইয়া লইয়া বাইরে আসিয়া বলিল-ওমা কিসের দুটো বড় বড় ডিম এখানে। এঃ, পড়ে একেবারে গুড়ো হয়ে গিয়েচে– দেখেচো কি পাখি ডিম পেড়েচে ঘরের মধ্যে মা!
তাহার পর কি ঘটিল, সে কথা না তোলাই ভালো। অপু সেদিন রাত্ৰে খাইল না… কান্না..হৈ হৈ কাণ্ড। তাহার মা ঘাটে গল্প করে—ছেলেটার যে কি কাণ্ড, ওমা এমন কথা তো কখনও শুনি নি-শূনেচে সেজ ঠাকুরঝি, শকুনির ডিম নিয়ে নাকি মানুষে উড়তে পারে-ওই ওদের বাড়ির রাখাল ছোড়াটা, বদমায়েশের ধাড়ি। তাকে বুঝি বলেচে, সে কেথেকে দুটো ক্যাগের না কিসের ডিম এনে বলেচে,–এই নেও শকুনির ডিম। তাই নাকি, আবার চার পয়সা দিয়ে কিনোচে তার কাছে। ছেলেটা যে কি বোকা সে আর তোমার কাছে কি বলবো। সেজ ঠাকুরবি-কি করি যে এ ছেলে নিয়ে আমি!
কিন্তু বেচারি সর্বজয়া কি করিয়া জানিবে, সকলেই তো কিছু ‘সর্ব-দৰ্শন-সংগ্ৰহ পড়ে নাই, বা সকলেই কিছু পারদের গুণও জানে না।
আকাশে তাহা হইলে তো সকলেই উড়িত!
২০. নরোত্তম দাস বাবাজি
অনেকদিন হইতে গ্রামের বৃদ্ধ নরোত্তম দাস বাবাজির সঙ্গে অপুর বড় ভাব। গাঙ্গুলি পাড়ার গৌরবর্ণ দিব্যাকান্তি, সদানন্দ বৃদ্ধ সামান্য খড়ের ঘরে বাস করেন। বিশেষ গোলমাল ভালোবাসেন না, প্রায়ই নির্জনে থাকেন, সন্ধ্যার পর মাঝে মাঝে গাঙ্গুলিদের চণ্ডীমণ্ডপে গিয়া বসেন। অপুর বাল্যকাল হইতেই হরিহর ছেলেকে সঙ্গে করিয়া মাঝে মাঝে নরোত্তম দাসের কাছে লইয়া যাইত—সেই হইতেই দুজনের মধ্যে খুব ভাব। মাঝে মাঝে অপু গিয়া বৃদ্ধের নিকট হাজির হয়, ডাক দেয়,-দাদু আছো? বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি ঘর হইতে বাহির হইয়া তালপাতার চাটাইখানা দাওয়ায় পাতিয়া দিয়া বলেন- এসো দাদাভাই এসো, বসো বসো–
অন্যস্থানে অপু মুখচোরা, মুখ দিয়া কথা বাহির হয় না-কিন্তু এই সরল শান্তদর্শন বৃদ্ধের সঙ্গে সে সম্পূর্ণ নিঃসংকোচে মিশিয়া থাকে, বৃদ্ধের সঙ্গে তাহার আলাপ, খেলার সঙ্গীদের সঙ্গে আলাপের মতো ঘনিষ্ঠ, বাধাহীন ও উল্লাস-ভরা! নরোত্তম দাসের কেহ নাই, বৃদ্ধ একাই থাকেন।– এক স্বজাতীয় বৈষ্ণবের মেয়ে কাজকর্ম করিয়া দিয়া চলিয়া যায়। অনেক সময় সারা বিকাল ধরিয়া অপু বসিয়া বসিয়া গল্প শোনে ও গল্প করে। একথা সে জানে যে, নরোত্তম দাস বাবাজি তাহার বাবার অপেক্ষাও বয়সে অনেক বড়, অন্নদা রায়েব অপেক্ষাও বড়-কিন্তু এই বয়োবৃদ্ধতার জন্যই অপুর কেমন যেন মনে হয় বৃদ্ধ তাহার সতীর্থ, এখানে আসিলে তাহার সকল সংকোচ, সকল লজ্জা আপনা হইতেই ঘুচিয়া যায়। গল্প করিতে করিতে, অপু মন খুলিয়া হাসে, এমন সব কথা বলে যাহা অন্যস্থানে সে ভয়ে বলিতে পারে না, পাছে প্ৰবীণ লোকেরা কেহ ধমক দিয়া ‘জ্যাঠা ছেলে’ বলে। নরোত্তম দাস বলেন–দাদু, তুমি আমার গৌর,-তোমাকে দেখলে আমার মনে হয় দাদু, আমার গৌর তোমার বয়সে ঠিক তোমার মতই সুন্দর, সুশ্ৰী, নিম্পাপ ছিলেন-ওইরকম ভাব-মাখানো চোখ ছিল তাঁরও–
অন্যস্থানে এ কথায় অপুর হয়তো লজ্জা হইত, এখানে সে হাসিয়া বলে–দাদু তা হলে এবার তুমি আমায় সেই বইখানার ছবি দেখাও
বৃদ্ধ ঘর হইতে ‘প্রেমভক্তি-চন্দ্ৰিকা’ খানা বাহির করি যা আনেন। তাহার অত্যন্ত প্রিয় গ্রন্থ, নির্জনে পড়িতে পড়িতে তিনি মুগ্ধ বিভোর হইয়া থাকেন। ছবি মোট দু’খনি, দেখানো শেষ হইয়া গেলে বৃদ্ধ বলেন, আমি মরবাব সমযে বইখানা তোমাকে দিয়ে যাবো দাদু, তোমার হাতে বইয়ের অপমান হবে না–
তাহার এক শিষ্য মাঝে মাঝে পদ রচনা করিয়া তাহাকে শুনাইতে আসিত। বৃদ্ধ বিরক্ত হইয়া বলিতেন, পদ বেঁধেচো বেশ করেচো, ওসব আমায় শুনিয়ে না বাপু, পদকর্তা ছিলেন বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস-ৰ্তাদের পর ওসব আমার কানে বাজে-ওসব গিয়ে অন্য জায়গায় শোনাও।
সহজ, সামান্য, অনাড়ম্বর জীবনের গতিপথ বাহিয়া এখানে কেমন যেন একটা অন্তঃসলিলা মুক্তির ধারা বহিতে থাকে, অপুর মন সেটুকু কেমন করিয়া ধরিয়া ফেলে। তাহার কাছে তাহা তাজা মাটি, পাখি, গাছপালার সাহচর্যের মতো অন্তরঙ্গ ও আনন্দপূর্ণ ঠেকে বলিয়াই দাদুর কাছে আসিবার আকর্ষণ তাহার এত প্ৰবল।
ফিরিবার সময় অপু নরোত্তম দাসের উঠানের গাছতলাটা হইতে একরাশি মুচুকুন্দ-চাঁপা ফুল কুড়াইয়া আনে। বিছানায় সেগুলি সে রাখিয়া দেয়। তাহার পরে সন্ধ্যায় আলো জুলিলেই বাবার আদেশে পড়িতে বসিতে হয়। ঘণ্টা-খানেকের বেশি কোনোদিনই পড়িতে হয় না, কিন্তু অপুর মনে হয়। কত রােতই যে হইয়া গেল! পরে ছুটি পাইয়া সে শূইতে যায়, বিছানায় শুইয়া পড়ে,–আর অমনি আজকার দিনের সকল খেলাধুলা, সারাদিনের সকল আনন্দের স্মৃতিতে ভরপুর হইয়া বিছানায় রাখা মুচকুন্দ-চ্যাপার গন্ধ তাহার ক্লাস্ত দেহমনকে খেলাধুলার অতীত ক্ষণগুলির জন্য বিরহাতুর বালকপ্রাণকে অভিভূত করিয়া বহিতে থাকে। বিছানায় উপুড় হইয়া ফুলের রাশির মধ্যে মুখ ড়ুবাইয়া সে অনেকক্ষণ ঘ্রাণ লয়।
