রেলরাস্তার গল্প শুনিয়া তাহার দিদি মুগ্ধ হইয়া যায়, বার বার জিজ্ঞাসা করে-কত বড় নোয়াগুনো দেখলি অপু? তার টাঙানো বুঝি? খুব লম্বা? রেলগাড়ি দেখতে পেলি? গেল?
না-রেলগাড়ি অপু দেখে নাই। ওইটাই কেবল বাদ পড়িয়াছে—সে শুধু বাবার দোষে। মোটে ঘণ্টা চার-পাঁচ রেলরাস্তার ধারে চুপ করিয়া বসিয়া থাকিলেই রেলগাড়ি দেখা যাইত-কিন্তু বাবাকে সে কিছুতেই বুঝাইয়া উঠিতে পারে নাই।
বেলা হইয়া যাওয়াতে ব্যস্ত অবস্থায় সর্বজযা তাড়াতাড়ি অন্যমনস্কভাবে সদর দরজা দিয়া ঢুকিয়া উঠানে পা দিতেই কি যেন একটা সরু দড়ির মতো বুকে আটকাইল ও সঙ্গে সঙ্গে কি যেন একটা পটাং করিয়া ছিঁড়িয়া যাইবার শব্দ হইল এবং দুদিক হইতে দুটা কি, উঠানে ঢিলা হইয়া পড়িয়া গেল। সমস্ত কার্যটি চক্ষের নিমেষে হইয়া গেল, কিছু ভালো করিয়া দেখিবার কি বুঝিবার পূর্বেই।
অল্পখানিক পরেই অপু বাড়ি আসিল। দরজা পার হইয়া উঠানে পা দিতেই সে থমকাইয়া দাঁড়াইয়া গেল—নিজের চক্ষুকে বিশ্বাস করিতে পারিল না-এ কি! বা রে, আমার টেলিগিরাপের তার ছিঁড়লে কে?
ক্ষতির আকস্মিকতায্য ও বিপুলতায় প্রথমটা সে কিছু ঠাহর করিতে পারিল না। পরে একটু সামলাইয়া লইয়া চাহিযা দেখিল উঠানের মাটিতে ভিজা পায্যের দাগ এখনও মিলায় নাই। তাহাব মনের ভিতর হইতে কে ডাকিয়া বলিল—ম ছাড়া আর কেউ নয়। ককখনো আর কেউ নয়, ঠিক মা! বাড়ি ঢুকিযা সে দেখিল মা বসিয়া বসিযা বেশ নিশ্চিন্ত মনে কাঁঠালবীচি ধুইতেছে। সে হঠাৎ দাঁড়াইয়া পড়িল এবং যাত্রা দলের অভিমনুর মতো ভঙ্গিতে সামনেব দিকে ঝুঁকিয়া বাঁশির সপ্তমের মতো রিনারিনে তীব্র মিষ্টসুবে কহিল-আচ্ছা মা, আমি কষ্ট করে ছোটাগুলো বুঝি বন বাগান ঘেঁটে নিয়ে আসি নি?
সর্বজয়া পিছনে চাহিয়া বিস্মিতভাবে বলিল–কি নিয়ে এসেচিস? কি হয়েচে—
আমার বুঝি কষ্ট হয় না? কীটায় আমার হাতপা ছড়ে যায় নি বুঝি?
–কি বলে পাগলের মতো? হযেচে কি?
—কি হয়েচে! আমি এত কষ্ট করে টেলিগিরাপের তার টাঙালাম আর ছিড়ে দেওয়া হয়েচে না?
—তুমি যত উদঘুট্টি কাণ্ড ছাড়া তো এক দণ্ড থাকো না বাপু!-পথের মাঝখানে কি টাঙানো রয়েচে-কি জানি টেলিগিরিাপ কি কি-গিরাপ, আসচি তাড়াতাড়ি ছিড়ে গেল।–তা এখন কি করবো বলো–
পরে সে পুনরায় নিজ কাজে মন দিল।
উঃ! কি ভীষণ হৃদয়হীনতা! আগে আগে সে ভাবিত বটে যে, তাহার মা তাহাকে ভালোবাসে। অবশ্য যদিও তাহার সে ভ্রান্ত ধারণা অনেকদিন ঘুচিয়া গিয়াছে—তবুও মাকে এতটা নিষ্ঠুর পাষাণীরূপে। কখনও স্বপ্নেও কল্পনা করে নাই। কাল সারাদিন কোথায় নীলমণি জেঠার ভিটা, কোথায় পালিতদের বড় আমবাগান, কোথায় প্রসন্ন গুরুমহাশয়ের বাঁশবন-ভয়ানক ভয়ানক জঙ্গলে একা ঘুরিয়া বহু কষ্ট উঁচু ডাল হইতে দোলানো গুলঞ্চলত কত কষ্টে জোগাড় করিয়া সে আনিল, এখুনি রোল-রেল খেলা হইবে, সব ঠিকঠাক, আর কি না…
হঠাৎ সে মাকে একটা খুব কড়া, খুব রূঢ়, খুব একটা প্ৰাণ-বিধানো কথা বলিতে চাহিল—এবং খানিকটা দাঁড়াইয়া বোধ হয় অন্য কিছু ভাবিয়া না পাইয়া আগের চেয়েও তীব্র নিখাদে বলিল-আমি আজ ভাত খাবো না যাও-কখখনো খাবো না–
তাহার মা বলিল-মা খাবি না খাবি যা-ভাত খেয়ে একেবারে রাজা করে দেবেন। কিনা? এদিকে তো রান্না নামাতে তার সয় না-না খাবি যা, দেখবো ক্ষিদে পেলে কে খেতে দ্যায়?
