সন্ধ্যা হয়েছে। বোষ্টম বৌ ছাগল নিয়ে যাচ্ছে বাড়ীতে তাড়িয়ে আহা, বুড়ো হয়ে পড়েচে বোষ্টম বৌ। তা তো হবেই, আট বছর হয়ে। গেল। আচ্ছা তাকে যদি এখন দেখে বোষ্টম বৌ তো কি না জানি ভাবে!
হঠাৎ পেছন থেকে কে বলে উঠলো–তুমি কখন এলে গো?
যতীনের অন্তরাত্মা পর্যন্ত বিস্ময়ে শিউরে চমকে উঠলো সে পরিচিত কণ্ঠের ডাকে। সে পেছন ফিরে চাইলে, আশা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার পেছনে। পরনে লালপাড় শাড়ী, ঠিক যেমনটি পরতো কুড়লে বিনোদপুরের এ ঘরে; বয়েস তেমনি, চোখে না বুঝতে পারার বিস্ময়ের মূঢ় দৃষ্টি।
–আশা! তুমি এখানে! কি করে এলে।
আশা অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে আছে। যেন এখনো ভালো করে। বিশ্বাস করতে পারছে না।
যতীন ওর দিকে এগিয়ে গেল হাত বাড়িয়ে। বল্লে–আশা, চিনতে পারচো না আমায়?
আশা ওর মুখের দিকে তখনও চোখ রেখে বল্লেখু-উ-ব।
–তুমি কোথা থেকে এলে?
–কি জানি কোথা থেকে যে এলুম। আজকাল কেমন হয়েছে আমার, সবই যেন কি মনে হয়। কোনটা সত্যি কোটা স্বপ্ন বুঝতে পারিনে। সব ওলট-পালট হয়ে গিয়েচে কেমনতর। হ্যাঁগো, তুমি ঠিক তো?…
পরে ব্যস্ত হয়ে বল্লে–দাঁড়াও, একটা প্রণাম করে নিই তোমায়
প্রণাম করে উঠে বল্লে–কতকাল দেখিনি। ছিলে কোথায়? সংসার যে ছারেখারে গেল, বাড়ী ঘরদোরের অবস্থা এ কি হয়েছে! আমি এতকাল আসিনি। বাপের বাড়ী থেকে আমাকে আনলেও না। নিজেও ভবঘুরে হয়ে বেড়াচ্চ। ছেলেমেয়ে দুটোর কথাও তো ভাবতে হয়।
যতীন সস্নেহ কণ্ঠে বল্লে–ঠিক, ঠিক। তুমি ভাল আছ আশা?
–আমি ভাল নেই।
–কেন, কি হয়েছে? আশা, আমায় খুলে বলো সব
–মাথার মধ্যে সব গোলমাল। কিছু বুঝতে পারিনে। সব স্বপ্ন বলে মনে হয়। কত কি যে ঘটে গেল জীবনে, বুঝিনে কোনটা স্বপ্ন কোনটা সত্যি। এই তুমি দাঁড়িয়ে আছ সামনে, আমার যেন কেমন মনে হচ্চে। যেন মনে হচ্চে কে বলেছিল, তুমি-না ছিঃ সে কথা বলতে নেই।
–আশা, আবার ঘর সংসার পাতাই এসো–
–পাতাতেই হবে। আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েচে–এক জায়গায়। ছিলাম, মরুভূমি আর পাহাড়, লোক নেই জন নেই, কি ভয়ানক জায়গা। সেখানে যেন এক দেবীর সঙ্গে দেখা হোল, তাঁর কপাল দিয়ে আগুনের মত হকা বেরুচ্চে। কি তেজ! বাবাঃ–কি রকম সব ব্যাপার। ও সব স্বপ্ন, কি বলো?
–নিশ্চয়ই, আশা।
-তুমি এলে ভালই হোল। ঘরদোর ঝাঁটপাট দিই। উনুনগলা ভেঙে জঙ্গল হয়ে গিয়েছে। চড়ই পাখীর বাসা হয়েছে কড়িকাঠে। হাটবাজার করে এনে দাও। সেই মরুভূমির মত জায়গা থেকে কে যেন আমায় এখানে টেনে নিয়ে এল। থাকতে পারলাম না।
পরে কাছে এসে অপরাধীর সুরে বল্লে–হ্যাঁগো, আমায় বাপের বাড়ীতে ফেলে রেখেছিলে কেন এতদিন? রাগ করেছিলে বুঝি?
