–তুই তো যাস্ দিব্যি।
–আমি গিয়েছিলাম আচাৰ্য্য রঘুনাথের কৃপায়। মহাপুরুষদের বিশেষ দয়ায় বিশেষ শক্তি হয়। নয়তো ওই সব স্তরে নানান রকমের নিম্নশ্রেণীর শক্তি খেলা করচে সৰ্ব্বদা, মহাপুরুষদের কৃপায় বিশেষ শক্তি লাভ করে সেখানে গেলে ওই সব দুষ্ট শক্তি কোনো অনিষ্ট করতে পারে না। নয়তো বিপদ পদে পদে–এই জন্যেই তোমাকে ওখানে যেতে দিতে চাইনে যতুদা। চলো দেখি কি উপায় হয়।
রঘুনাথদাসের আশ্রমে যাবার পথে কবি ক্ষেমদাসের সঙ্গে দেখা। তিনি আপন মনে একটি বৃক্ষতলায় চুপ করে বসে; অতি সুন্দর নির্জন স্থানটি, বনপুষ্প ফুটে আছে ঝর্ণার ধারে। ওরা কাছে গিয়ে দেখলে পৃথিবীর দিকে তিনি একদৃষ্টে চেয়ে কি যেন দেখছেন। ওদের দেখে সস্মিত মুখে সম্ভাষণ করলেন। যতীন ও পুষ্প দুজনেই ওঁকে প্রণাম করে পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
ক্ষেমদাস বল্লেন–কোথায় যাচ্ছ তোমরা?
পুষ্প বল্লে-রঘুনাথদাসের আশ্রমে। বড় বিপদে পড়ে যাচ্ছি। আপনিও শুনুন দেব–যদি কিছু উপায় হয়। তারপর সে আশার কাহিনী সব খুলে বল্লে।
ক্ষেমদাস সব শুনে ধীরভাবে বল্লেন–এই দুঃখ সনাতন। আত্মা নিরন্তর সাধনা করচে নিজেকে জানবার। আমার নিজের জীবনেও এমনি হয়েছিল। আমি তাই এখানে বসে বসে ভাবছিলাম, আবার পৃথিবীতে পূর্ণিমার জ্যোৎস্না উঠেচে যেমন উঠতো পাঁচশো বছর আগে, অনাদ্যন্ত মহাকাল নিজের কাজ করে চলেচে যেমন করতো হাজার বছর কি দু-হাজার বছর আগে–আমি পৃথিবীতে একটি মেয়েকে কত ভালবাসতাম, আমাদের গ্রামের সদানন্দী মাঠের ফুলবাগানে কত বেড়াতাম দুজনে এমনি জ্যোৎস্নারাত্রে–লুকিয়ে লুকিয়ে,–এখন সে। কোথায়?
অনেকটা অন্যমনস্ক ভাবেই কবি মাথা দুলিয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বল্লেন–সত্যি তাই ভাবি, কোথায় সে?
পুষ্প অবাক হয়ে বল্লে–কেন, আপনি তাঁর দেখা পাননি আর?
