–তুমি এখানে এলে কার সঙ্গে?
–এলাম কার সঙ্গে তা মনেই পড়ে না। একদিন বাড়ীওয়ালী মাসী বল্লে– তোমায় আলিপুরের বাগানে নিয়ে যাবো–সেখানে একটি বাবু তোমার সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে চায়। ঘরে সেদিন কিছু খাবার। নেই। বাড়ীভাড়া কুড়ি টাকার জন্যে তাগাদা করে করে বাড়ীওয়ালী তো আমার মাথা ধরিয়ে দিতে লাগলো। রাত্রে ঘরে খিল দিয়ে শুলাম, তারপর যে কি হোল, আমার ভাল মনে হচ্চে না।
–বাড়ীওয়ালী তোমায় আলিপুরে নিয়ে গিয়েছিল?
–কি জানি ভাই, তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। এখানে। আজ ক’দিন আছি তাও মনে নেই। খিদে-তেষ্টা পেয়েছে–অথচ খাবার পাইনে। না আছে একটা লোক, না আছে একটা দোকান-পসার। আচ্ছা, এর বাজারটা কোন দিকে?
পুষ্প কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বল্লে–আশা বৌদি, যতীনদাকে মনে পড়ে?
আশা কেমন যেন চমকে উঠে ওর দিকে অল্পক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে বল্লে–তুমি তাঁকে কি করে জানলে?
–জানি আমি। দেশের লোক যে গো! একগাঁয়ে বাড়ী।
আশার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। হাত দিয়ে মুছে বল্লে– তিনি স্বগ্গে চলে গিয়েছেন, তাঁর কথা আর আমার মুখে বলে কি লাভ?
–সে কথা বলচিনে বৌদি, সত্যি কথা বলো তো আমার কাছে, তাঁর কথা তোমার মনে হয় কি না?
আশা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বল্লে–হয়। যখন হয় তখন বুকের মধ্যে কেমন করে উঠে–
-–কেন বৌদি?
–আমি হতভাগী তাঁকে একদিনও সুখ দিইনি। তখন ছেলেমানুষ ছিলাম, বুঝতাম না।–কেবলই বাপের বাড়ী এসে থাকতাম শ্বশুরবাড়ী থেকে–
–কেন?
–শ্বশুরবাড়ীতে খাওয়া-দাওয়ার বড় কষ্ট পেতাম। ছেলেমানুষ তখন–
-–তোমার একথা সত্যি নয় বৌদি। আমার কাছে সব খুলে বলো ভাই?
আশা চুপ করে নখ খুঁটতে লাগলো। এ কথার কোনো জবাব দিলে। পুষ্প বল্লে–বলবে না ভাই?
আশা বল্লে–কি হবে শুনে সে সব কথা। আমার বুদ্ধির দোষেই যা কিছু সব হয়েছে। আমি আমাদের গ্রামের মজুমদার-পাড়ার একটা ছেলেকে ভালবাসতাম।
–বিয়ের আগে থেকে, না বিয়ের পরে?
–বিয়ের আগে নয়, কিছুদিন পরে।
–বিয়ের পরে অন্য কারো সঙ্গে ভাব করতে গেলে কেন? এটা খুব অন্যায় হয়েছে তোমার বৌদিদি। হিন্দুর মেয়ে, দ্বিচারিণীর ধর্ম কে শেখালে?
আশা চুপ করে রইল। পুষ্পের কড়াসুরে বোধহয় একটু ভয় খেয়েই গেল।
–কথার উত্তর দিলে না যে?
–আমার অদেষ্ট ভাই। ও কথার কি উত্তর দেবো?
