ভক্তের ক্ষমতা বড় তুচ্ছ নয়। গ্রহদেবের আসন টলেচে।
পুষ্প বল্লে–বুঝেচি। তিনি মহাপুরুষ, সেদিন যখন নরকে নিয়ে গেলেন আমায়, তখনই আমার মনে হোল নরক পবিত্র হোল! আপনারও আসন টললো–আমি ডাকলে আপনি ছাই আসেন!
করুণাদেবী বালিকার মত সকৌতুকে খিল খিল করে হাসলেন। বল্লেন–তুই আমার ওপর রাগ করলি বুঝি? ছিঃ–লক্ষ্মী দিদি
পুষ্পের অভিমান তখনও যায়নি। সে দুষ্টু মেয়ের মত ঘাড় বেঁকিয়ে। চুপ করে রইল।
দেবী বল্লেন–তোকে আমার কাছে নিয়ে যাবো পুষ্প–
–না। আমাকেও পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিন না, দিন না দয়া করে। সত্যি বলচি। স্বর্গে আমার দরকার নেই।
পৃথিবীতে পাঠিয়ে কি হবে? এবার যে চেষ্টা করবো ওদের দুজনকে মিলিয়ে দিতে। পৃথিবীর মিলন না হোলে আশার প্রারব্ধ কিছুতেই কাটবে না। এ আত্মত্যাগ তুই করতে পারবি আমি জানি। ওরা জন্ম নিলেই তো সব ভুলে যাবে, কোন কথা মনে থাকবে না এ জন্মের। আমি আবার দেখা করিয়ে দিই, যে যাকে চায় মিলিয়ে দিই। নতুবা জীবের কি সাধ্য?
পুষ্প বল্লে–আমাকেও পাঠিয়ে দিন, সব ভুলে থাকি।
করুণাদেবী ওকে কাছে নিয়ে এলেন আদর করে। পুষ্পের দেহ শিউরে উঠলো, কি অপূর্ব সুগন্ধ দেবীর সারাদেহে, কি অপূৰ্ব্ব
স্পর্শসুখ! সে মেয়েমানুষ, তবুও এই রূপসী দেবীর স্নিগ্ধস্পর্শে ওর সারাদেহে যেন তড়িৎসঞ্চার হোল। অমৃতস্পর্শে আত্মা যেন নিজের অমরত্ব, অনন্তত্ব অনুভব করলে এক মুহূর্তে।
সস্নেহে বল্লেন–পুষ্প, তোকে পৃথিবীতে আর জন্ম নিতে হবে না। শুক্লা গতির পথে তোর অনাবৃত্তি লাভ ঘটেচে। ওরা এখনও অপরিণত, শেখবার বাকি আছে, কৰ্ম্ম এবার নষ্ট হয়ে যাবে হয়তো। পৃথিবীর জীবন বেশিদিনের নয়। আত্মার পক্ষে চোখের পলক মাত্র। আমি এবার যাই পুষ্প।
পুষ্প বল্লে–আমায় পৌঁছে দিয়ে যান–
–নিশ্চয়, চল যাই–
যাবার সময় করুণাদেবী বলে গেলেন, তাঁকে স্মরণ করলেই তিনি। আসবেন।
যতীন একা বসে ছিল বাড়ীতে। পৃথিবীতে আবার জন্ম নিতে হবে। শত সুখদুঃখের বন্ধনে আবার জড়ানো, মন্দ কি? সেই গরীব ঘরের বৌটির কোল আলো করে আবার শিশু হয়ে কত বাল্যলীলা করবে, নতুন আস্বাদ, আবার আসবে আশা-হতভাগিনী আশা–নববধূরূপে তার ঘরে, আবার কত বর্ষারাত্রি, কত বসন্তপ্রভাত ওর সাহচর্য্যে। কাটবে। পৃথিবীতে যেতে তার কষ্ট নেই, মধুর সেখানকার শৈশব, মধুর কৈশোর মধুর যৌবন। চিরযৌবনের হাওয়া যেন বয় তার অমর আত্মায়, পৃথিবীতে মাস যাবে মাস আসবে, নতুন ধানের গন্ধ বেরুবে ক্ষেতে ক্ষেতে, ক্ষুধায় বনের মেটে আলু তুলে নুন দিয়ে পুড়িয়ে খাবে, তার মা যখন বৃদ্ধা হয়ে যাবে তাকে খাওয়াবে, আশা সংসার পাতবে নতুন লক্ষ্মীর হাঁড়িতে ধান দিয়ে।…
কেবল কষ্ট হয় পুষ্পের জন্যে। এতদিন ওর সঙ্গে থেকে কি মায়াই হয়েচে ওর ওপরে। কেন এমন বিচ্ছেদ? কি কষ্ট পাবে পুষ্প, তা সে জানে। আশা যদি কষ্ট না পেতো, যতীন কিছুতেই যেতো না।
পুষ্প এসে ওর হাত ধরে বল্লে–যতীনদা!