ব্যস! চক্ষের পলকে-সব আছে, আমি আছি তুমি আছ–সেই তাহার মা কাঁটালবীচি ধুইতেছে-কিন্তু অপু কোথায়? সে যেন কপূরের মতো উবিয়া গেল! কেবল ঠিক সেই সময়ে দুর্গা বাড়ি ঢুকিতে দরজার কাছে তাহাকে পাশ কাটাইয়া ঝড়ের বেগে বাহির হইয়া যাইতে দেখিয়া বিস্মিত সুরে ডাকিয়া বলিল-ও অপু, কোথায় যাচ্ছিস আমন করে, কি হয়েচে, ও অপু শোন–
তাহার মা বলিল-জানিনে আমি, যত সব অনাছিষ্ট কাণ্ড বাপু তোমাদের, হাড় মাস কালি হয়ে গেল।–কি এক পথের মাঝখানে টাঙিয়ে রেখেচে, আসচি, ছিড়ে গেল-তা এখন কি হবে? আমি কি ইচ্ছে করে ছিাঁড়চি? তাই ছেলের রাগ-আমি ভাত খাবো না-না খাস যা, ভাত খেয়ে সব একেবারে স্বগগে ঘণ্টা দেবে কিনা তোমরা?
মাতাপুত্রের এরূপ অভিমানের পালায় দুৰ্গাকেই মধ্যস্থ হইতে হয়-সে। অনেক ডাকাডাকির পরে বেলা দুইটার সময় ভাইকে খুঁজিয়া বাহির করিল। সে শুল্কমুখে উদাসীনয়নে ও-পাড়ার পথে রায়েদের বাগানে পড়ন্ত আমগাছের গুড়ির উপর বসিয়া ছিল।
বৈকালে যদি কেহ আপুদের বাড়ি আসিয়া তাহাকে দেখিত তবে সে কখনই মনে করিতে পারিত না যে, এ সেই অপু-যে আজ সকালে মায়ের উপর অভিমান করিয়া দেশত্যাগী হইয়াছিল। উঠানের এ-প্ৰস্ত হইতে ও-প্রাস্ত পর্যন্ত তার টাঙানো হইয়া গিয়াছে। অপু বিস্মযের সহিত চাহিয। চাহিয়া দেখিতেছিল, কিছুই বাকি নাই, ঠিক যেন একবারে সত্যিকার রেলরাস্তার তার।
সে সতুদের বাড়ি গিয়া বলিল-সতুদা, আমি টেলিগিরাপের তার টাঙিয়ে রেখেচি আমাদের বাড়িব উঠানে, চল রেল-রেল খেলা করি–আসবে?
–তার কে টাঙিয়ে দিল রে?
–আমি নিজে টাঙালাম। দিদি ছোটা এনে দিয়েছিল—
সতু বলিল-তুই খেলগে যা, আমি এখন যেতে পাববো না—
অপু মনে মনে বুঝিল, বড় ছেলেদের ড্রাকিযা দল বাঁধিয খেলার জোগাড় করা তাহাব কর্ম নয়। কে তাহার কথা শুনিবে? তবুও আর একবার সে সত্যুর কাছে গেল। নিরাশ মুখে রোয়াকের কোণটা ধরিয়া নিরুৎসাহভাবে বলিল-চল না। সত্যুদ, যাবে? তুমি আমি আর দিদি খেলবো এখন? পরে সে প্রলোভনজনক ভাবে বলিল-আমি টিকিটের জন্যে এতগুলো বাতাবি নেবুব পাতা তুলে এনে রেখেচি। সে হাত ফাক করিয়া পরিমাণ দেখাইল।-যাবে?
