দুপুর বেলা। ছাদে কাপড় তুলিতে আসিয়া গোকুলের বউ নীরেনের ঘরের দুয়ারে উঁকি দিয়া দেখিল। গরমে নীরেন বিছানায় শুইয়া খানিকটা এপাশ-ওপাশ করিবার পর, নিদ্রার আশায় জলাঞ্জলি দিয়া, মেজেতে মাদুর পাতিয়া বাড়িতে পত্র লিখিতেছিল।
গোকুলের বউ হাসিয়া বলিল-ঘুমোও নি যে ঠাকুরপো? আমি ভাবলাম ঠাকুরপো ঘুমিয়ে পড়েচে বুঝি, আজ মোচার ঘণ্ট যে বড় খেলে না-পাতেই রেখে এলে, সেদিন তো সব খেয়েছিলে?
–আসুন বৌদি। মোচার ঘণ্টা খাবো কি? বাঙালে কাণ্ড সব; যে ঝাল তাতে খেতে বসে কি চোখে দেখতে পাই-কোনটা ঘণ্ট, কোনটা কি?
গোকুলের বউ ঘরের দুয়ারের গবরাট মাথাটা হেলাইয়া ঠেস দিয়া অভ্যস্তভাবে মুখের নিচু দিকটা আঁচল দিয়া চাপিয়া দাঁড়াইল।
-ইস, ঠাকুরপো, বড় শহুরে চাল দিচ্ছ যে! ওইটুকু ঝাল আর তোমাদের সেখানে কেউ খায় क्रा-न्म?
–মাপ করবেন বৌদি, এতে যদি “ওইটুকু’ হয়, তবে আপনাদের বেশিটা একবার খেয়ে না। দেখে আমি এখান থেকে যাচ্ছি নে! যা থাকে কপালে-যাহা বাহান্ন তাহা তিপ্লান্না! দিন একদিন চক্ষুলজার মায়া কাটিয়ে যত খুশি লঙ্কা।
-ওমা আমার কি হবে! চক্ষুলজার ভয়েই শিল-নোড়ার পাঠ তুলে দিয়ে চুপ করে বসে আছি নাকি ঠাকুরপো? শোনো কথা ঠাকুরপোর-বলে কিনা যাহা বাহান্ন…হাসির চোটে তাহার চোখে জল আসিয়া পড়িল। খানিকটা পরে সামলাইয়া লইয়া বলিল-আচ্ছা তোমাদের সেখানে গরম কেমন ঠাকুরপো?
—সেখানে, কোথায়? কলকাতায় না। পশ্চিমে? পশ্চিমের গরম কি রকম সে এখান থেকে কি বুঝতে পারবেন! সে বাংলাদেশে থেকে বোঝা যাবে না। বোশেখ মাসের দিকে রাত্রে কি কেউ ঘরের মধ্যে শূতে পারে? ছাদে বিকেলে জল ধরে ছাদ ঠাণ্ডা করে রেখে তাইতে রাত্রে শূতে হয়।
-আচ্ছা, তোমরা যেখানে থাকো এথান থেকে কতদূর?
—এখান থেকে রেলে প্রায় দু’দিনের রাস্তা। আজ সকালের গাড়িতে মাঝেরপাড়া স্টেশনে চড়লে কাল দুপুর-রাত্রে পৌছানো যায়।
–আচ্ছা ঠাকুরপো, শুনিচি নাকি গয়াকাশীর দিকে পাহাড় কেটে রেল নিয়ে গিয়েচে-সত্যি?
–সত্যি। অনেক বড় বড় পাহাড়, ওপরে জঙ্গল—তার ভেতর দিয়ে যখন রেলগাড়ি যায়। — একেবারে অন্ধকার, কিছু দেখা যায় না, গাড়ির মধ্যে আলো জ্বলে দিতে হয়।
গোকুলের বউ উৎসুকভাবে বলিল-আচ্ছা, ভেঙে পড়ে না?
–ভেঙে পড়বে কেন বৌদি? বড় বড় এঞ্জিনিয়ারে সুড়ঙ্গ তৈরি করেচে, কত টাকা খরচ করেচে, ভাঙলেই হল! এ কি আপনাদের রায়পাড়ার ঘাটের ধাপ যে দু’বেলা ভাঙচে?
এঞ্জিনিয়ার কোন জিনিস গোকুলের বউ তাহা বুঝিতে পারিল না। বলিল-পাহাড়টা মাটির না পাথরের?
–মাটিরও আছে, পাথরেরও আছে। নাঃ বৌদি, আপনি একেবারে পাড়াগোঁয়ে। আচ্ছা! আপনি রেলগাড়িতে কতদূর গিয়েছেন?