–কি পুষ্প?
–আমার ভুলো না।
–আচ্ছা, পুষ্প–তুই বলতে পারিস, কেন আমাদের জীবনে এ দুর্ভাগ্য, কেন বার বার তোকে হারাচ্চি? তোর বৌদিদিকে হারাচ্চি?
–আমায় নিয়ে যাও সঙ্গে–
–ছিঃ পুষ্প। দেবী যা বলেন তাই তোমার আমার পক্ষে শুভ। ওঁর কথা শোনো।
–আমি কারো কথা শুনবো না, আমি যাবো।
–কি, এবারও একসঙ্গে খেলা করবি পুষ্প? তেমনিধারা সাগঞ্জ কেওটার ঘাটে? বেশ–অদ্ভুত সে সব দিন।
যতীন চোখ বুজে ভাবতে লাগলো। পুষ্প ওর হাত ধরে বসে রইল, বল্লে–তাই তো সাগঞ্জ-কেওটার বুড়োশিবতলার ঘাট এ লোকেও ভুলতে পারিনি। জন্মান্তরের স্মৃতিতেও অক্ষয় যেন হয়। তোমার যাওয়ার পথে দেবতারা ফুল ফেলুন যতুদা–আমি হতভাগিনী চিরকাল একাই থাকবো। এই আমার ভাগ্য।
যতীন ওর মুখের দিকে চেয়ে বল্লে–আমার মুক্তিতে দরকার নেই, কোনো কিছুর দরকার নেই। সমাধি-টমাধি, দেবী-টেবী সব বাজে। তোকে ছেড়ে যাবো না।
–আশা?
–তার অদৃষ্টে যা হয় হবে পুষ্প।
–ঠিক কথা যতুদা?
–প্রাণের সত্য কথা বল্লাম। এখন আমার অন্তর যা বলচে। সব। তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে আমার কাছে–তুই থাক্ পুষ্প আমার!
–জগতের, বিশ্বের বহুদূর সীমানায় চলে যাও যতুদা, তোমায় মুক্তি দিলাম। ভালবেসো, ভুলো না।
–ওসব থিয়েটারী ধরনের কথা কোথায় শিখলি রে? তোদের দোহাই, মুক্তি-টুক্তির কথা আমায় আর শোনানে। চল্ তুই আর আমি পৃথিবীতে যাই, ছোট্ট নদীর ধারে কুঁড়েঘরে সংসার পাতবো। সেই আমাদের স্বর্গ, সেই আমাদের সব।
পুষ্পের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো ঝরঝর করে। সে কোনো কথা বল্লে না।
সেদিনই যতীনের মনে হোল কে যেন কোথায় তাকে ডাকছে…সব সময় তার প্রাণের মধ্যে কিসের যেন মোচড় দিচ্ছে…আশা, অভাগিনী আশা, ভুবর্লোকের নীচের স্তরে অসহায় একাকিনী পড়ে আছে, কেউ নেই তাকে দেখবার।
সত্যি আশা তাকে ডাকচে। তার অন্তরাত্মা শুনতে পেয়েচে অভাগিনীর ডাক।
সে পুষ্পকে কথাটা বল্লে।–তোর বৌদিদি বড় কাঁদছে পুষ্প। সেদিন কুড়লে-বিনোদপুরের বাড়ীতে হঠাৎ দেখা হওয়ার পর থেকে ওর ডাক প্রায়ই শুনি।
–আমি যাই সেখানে যতুদা, তুমি যেও না। দেখে আসি।
–কিছু ভাল লাগে না ওর জন্যে।
–কেন তোমাকে যেতে বারণ করি, ও সব নীচের স্তরে তোমায়। যেতে দিতে আমার মন সরে না।