যতীন স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইল, সে দৃষ্টিতে গভীর অনুকম্পা, অতলস্পর্শ অনুকম্পা–সৰ্ব্ববাসনাশূন্য উদার ক্ষমা…কোনো কথা বল্লে না।
আশা মুগ্ধদৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে হাসি হাসি মুখে বল্লে–বেশ চেহারা হয়েছে তোমার।
হঠাৎ আশা চীকার করে উঠলো–একি! ওমা, একি হোল! কোথায় গেলে গো? এই যে ছিলে? ওমা এ সব কি!
যতীন বুঝলে সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েচে আশার কাছে। পৃথিবীতে কতক্ষণ সে থাকবে, পৃথিবীর আসক্তি ও চিন্তায় তার দেহ স্থলস্তরের দর্শনযোগ্য হয়েছিল অল্প সময়ের জন্যে, ওর চিন্তার প্রবল আকর্ষণ। নরক থেকে আশাকে এনেছিল এখানে। আশাও আর থাকতে পারবে না। এখুনি ওকে চলে যেতে হবে। উভয় স্তরে জীবের কোন যোগাযোগ নেই।
রামলাল পর্যন্ত এসে যতীনকে আর দেখতে পেলে না। যতীনের দেহ আবার তৃতীয় স্তরের মত হয়ে গিয়েছে।
রামলাল বল্লে–কোথায় গেলে, ও যতীনদা? থাকো থাকো, যাও কোথায়? ও যতীনদা–
ততক্ষণে নরকের প্রবল আকর্ষণে আশাও তার নিজের স্তরে নীত হয়েচে।
যতীন দীর্ঘনিশ্বাস ফেললে। এ জগতের এই নিয়ম!
আশা সত্যিই বলেচে, কোটা স্বপ্ন কোটা আসল তা বোঝবার যো নেই।
সে কোন্ দেবতা, যাঁর শরণ সে নিতে চায়, এ স্বপ্নের শেষ করতে চায়। করুণাময় এমন কে মহাদেবতা আছেন, যাঁর কৃপাকটাক্ষে আশা তো আশা, কত মহাপাপী উদ্ধার হয়ে যায় চোখের এক পলকে, মহারুদ্রের জ্যোতিস্ত্রিশূলের এক চমকে অনন্ত ব্যোম ঝলমল করে ওঠে পুণ্যের আলোয়, পাপতাপ পুড়ে হয় ছারখার, অবাস্তব স্বপ্নের অবসানে। হে অনন্তশয়নশায়ী নিদ্রিত মহাদেবতা, জাগো, জাগো!
ওদের বাড়ীর পেছনের বাঁশবনে কর্কশস্বরে পেঁচা ডাকচে। শীতকালে রাধালতায় থোকা থোকা ফুল ফুটেচে বেড়ার ঝোঁপজঙ্গলে। ঝিঁঝি ডাকচে ডোবার ধারে। মনে হয় চাঁদ উঠেচে পূৰ্ব্বদিকের আকাশে। আকাশের নক্ষত্রদল পাৎলা হয়ে এসেচে। বোধ হয় পৃথিবীর কৃষ্ণা প্রতিপদ কিংবা দ্বিতীয়া তিথি।
পুষ্প করুণাদেবীর দেখা পায়নি বহুদিন।
তিনি নানা ধরনের কাজে সৰ্ব্বদা ব্যস্ত থাকেন, পুষ্প সেজন্যে তাঁকে তেমন ডাকে না। আজ অনেকদিন পরে পুষ্পের মনে হোল, করুণাদেবীর একবার খোঁজ করা দরকার। সে ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্যে উচ্চস্বর্গে উঠে গেল, তাঁর সেই ক্ষুদ্র গ্রহটিতে, সেই কুসুমিত উপবনে। যখনই সে এখানে আসে তখন কি এক বিস্ময়কর আবির্ভাবের আশায় সৰ্ব্বদা সে থাকে, কি সৌন্দর্য্য ও শান্তির লীলাভূমি এই পবিত্র দেবায়তন। সুগন্ধ কিসের সে জানে না, কোন্ ফুলের সে সুগন্ধ তাও জানে না–কিন্তু অন্তরাত্মা তৃপ্ত হয়, সারা মন খুশি হয়ে ওঠে হঠাৎ। মহারূপসী দেবী ওকে হাসিমুখে হাত ধরে একটি বিশাল বনস্পতিতলে স্ফটিকবেদীতে নিয়ে গিয়ে বসালেন। পুষ্প চেয়ে চেয়ে। অবাক হয়ে ভাবলে–এ গাছ তো এত বড় দেখিনি, এত বড় গাছই তো ছিল না।