–না। বিশ্বের ভিড়ে কোথায় হারিয়ে গেল। দ্যাখো, আমরা কবি, জগতে রূপরসের উপাসক। এঁকেই বড় করেচি জীবনে। যাঁরা বলেন। সব মায়া, তাঁদের কথা বুঝি না। মায়া লয় হোলে এই রূপরসের জগৎটাও লয় হয়। তা আমরা চাইনে–তাই দুঃখ পাই, কিন্তু দুঃখের মধ্যেও জানি ভগবানই সৃষ্টি করেছেন এই জগৎ। সবই তিনি। কষ্ট পেলেও জানি তাঁর হাতে কষ্ট পাচ্ছি। প্রেমময়ের তাড়নায় কষ্ট কি? সব মুখ বুজে সহ্য করি। এটাও মানি, এই রূপরসের সাধনার মধ্যেই আমাদের সিদ্ধি। এ পথেও তাঁকে পাওয়া যায়। চলো, নরকে আমি নিজে যাবো, খুঁজে বার করি তোমাদের সেই মেয়েটিকে। তার দুঃখ আমি কবি আমি বুঝি–
যতীন বল্লে–প্রভু, আমার পুনর্জন্ম ঠিক হয়ে গিয়েছে সেই মেয়েটিকে নিয়ে। করুণাদেবী জানিয়েছেন–
ক্ষেমদাস বল্লেন–তিনি যা করেছেন, তোমাদের মঙ্গলের জন্যেই। তিনি পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী মহাদেবী–তাঁকে তোমরা করুণাদেবী বল, দুর্গা বল, লক্ষ্মী বল, সীতা বল, সরস্বতী বল–সবই এক। তবে এখন মেয়েটির কাছে যাবার কোনো প্রয়োজন নেই। উপায় হয়ে গিয়েছে।
যতীন আশ্চর্য হয়ে গেল শুনে। অত বড় বড় পৌরাণিক দেবীর। সঙ্গে সে করুণাদেবীকে এক আসনে বসায়নি। উনি যদি দুর্গা হন, কালী হন, সীতা হন, লক্ষ্মী হন–তবে তার আর জন্মমরণের ভয় কিসের? আশারই বা ভয় কিসের? হাসিমুখে সে মহাগৌরবে নরকে যেতে প্রস্তুত।
ক্ষেমদাস ওর মনের ভাব বুঝে বল্লেন–জন্ম নিতে দুঃখ কিসের? পৃথিবীর রূপরস আবার আস্বাদ করে এসো। সেই জ্যোৎস্না, সেই বনবিতান, কোকিলের কুহুতান, সেই মায়ের কোলে যাপিত একান্তনির্ভরতার শৈশব, প্রথম যৌবনে প্রিয়ার প্রথম দর্শন–যাও যাও, ওরই মধ্যে ভগবানে মন রেখো–কৰ্ম্ম যতদিন না কাটে।
কিয়ে মানুখ জনমিয়ে পশুপাখী অথবা কীটপতঙ্গে
করমবিপাকে গতাগতি পুন-পুন মতি রহুঁ তুয়া পরসঙ্গে।
মেয়েটির কাছে যাবার কোনো দরকার নেই। দেবী যখন তার ব্যবস্থা করেচেন, তখন আমাদের সেখানে যাওয়া ধৃষ্টতা হবে। দেবী সৰ্ব্বমঙ্গলা তাকে শ্রেয়ের পথে চালিত করবেন।
ঠিক সেই সময়ে একজন জ্যোতির্ময় মহাপুরুষের আবির্ভাব হোল বৃক্ষতলে। যতীন তাঁর দিকে চেয়েই চমকে উঠলো, ইনি সেই সন্ন্যাসী, যিনি একদিন স্পর্শদ্বারা তার মধ্যে সবিকল্প সমাধির অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছিলেন। সেই যোগী পুরুষই-নীল বিদ্যুতের মত আভা বেরুচ্চে, সারা দেহ থেকে ওঁর।
যতীনের দিকে চেয়ে তিনি মৃদু হেসে বল্লেন–মনে আছে?
যতীন তাড়াতাড়ি পায়ের ধূলো নিলে, পুষ্পও তাই করলে ৷ ক্ষেমদাস চুপ করে বসে রইলেন।
তিনি আবার বল্লেন–মনে আছে? বলেছিলাম সময় পেলে দেখা দেবো। এই সেই মেয়েটি বুঝি? এঁর তো খুব উচ্চ অবস্থা দেখচি। ক্ষেমদাসের দিকে চেয়ে বল্লেন–কবি যে! কি করচ বসে বসে?
ক্ষেমদাস বল্লেন–তোমাদের মত সমাধির চেষ্টায় আছি
–ও তোমাদের অনেক দূর। মায়িক-জগতের বন্ধন এখনও তোমাদের কাটেনি। আবার এদেরও মাথা খাচ্চ কেন ও কথা বলে?
–আমিও ঠিক ওই কথাই তোমায় বলতে পারি। অদ্বৈত-ব্রহ্মজ্ঞান ট্যান এই সব কচি কচি ছেলেমেয়ের মাথায় ঢোকাচ্চ কেন।
সন্ন্যাসী হেসে ক্ষেমদাসের কাছে এসে দাঁড়িয়ে সস্নেহ সুরে বল্লেন– তুমিও ঐ দলেরই একজন। কবি কিনা, মিথ্যা কল্পনার রাজ্যে বাস। করো।
পুষ্প সময় বুঝে বল্লে–প্রভু, জানেন এঁর প্রতি পুনর্জন্মের আদেশ। হয়েছে!
