সখী ঠাকরুন হতাশভাবে রোয়াকে বসিয়া পড়িলেন। যেন উপযুক্ত পুত্রের মৃত্যু-সংবাদ পাইলে ইহার চেয়ে বেশি হতাশ হইতে পারিতেন না।
—হাঘরে হাড়হাবাতে ঘরের মেয়ে আনলেই অমনি হয়, ভদ্রলোকের রীত শিখবেই বা কোথা থেকে-জানবেই বা কোথা থেকে? বাসন মজলি তো দেখলি নে এটো গেল কি রৈল? তিনপহার বেলা হয়েচে, ভাবলাম একটু জল মুখে দিই! শূন্দুরের এটো, এখখনি নেয়ে মরতে হোতভাগ্যিস ঘটিটা ছুইনি।
গোকুলের বউ বিষণ্ণমুখে দাঁড়াইয়া ভাবিতেছিল-কেন মত্তে সন্ন পোড়ারমুখীকে ঘটি তুলে নিতে বল্লাম, নিজে দিলেই হত।
সখী ঠাকরুন মুখ খিচাইয়া বলিলেন–ধিঙ্গি হয়ে দাঁড়িয়ে রৈলে যে? যাও হ্যাঁড়ি কুড়ি ফেলে দাও গিয়ে। বাসন-কোসন মেজে আনো ফের। রান্নাঘরে গোবর দিয়ে নেয়ে এসো। যত লক্ষ্মীছাড়া ঘরের মেয়ে জুটে সংসারটাকে ছারখারে দিলে।.সখী ঠাকরুন রাগে গরগর করিতে করিতে ঘরে ঢুকিলেন, বাহিরের খররৌদ্র তাঁহার সহ্য হইতেছিল না।
কুকুম-মতো সকল কোজ সারিতে বেলা একেবারে পড়িয়া গেল। নদীতে সে যখন পুনরায় স্নান করিতে গেল, তখন রৌদ্রে, ক্ষুধাতৃষ্ণায় ও পরিশ্রমে তাহার মুখ শুকাইয়া ছোট হইয়া গিয়াছে!
ঘাটে বৈকালের ছায়া খুব ঘন, ওপারে বড় শিমুল গাছটায় রোদ চিক চিক করিতেছে। নদীর বঁকে একখানা পাল-তোলা নৌক দাঁড় বাহিয়া বঁক ঘুরিয়া যাইতেছে। হালের কাছে একজন লোক দাঁড়াইয়া কাপড় শূকাইতেছে, কাপড়টা ছাড়িয়া দিয়াছে, বাতাসে নিশানের মতো উড়িতেছে, মাঝনদীতে একটা বড় কচ্ছপ মুখ তুলিয়া নিঃশ্বাস লইয়া আবার ড়ুবিয়া গেল-সো-ও-ও-ও-ভুস!
নদীর জলের কেমন একটা ঠাণ্ড ঠাণ্ডা সুন্দর গন্ধ আসে, ছোট্ট নদী; ওপারের চরে একটা পানকৌড়ি মাছ-ধরা বাঁশের দোয়াড়ির উপর বসিয়া আছে।
এই সময় প্রতিদিন তাহার শৈশবের কথা মনে পড়ে
পানকৌড়ি পানকৌড়ি, ডাঙায় ওঠোসে…
গোকুলের বউ খানিকক্ষণ পানকৌড়িটার দিকে চাহিয়া রহিল। মায়ের মুখ মনে পড়ে। সংসারে আর কেহ নাই যে, মুখের দিকে চায়। মায়ের কি মরিবার বয়স হইয়াছিল? গরিব পিতৃকুলে কেবল এক গাঁজাখের ভাই আছে, সে কোথায় কখন থাকে-তার ঠিকানা নাই। গত বৎসর পূজার সময় এখানে আসিয়া চার দিন ছিল। সে লুকাইয়া লুকাইয়া ভাইকে নিজের বাক্স হইতে যাহা সামান্য কিছু পুজি-সিকিটা দুয়ানিটা বাহির করিয়া দিত। পরে একদিন সে হঠাৎ এখান হইতে উধাও হয়। চলিয়া গেলে প্রকাশ পাইল যে, এক কাবুলি আলোয়ান-বিক্রেতার নিকট একখানি আলোয়ান ধারে কিনিয়া তাহার খাতায় ভগ্নীপতির নাম লিখাইয়া দিয়াছে। তাহা লইয়া অনেক হৈ চৈ হইল। পিতৃকুলের অনেক সমালোচনা, অনেক অপমান! ভাইটির সেই হইতে আর কোন সন্ধান নাই।
নিঃসহায় ছন্নছাড়া ভাইটার জন্য সন্ধ্যাবেলা কাজের ফাঁকে মনটা সু-দু করে। নির্জন মাঠের পথের দিকে চাহিয়া মনে হয়, গৃহহারা পথিক ভাইটা হয়তো দূরের কোন জনহীন আঁধার মেঠা-পথ বাহিয়া একা কোথায় চলিয়াছে, রাত্রে মাথা গুজিবার স্থান নাই, মুখের দিকে চাহিবার কোনো মানুষ নাই।…
বুকের মধ্যে উদ্বেল হইয়া উঠে, চোখের জলে ছায়াভিরা নদীর জল, মাঠ, ঘাট, ওপরের শিমুল গাছটা, বাঁকের মোড়ে বড় নৌকাখানা-সব ঝাপসা হইয়া আসে।
১৮. অপু সেদিন জেলেপাড়ায়
অপু সেদিন জেলেপাড়ায় কড়ি খেলিতে গিয়াছিল। বেলা দুইটা বা আড়াইটার কম নয়, রৌদ্র অত্যন্ত প্রখর। প্রথমে সে তিনকড়ি জেলের বাড়ি গেল। তিনকড়ির ছেলে বঙ্কা পেয়ারাতলায় বাখারি চাচিতেছিল, অপু বলিল–এই কড়ি খেলবি?