গোকুলের বউ আবার কৌতুকের হাসি হাসিয়া উঠিল। চোখ প্রায় বুজিয়া মুখ একটুখানি উপরের দিকে তুলিয়া ছেলেমানুষের ভঙ্গিতে বলিল-ওঃ, ভারি দূর গিাঁইচি, একেবারে কাশী গয়া মক্কা গিাইচি! সেই ও-বছর পিসশাশুড়ি আর সতুর মা’র সঙ্গে আড়ংঘাটার যুগলকিশোর দেখতে গিাইছিলাম। সেই আমার জন্মের মধ্যে কৰ্ম্ম–রেলগাড়িতে চড়া!
এই মেয়েটি অল্পক্ষণের মধ্যেই সামান্য সূত্র ধরিয়া তাহার চারিপাশের এমন একটা হাসিকৌতুকের জাল বুনিতে পারে-যাহা নীরেনের ভারি ভালো লাগে। যে ধরনের লোকের মনের মধ্যে আনন্দের এমন অফুরন্ত ভাণ্ডার থাকে, যার কারণে অকারণে অন্তর্নিহিত আনন্দের উৎস মনের পত্র উপচাইয়া পড়িয়া অপরকেও সংক্রামিত করিয়া তোলে, এই পল্লীবধুটি সেই দলের একজন আজকাল নীরেন মনে মনে ইহারই আগমনের প্রতীক্ষা করে– না আসিলে নিরাশ হয়, এমন কি যেন একটু গোপনু অভিমানও হইয়া থাকে।
-আচ্ছা বৌদি, আপনাদের সবাই চলুন, একবার পশ্চিমে সব বেড়িয়ে নিয়ে আসি।
-এ বাড়ির লোকে বেড়াতে যাবে পশ্চিম! তুমিও যেন ঠাকুরপো! তাহলে উত্তর মাঠের বেগুন-ক্ষেতে চৌকি দেবে কে?
কথার শেষে সে আর একদফা ব্যঙ্গমিশ্রিত কৌতুকের হাসি হাসিয়া উঠিল। একটু পরে গম্ভীর হইয়া নিচু সুরে বলিল-দ্যাখো ঠাকুরপো, একটা কথা রাখবে?
–কি কথা বলুন আগে?
—যদি রাখো তো বলি!
-ও সাদা কাগজে সই করা আমার দ্বারা হবে না, বৌদি! জানেন তো আইন পড়ি। আগে কথাটা শুনবো, তারপর কথার উত্তর দেবো।
গোকুলের বউ দুয়ার ছাড়িযা ঘরের মধ্যে আসিল। কাপড়ের ভিতর হইতে একটা কাগজের মোড়ক বাহির করিয়া বলিল-এই মাকড়ি দুটো রেখে আমায় পাঁচটা টাকা দেবে?
নীরেন বিস্ময়ের সুরে বলিল-কেন বলুন তো?
-সে এখন বলবো না। দেবে ঠাকুরপো?
–আগে বলুন টাকা দিয়ে কি হবে? নইলে কিন্তু—
গোকুলের বৌ নিম্নসুরে বলিল-আমি এক জায়গায় পাঠাবো। দ্যাখো তো এই চিঠিখানার ওপরের ঠিকানাটা ইংরিজিতে কি লেখা আছে!
নীবেন পড়িয়া বলিল-আপনার ভাই, না বৌদি?
—চুপ চুপ, এবাড়ির কাউকে বোলো না যেন। পাঁচটা টাকা চেয়ে পাঠিয়েচে, কোথায পাবো ঠাকুরপো, কি রকম পরাধীন জানো তো? তাই ভাবলাম এই মাকড়ি দুটো-টাকা পাঁচটা দাও গিযে ঠাকুরপো-হতভাগা ছোঁড়াটির কি কেউ আছে ভূভারতে?…গোকুলের বউ-এবা গলাব স্বর চোখের জলে ভারী হইয়া উঠিল।
নীরেন বলিল-টাকা আমি দেবো বৌদি, পাঁচটা হয় দশটা হয়, আপনি যখন হয় শোধ দেবেন; কিন্তু মাকড়ি আমি নিতে পারবো না
গোকুলের বউ কৌতুকের ভঙ্গিতে ঘাড় দুলাইয়া হাসিমুখে বলিল—তা হবে না ঠাকুরপো, বাঃ বেশ তো তুমি! তারপর আমি তোমার ঋণ রেখে মরে যাই আর তুমি-সো হবে না, ও তোমায় নিতেই হবে। আচ্ছ। যাই ঠাকুরপো, নিচে অনেক কাজ পড়ে রয়েচে–
