হঠাৎ চমক ভেঙে সে দেখলে তারা তিনজনে মাত্র আছে। গ্রহদেব বৈশ্রবণ কখন অন্তর্হিত হয়েছেন। করুণাদেবী বল্লেন–উনি এ সব পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না।
পুষ্প বল্লে–আমাদের বড় সৌভাগ্য যে, ও’র দেখা পেয়েচি–অবিশ্যি আপনার দয়ায়।
ফেরবার পথে আকাশে উঠে পুষ্পকে দেবী দেখালেন, পৃথিবীটার চারিদিকে আকাশে কুয়াসার মত, মেঘের মত পিঙ্গল প্রভার আবেষ্টিত করে রেখেছে কি সব। বল্লেন–পৃথিবীর তাবৎ অধিবাসীদের বাসনা কামনা মেঘের মত জমা হয়েচে ও বায়ুমণ্ডলে। ওদের কাছে অদৃশ্য, যেমন আমরা ওদের কাছে অদৃশ্য। তোমাদের পৃথিবীতেও আছে এই রকম–এর চেয়েও বেশি। এই সব ঠেলে আমাদের যাতায়াত বড় কষ্টকর–তোমাদের পৃথিবীর শহরগুলোতে তো আরও বেশি। টাকার নেশা, সুরার নেশা, রূপের নেশা-ওর আকাশ ধূসর বাষ্পে ছেয়ে রেখেচে–তাতে বিষ আছে, আমাদের পক্ষে সে ঠেলে যাওয়া কত
যতীন বিরক্তির সুরে বল্লে–সব তাতেই তোমার ঠাট্টা। আমার ব্যথা আমিই জানি।
–বেশ ভালই। যাও, গিয়ে দেখে শুনে এসো, মায়ের বাছা–আহা!
–তুমিও চলো। পথে নানা বিপদ, চুম্বকের ঢেউ–ঢেউ কখন কি রকম হবে, ওসব আমি বুঝতে পারিনে। শেষকালে আবার কোথায় গিয়ে ঠেলে উঠবো জন্ম নিয়ে, বিশ্বাস কিছুর নেই। তার চেয়ে চলো সঙ্গে।
কোলা বলরামপুর গ্রামে ঝাঁ ঝাঁ করচে শরতের দ্বিপ্রহর। নিবিড় বাঁশবনে ঘুঘু ডাকচে উদাস-মধ্যহ্নবেলায়, বনে বনে তিৎপল্লার হলুদ ফুল ফুটেছে। যতীন অনেকদিন পরে বাংলার শরতের এ সুপরিচিত দৃশ্যগুলি দেখলে। বাঁশঝাড়ে সোনার সড়কির মত নতুন বাঁশের চারা ঠেলে উঠেছে, বনসিমতলায় বেগুনি ফুল ফুটে ঝোঁপের মাথা আলো করচে-বর্ষার শেষে জল মরে যাচ্চে ডোবায়, পুকুরে নদীতে-তীরের টাটকা কাদায় সাদা বক গেঁড়ি গুগলি খুঁজে বেড়াচ্ছে, জলের ধারেই কাশফুলের ঝাড় থেকে হাওয়ায় কাশফুলের সাদা তুলোর মত পাপড়ি উড়চে।
যতীন বল্লে–কি চমৎকার, পুষ্প! বাংলার সব পাড়াগাঁয়েই এমন। মন খারাপ হয়ে গেল। এর সঙ্গে জীবনের কত স্মৃতি জড়ানো! ছেলেবেলায় এমনি শরতে পূজোর ছুটিতে স্কুল-বোডিং থেকে বাড়ী আসতুম…দ্যাখো দ্যাখো এই গেরস্তর বাড়ীটিতে কি শিউলি ফুলটা তলায় পড়ে রয়েছে! আহা!
পুষ্প বল্লে–দুপুরের রোদে এখনও শুকোয় নি-ঘন ছায়া কিনা!
