পুষ্প অবাক হয়ে নিজের কপালে হাত দিয়ে দেখতে গেল। সে আবার কি! পরক্ষণেই ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো দরদর। করে। সে হাত দিয়ে মুছে বল্লে–ভাই বৌদি–
আশার ভয় ও বিস্ময় তখনও যায়নি। সে দূর থেকেই আপন মনে বললে–বাবাঃ–কি এ! আর দেখা যাচ্ছে না। কি আগুন!…
তারপর সে ছুটে এসে পুষ্পের পা দুখানা জড়িয়ে ধরে বল্লে–কে আপনি? আমায় বলুন কে আপনি? আপনি তো সহজ কেউ নয়। স্বগগো থেকে দেবি এসেছেন আমায় দয়া করতে?
আশার মুখ দিয়ে অজ্ঞাতসারে একটা বড় সত্য কথা বেরুলো।…
যতীন সব শুনলে। আশার এই পরিণতি! সেই আশা। কি জানি কেন শুধুই মনে পড়ে ওদের কাঁটালগাছের দিকের ঘরের সেই ফুলশয্যায়। বৃষ্টিধারামুখর রাত্রিটি, সেই সব দিনের কথা আজও যেন মনে হয়। কাল ঘটে গেল। কেন এমন অসারতা সংসারে, কেন এমন মিথ্যার উৎপাত! যা ভালো বলে মনে হয়, জীবন যাতে পরিপূর্ণ হোল মনে। হয়–তা কেন দুদিনও টেকে না? অমৃত বলে যা মনে হয়, তা থেকে বিষ ওঠে কেন?..
এই ঘোর বিষাদের দুর্দিনে যতীন সবদিক থেকে সব আলো একেবারে হারিয়ে ফেললে। কালো কালিতে সব লেপে একাকার হয়ে গেল। কেবল পুষ্প তাকে কত করে বুঝিয়ে রাখতো।
যতীন বলে–জীবনে আর কি রইল আমার? ওর সঙ্গে দেখাটা করিয়ে দাও
-–তোমাকে ও দেখতে পাবে না।
–তবে তোকে দেখতে পেলে যে?
–সে রঘুনাথদাস ঠাকুরের মহিমায়। তুমি কষ্ট পাবে। বৌদির সে কষ্ট তুমি কি করে দেখবে?
তখনকার মত যতীন বুঝে গেল। পুষ্পও কিছু নিশ্চিত হোল। একটা অন্য ঘটনাতেও যতীনের মন একটু অন্যদিকে চলে গেল। ওদের গ্রাম কুড়লে বিনোদপুরের রায় সাহেব ভরসারাম কুণ্ডুর বড় ছেলে রামলাল কুণ্ডুকে একদিন ও খুব বিষণ্ণ অবস্থায় দ্বিতীয় স্তরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে দেখলে। একটা গাছের তলায় সে বসে আছে। গালে হাত দিয়ে, যতীন দেখে ওকে চিনতে পেরে তখনই ওকে দেখা দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করলে–নয়ত ওর দেহ রামলালের নিকট অদৃশ্যই থাকবে।
রামলাল ওকে দেখতে পেয়ে আশ্চর্য হয়ে হাঁ করে ওর দিকে চেয়ে রইল। বল্লে–যতীন না?
–হ্যাঁ। তুমি কবে এলে?
–আসা-আসি বুঝিনে, এ জিনিসটা কি বল তো? বাড়ী যাই, সবাইকে দেখি–বাবা, মা, বৌকেউ কথা বলে না। আমি মরে গিয়েচি বলে আমার নাম নিয়ে সবাই কাঁদছে।
–ঐ তো তুমি মরে এখানে এসেচ। এ জিনিসটাই মৃত্যু।
–আমারও সন্দেহ হয়েছিল, বুঝলে? কিন্তু ভাল বুঝতে পারিনি।
–কেন, তোমাকে কেউ নিয়ে আসেনি?