খেলিবার ইচ্ছা থাকিলেও বঙ্কা বলিল, তাহাকে এখনই নৌকায় যাইতে হইবে, খেলা করিতে গেলে বাবা বকিবে! সেখান হইতে সে গেল রামচরণ জেলের বাড়ি।
রামচরণ দাওয়ায় বসিয়া তামাক খাইতেছিল; অপু বলিল-হৃদয় বাড়ি আছে?
রামচরণ বলিল-হৃদয়কে কেন ঠাকুরী? কড়ি খেলা বুঝি? এখন যাও, হৃদে বাড়ি নেই।
ঠিক-দুপুর বেলায় ঘুরিয়া অপুর মুখ রাঙা হইয়া গেল। আরও কয়েক স্থানে বিফলমনোরথ হইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে বাবুরাম পাড়ুইয়ের বাড়ির নিকটবতী তেঁতুলতলার কাছে আসিয়া তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তেঁতুলতলায় কড়ি খেলার আডডা খুব জমিয়াছে। সকলেই জেলেপাড়ার ছেলে কেবল ব্ৰাহ্মণপাড়ার ছেলের মধ্যে আছে। পটু। অপুর সঙ্গে পটুর তেমন আলাপ নাই, কারণ পটুর যে পাড়ায় বাড়ি, অপুদের বাড়ি হইতে তাহা অনেক দূর। অপুর চেয়ে বয়সে পঢ়ি কিছু ছোট; অপুর মনে আছে, প্রথম যেদিন সে প্রসন্ন গুরুমশায়ের পাঠশালায় ভর্তি হইতে যায়, সেদিন এই ছেলেটিকেই সে শান্তভাবে বসিয়া তালপাতা মুখে পুরিয়া চিবাইতে দেখিয়াছিল।…অপু তাহার কাছে গিয়া বলিল-কটা কড়ি?… পটু কড়ির গেজে বাহির করিয়া দেখাইল। রাঙা সুতার বুনানি ছোট্ট গেজেটি-তাহার অত্যন্ত শখের জিনিস। বলিল, সতেরোটা এনেছি।–সাতটা সোনাগেটে; হেরে গেলে আরও আনবো।… পরে সে গেজেটা দেখাইয়া হাসিমুখে কহিল-কেমন দেখচিস? গেজেটায় একপণ কড়ি ধরে।
খেলা আরম্ভ হইল। প্রথমটা পটু হারিতেছিল, পরে জিতিতে শুরু করিল। কয়েকদিন মাত্র আগে পটু আবিষ্কার করিয়াছে যে, কড়ি-খেলায় তাহার হাতের লক্ষ্য অব্যর্থ হইয়া উঠিয়াছে; সেইজন্যই সে দিগ্বিজয়ের উচ্চাশায় প্রলুব্ধ হইয়া। এতদূর আসিয়াছিল। খেলার নিয়মানুসারে পটু উপর হইতে টুক করিয়া বড় কড়ি দিয়া তাক ঠিক করিয়া মারিতেই যেমন একটা কড়ি বৌ করিয়া ঘুরিতে ঘুরিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া যায় আমনি পটুর মুখ অসীম আহ্বাদে উজ্জ্বল হইয়া উঠে। পরে সে জিতিয়া পাওয়া কড়িগুলি তুলিয়া গেজের মধ্যে পুরিয়া লোভে ও আনন্দে বার বার গেজেটির দিকে চাহিয়া দেখে, সেটা ভর্তি হইতে আর কত বাকি!