-কিন্তু আমি তোমায় বলচি তুমি এখনও সেই লোকটাকেই ভালবাসো। যতীনদার ওপর তোমার কোনো টান নেই। আমি সব বুঝতে পারি ভাই। আচ্ছা, তোমার ঘেন্না হয় না? যার জন্যে এত কষ্ট, যে তোমাকে ফেলে চলে গেল, যার জন্যে তোমাকে আফিং খেয়ে মরতে হোল, আবার সেই ইতর লোকটার জন্যে এখনও ভাবনা? যতীনদা দেবতার মত স্বামী তোমার, তাকে একদিন দেখলে না মরবার সময়ে, তার কুলে কালি দিয়ে ঘর ছেড়ে চলে এলে–
আশার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। সে বল্লে–আফিং খাওয়ার কথা তো কেউ জানে না–তুমি কি করে জানলে? আমি তো–
-আফিং খেয়ে তুমি মারা গিয়ে বৌদি। তুমি বেঁচে নেই–মরে প্রেতলোকে এসে কষ্ট পাচ্চ–
আশা এবার যেন খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললে। এটা তাহলে ঠাট্টা! তবুও আফিং খাওয়ার কথা এ কি ভাবে জানলে। পরক্ষণেই একথা ওর মনে হোল–কে এ মেয়েটা, গায়ে পড়ে আলাপ করতে এসেছে? এত হাঁড়ির খবরে ওর কি-ই বা দরকার? ওর গলা ধরে কে কাঁদতে গিয়েচে তা তো জানি নে। সে যা খুশি করেছে, তার জন্যে। ওর কাছে এত কৈফিয়ৎ দেবার বা কি গরজ। শ্বশুরবাড়ীর লোক বোধ হয়, ওই গাঁয়েরই মেয়ে–তাই এত গায়ে ঝাল।
মৃদু হেসে বল্লে–তা যাই বলো ভাই–মরে ভূত হওয়াই বই কি এক রকম–
পুষ্প দৃঢ়কণ্ঠে বল্লে–তা নয়। আমি ঠাট্টা করিনি। মারা তুমি গিয়ে। আফিং খেয়ে ঘরে খিল দিয়ে শুয়ে ছিলে কলকাতার বাসায়, মনে নেই? তারপর তুমি মরে যাও, মরে এই প্রেতলোকে এসেচ।
আশার মুখে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস ও সন্দিগ্ধতার চিহ্ন ফুটে উঠতে দেখে ও বল্লে–এখনও বিশ্বাস হোল না বৌদি? আচ্ছা, তোমায় বিশ্বাস করবো। চলো–তোমাদের গাঁয়ে তোমাদের বাড়ী যাবো?
আশা কিছু না ভেবেই ঝোঁকের মুখে বল্লে–সেখানে আর কি মুখ নিয়ে যাবো
–গেলেও কেউ টের পাবে না। সত্যি-মিথ্যে চলো চট করে পরীক্ষা করে নিয়ে আসি। তোমার প্রেতদেহ হয়েছে। এ দেহ পৃথিবীর মানুষের চোখে অদৃশ্য।
পুষ্পের কথার ভাবে ও সুরে আশা কি বুঝলে যেন, ওর হঠাৎ ভয়ানক আতঙ্ক হোল। কি সব কথা বলে এ! যদি সত্যিই তাই হয়? সে যদি সত্যিই মরেই গিয়ে থাকে?
ঠিক সেই সময় একটি নিম্নশ্রেণীর প্রেত দুটি অল্পবয়সী মেয়েকে একাকী দেখে পূৰ্ব্বসংস্কার বশত ওদের দিকে ছুটে এল। মুখে দু একটি অশ্লীল কথাও উচ্চারণ করলে, ঘোর কামাসক্তিতে তার চোখ ও মুখের অবস্থা উন্মত্ত পশুর মত।
ওর বিকট হাবভাব দেখে আশা ভয়ে পুষ্পকে জড়িয়ে ধরে চীৎকার করে বল্লে–ওই দ্যাখো ভাই কে একটা আসচে—মাগো–
পুষ্পও ভয় পেয়েছিল, সেও প্রথমটা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল কিন্তু হঠাৎ একটা আশ্চৰ্য্য কাণ্ড ঘটলো, লোকটা ওদের কাছে এসে পড়ে পুষ্পর দিকে চেয়েই জড়সড় হয়ে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল। তারপর দিগ্বিদিগ জ্ঞানশূন্য ভাবে ছুট দিলে সোজা।
হঠাৎ আশা ভয়ে ও বিস্ময়ে পুষ্পের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে বল্লেওকি! তোমার কপাল দিয়ে আগুন বেরুচ্চে যে!…এ কি! ওমা– কি সৰ্ব্বনাশ।