–আমার ঠাকুরদাদা এসেছিল, এখনও মাঝে মাঝে আসে। বড় বক বক করে, আমার পছন্দ হয় না।
রামলাল যতীনের বয়সী, বড়লোকের ছেলে। সুরা ও নারীর পেছনে গত দশ বছরে লাখখানেক টাকা উড়িয়ে দিয়েছে। অত বড় ব্যবসা ওদের, কখনো কিছু দেখতো না, বৃদ্ধ বাপ দোকান আগলে বসে থাকতো, রামলাল দোকান বা আড়তের ধারেও যেতো না। যতীন এসব জানে।
তারপর রামলাল হি-হি করে হেসে বল্লে–ঠাকুরদাদা কি করে জানো? রোজ দোকানে গিয়ে বাবার পাশে বসে থাকে, বেচাকেনা দেখে। বাবা হাত-বাক্সের সামনে যেখানে বসে না? ঠিক ওর পাশে। রোজ ঠাকুরদা গিয়ে দুঘণ্টা তিনঘণ্টা করে বসে। মানে, ঠাকুরদাদার নিজের হাতে গড়া আড়তটা, ওর মায়া বড় বেশি।
-বলো কি! উনি তো মারা গিয়েচেন আজ কুড়ি বাইশ বছর। তখন আমি কলেজে পড়ি, বেশ মনে আছে। এখনও রোজ তোমাদের আড়তে গিয়ে বসেন?
রামলাল আবার হি-হি করে হাসতে লাগলো। বল্লে–আচ্ছা ভাই, সেকথা যাকগে। এখানে কেমন করে মানুষ থাকে বলতে পারো? আজি কতদিন এসেচি ঠিক মনে নেই, তবে মাস দুইএর বেশি হবে না। একটা মেয়েমানুষের মুখ দেখতে পাইনি এর মধ্যে! এক ফোঁটা মাল পেটে যায়নি–ফুর্তি করবার কিছু নেই। ছ্যাঃ, নিরিমিষ জায়গা বাপু, যা বলো। মানুষ এখানে ট্যাঁকে?
পরে চোখ টিপে বল্লে–বলি, সন্ধানে-টন্ধানে আছে?
যতীন ওর পাশে বসলো। মনে মনে ভাবলে–A wasted life আমার নষ্ট হচ্চে যেজন্যে, তা আমার নিজের দোষ নয়, কিন্তু এ নিজে জীবনটাকে বিলিয়ে দিয়ে এসেচে নিজের হাতে!
রামলাল বল্লে–আছ কোথায়?
–এখানেই।
–মাঝে মাঝে এসো। বড় একা পড়ে গিয়েচি। আচ্ছা, হরিমতিকে দেখতে পাও? বুঝতে পেরেচ? –গাঙু গোসাইএর মেয়ে হরিমতি। তাকে এসে পৰ্য্যন্ত খুঁজচি–এক সময়ে তার সঙ্গে ছিল কিনা!
যতীন একটু অবাক হয়ে গেল। গাঙু গোসাঁই এর যে মেয়ের কথা এ বলছে, তাকে নিষ্ঠাবতী বৈষ্ণবী হিসেবে সে জানতো। তবে সে যুবতী এবং সুন্দরী ছিল বটে। আশালতা যেবার বাপের বাড়ী চলে গেল, সেই বছর সে কি জানি কেন গলায় দড়ি দিয়ে মারা যায়। হরিমতির চরিত্র ভালো ছিল বলেই তার ধারণা আছে এ পর্যন্ত।
যতীন বল্লে–না, ওসব দেখিনি। তুমি এখন ওসব ছাড়। মরে। চলে এসেচ পৃথিবী ছেড়ে। মদ মেয়েমানুষ এখানে কি কাজে লাগবে। তোমার? হরিমতিকে তা হোলে তুমিই নষ্ট করেছিলে, তোমার জন্যে তাকে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হয়?
-না ভাই। তোমার পা ছুঁয়ে বলতে পারি। সে ভালো চরিত্রের মেয়ে গোড়া থেকেই ছিল না। অঘোর কুণ্ডুর সঙ্গে তার গোলমাল হয় তা আমি জানি। জানাজানি পাছে হয় তাতেই সে গলায় দড়ি দিয়ে মরে। আমায় অত খারাপ ভেবে না। ফুৰ্ত্তিটুৰ্ত্তি করতাম বটে, তা বলে–
–বেশ, তবে ও পথ একেবারে ছেড়ে দাও, নইলে যেমন কষ্ট পাচ্চ এমনি কষ্ট পাবে।
