করুণাদেবী মৃদু হেসে বল্লেন–কি ভাবচ, গাছটার কথা? ও তৈরি করেচি। বনস্পতিতে ভগবানের প্রত্যক্ষ আবির্ভাব। তাই দেখি সারা সময় চোখের সামনে।
–কি গাছ?
–পৃথিবীতে ছিল না কোনোদিন, নাম নেই।
–আমি আপনার কাছে কোনো অপরাধ করেছিলাম কি? দেখা দেননি কতদিন। আমার কষ্ট তো জানেন সব। আপনি একবার চলুন, যতীনদা বড় কাতর হয়ে পড়েছে, আশা-বৌদি নরকে। আত্মহত্যা করেছিল।
করুণাদেবী অদ্ভুত ধরনের হাসি হাসলেন। বল্লেন–সব জানি। আমার পৃথিবীর ছেলেমেয়েদের সন্ধান রাখিনে আমি! আমিই যতীনের ব্যাকুলতা দেখে তার সঙ্গে ওর স্ত্রীর দেখা করিয়ে দিই। নইলে নরক থেকে পৃথিবীতে গিয়ে দেখতে পেতো না যতীনকে। এই দেখাতে আশার উপকার হবে–
–যতীনদা সেই থেকে কিন্তু পাগলের মত হয়েচে–
–যতীন অজ্ঞান।
–আপনি ভাল বোঝেন সব, দেবী। আপনি যতীনদা’কে সুখী। করুন। ওর কষ্ট দেখতে পারিনে। আশা বৌদির ভাল হয় কিসে?
করুণাদেবী ওকে কাছে টেনে নিয়ে ছোট্ট মেয়েটির মত ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে ওর গালে হাত বুলিয়ে অতি ধীর শান্ত সুরে বলতে লাগলেন–পুষ্প তোকে ভালবাসি বড়। মনে আছে সব। ভাল হবে শেষে, কিন্তু লক্ষ্মী, পুষ্প–
–কি দেবী?
করুণা দেবীর চোখে জল! পুষ্প অবাক হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে কেমন। মায়া হোল এই রাজরাজেশ্বরীর মত রূপবতী মহাশক্তিধারিণী দেবীর ওপর, কোলে শায়িতা ছোট্ট খুকী যেন তার মেয়েটির মত। ভগবান এমন ভাবেই বোধ হয় মানুষের কাছে ধরা দেন ঐশ্চৰ্য্য লুকিয়ে। সে নিজের অজ্ঞাতসারে অসীমস্নেহে করুণাদেবীর চোখের জল মুছিয়ে দিলে নিজের বস্ত্রাঞ্চলে।
দেবী বল্লেন–তোকে বড় দুঃখ পেতে হবে।
পুষ্পের বুকের মধ্যে দুরু দুরু করে উঠলো। কেন, কিসের দুঃখ? কি কথা বলতে চাইছেন দেবী?
দেবী আবার বল্লেন–যতীন ও তোমাকে এক জায়গায় যেতে হবে আমার সঙ্গে। তার দরকার আছে। তুই চলে যা পুষ্প, আমি যাবো তোরই বাড়িতে একটু পরে। তারপর আমার সঙ্গে তোদের পৃথিবীতে একবার যেতে হবে।
–দেবী, গ্রহদেবের দেখা পাবো?
–সময় পাবে পুষ্প। তিনি কিছু পূৰ্ব্ব এখানে ছিলেন।
উচ্চস্বর্গে দেবলোকের প্রেমিক-প্রেমিকা। পুষ্প যতই এঁদের দুজনকে দেখে, ততই আনন্দে ও শান্তিতে মন পূর্ণ হয়ে ওঠে।
পুষ্প ও যতীনকে সঙ্গে নিয়ে করুণাদেবী একটি পুরাতন শহরে এলেন।
বাড়ীঘর সব পুরোনো ধরনের, পাশ দিয়ে একটি নদী বয়ে চলেচে, রাস্তাঘাট সেকালের ধরনের সরু সরু। একটা পুরোনো বাড়ী গলির মধ্যে, সেই বাড়ীর পাশে ছোট্ট একটা বাগান। বেলা গিয়েচে, সন্ধ্যার কিছু আগে। বাড়ীটার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পুষ্প ও যতীন দুজনেরই মনে হোল, এখানে ওরা যেন এর আগে এসেচে। যেন কতকাল আগে, ঠিক মনে করতে পারছে না।
হঠাৎ যতীন বল্লে–এটা কোন্ জায়গা দেবী, আমি এ বাড়ী চিনি। বলে মনে হচ্চে–
তার মন আজ আনন্দে পূর্ণ, কারণ বহুদিন পরে আজ সে করুণাদেবীর দেখা পেয়েছে। এ যে কত সৌভাগ্যের কথা, এতদিন এখানে থেকে সে ভাল বুঝেচে।
দেবী বল্লেন–বেশ, বাড়ীর ভেতর যাও–
যতীনের মনে হোল এ বাড়ীর ভেতরের উঠোনে একটা পেয়ারার গাছ আছে, সে কতকাল আগে সেই গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খেতো। বাড়ীর মধ্যে ঢুকতেই একটি ছোট ঘর। একটা কুলুঙ্গির দিকে চাইতেই যেন বহু পুরোনো দিনের সৌরভের মত কোথাকার কত হারানো। দিনের বহু অস্পষ্ট স্মৃতির সৌরভ এল কুলুঙ্গিটা থেকে। এক সুন্দরী নববধূর মুখ যেন মনে পড়ে, ঐ কুলুঙ্গিতে সে তার মাথার কাঁটা রাখতে শোবার আগে, এই ঘরের সঙ্গে যেন এক সময়ে কত সম্পর্ক ছিল। ওর। বাড়ীটাতে অনেক ছেলেমেয়ে চলাফেরা করচে, দুটি মধ্যবয়সী স্ত্রীলোক রান্নাঘরে কাজকর্ম করচে। ঐ তো সেই পেয়ারা গাছটা। ওর তলায় বসে সে কত খেলা করেছে একটি মেয়ের সঙ্গে–মেয়েটিকে সে বড় ভালবাসতো। আজও যেন তার মুখ মনে পড়ে–কোথায় যেন। চলে গিয়েছিল মেয়েটি।
পুষ্প ওর পেছনে পেছনে এসে বাড়ীর মধ্যে ঢুকচে। সে বল্লে– যতীনদা, ওই সেই পেয়ারা গাছ–
–কোন্ পেয়ারা গাছ–
–মনে পড়চে ওর তলায় তুমি আর আমি খেলা করতাম, অনেক কাল আগে–স্পষ্ট মনে হচ্চে–
–তুই তবে সেই মেয়ে পুষ্প–আমারও সব মনে পড়েছে। তুই মরে গিয়েছিলি আমার আগে। সে সব দিনের দুঃখুও যেন মনে আসছে।
-তুমি মারা গিয়েছিলে যতীনদা। আমায় ওই বলে গালাগালি দিও না, বালাই ষাট, আমি মরবো কেন?
–দেবী সঙ্গে নেই তাই তোর বাড় হয়েচে, তুই যা তা বলছিস আমায় পুষ্প! আচ্ছা, বল তো, এক জায়গায় এ বাড়ীতে এক বুড়ো লোক বসে থাকতো, তার কি যেন হয়েছিল, বসেই থাকতো। মনে পড়চে তোর?
–মনে হয়েচে, দেওয়ালের গায়ে বালিশ ঠেস্ দিয়ে।
যতীনের মনে হচ্ছিল যেন সে একটি সুপরিচিত স্থানে বহু, বহু কাল পরে আবার এল। এ বাড়ীর সব ঘরদোর সে চেনে, অনেক কাল আগে এ বাড়ীতে সে বেড়িয়েছে প্রত্যেক ঘরদোরে। বহু প্রিয়জনের দূরাগত স্মৃতি যেন একটি গুরুভার বেদনার মত বুকে চেপে বসেচে।
বাড়ীর ছেলেমেয়েরা রান্নাঘরে খেতে বসেচে। খুব গোলমাল করচে নিজেদের মধ্যে। ওদের প্রতি এমন একটি স্নেহ হয়েচে যতীনের, এরা অতি আপনার জন, কতদিনের সম্বন্ধ এদের সঙ্গে। যতীন দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। ছেলেমেয়েদের খাওয়া হয়ে গেল, ওদের মা এবার হাতায় করে দুধ পাতে পাতে দিচ্ছে। অনেক পুরোনো হয়ে গিয়েচে বাড়ীটা, তার জানা বাড়ী এর চেয়ে ভাল, নতুন ছিল। সে সব বুঝতে পেরেচে, করুণাদেবী তাদের কেন এখানে এনেছেন।