যতীন স্বপ্নলস চোখে বল্লে–কতকাল পরে যেন নিজের মাটির ঘরটিতে ফিরে এলুম পুষ্প। এমনি স্নিগ্ধ, এমনি আপন। চলো–
ঘরের মধ্যে বিছানা পাতা–তাতে যতীনের সেই তরুণী মা আধময়লা লেপকাঁথা গায়ে শুয়ে ম্যালেরিয়ায় ভুগচে। শুধু এখানে নয়, পাশের বাড়ীতেও তাই-জানালার কাছে ছোট তক্তপোশে আর একটি বৌ। শুয়ে জ্বরে এপাশ-ওপাশ করচে, তার পাশে দুটি ছোট ছোট ছেলে– জ্বরে ধুকচে তারাও। রান্নাঘরে একটি বৃদ্ধা কলাই-এর ডালে সম্বরা দিয়েছেন, তারই সুগন্ধ জ্বরাক্রান্ত বাড়ীর বাতাসে। পাশের বাড়ীর বৌটি চিঁচিঁ করে বলচে–একটু জল দিয়ে যাও পিসিমা।
বৃদ্ধা বলচে–একা মানুষ কতদিকে যাবো, ক’টা হাত পা? কাল। গিয়েচে একাদশী, আর এই খাটুনি। একটু সবুর করো। গোরু দুটো সেই কোন্ সকালে বেঁধে দিয়ে এসেচি নদীর ধারের বাড়ায়, একটু জল দেখিয়ে আসবার সময় পাইনি এত বেলা হোল।
যতীন এসে ওর নতুন মায়ের বিছানার পাশে দাঁড়ালো। একটু আগে ওর মা ওর কথা মনে করে কেঁদেছে জ্বরের ঘোরে। এই তো গত বর্ষায় ও মায়ের কোল ছেড়ে গিয়েছে, সে স্মৃতি ওর মায়ের মনে এখনও অতি স্পষ্ট। চোখের জল গড়িয়ে পড়েছে বালিশের গায়ে। মাতৃহৃদয়ের নিঃশব্দ ব্যথার অভিব্যক্তি। যতীন বুঝলে, মায়ের এই চোখের জল, বুকের চাপা কান্নাই তাকে আজ সপ্তমস্বর্গের পার থেকে টেনে এনেছে এখানে। মাতৃশক্তির আকর্ষণ অদম্য, কেউ তাকে তুচ্ছ করতে পারে না, হোলই বা মাটির ঘরের দুদিনের মা। সব মা-ই তো দুদিনের।
পুষ্প বল্লে–যা ভাবচো তা নয় যতীনদা। মায়া বলে উড়িয়ে দিতে চেও না পৃথিবীকে, পৃথিবীর স্নেহ-ভালবাসাকে। তোমার সাধ্যি কি এই মাতৃশক্তিতে অবহেলা কর। নিজের নিজের জায়গায় কারো শক্তি কম নয়।
যতীন কৃত্রিম রাগের সুরে বল্লেওঃ এখন যদি সেই সমাধিবাজ সন্নিসিটাকে পেতাম–বুঝিয়ে দিতাম তাকে–
–মহাপুরুষদের নামে অমন বোলো না, ছিঃ! তিনি যে ভূমিতে উঠে জগৎকে মায়া দেখেছেন, তোমার সে জ্ঞান কোথায়? যে অবস্থা যার, তাই তার কাছে সত্যি আর সহজ। তোমার কাছে এই সত্যি। বদ্ধ জীব তুমি।
–তাহোলেই পুস্প, জগৎটা কি কতকটা ভেল্কির মত লাগছে না? বদ্ধ জীব বলে গালাগালি তো দিচ্চ–
–আবার তোমার বোঝবার ভুল। যাক, ও সব বড় বড় কথা। তিনি যখন বোঝাবেন তখন বুঝো। এখন তোমার মায়ের সেবা করো– আমি যাই পাশের বাড়ীর বৌটির কাছে–জ্বরের ঘোরে বমি করচে এই শোনো–আহা!
–তার ওপর বাড়ীতে তো দেখেচি এক খান্ডার পিসশাশুড়ী ছাড়া মুখে জল দেবার কেউ নেই–
যতীন বসে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঘরের চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো। অতি দরিদ্রের ঘরকন্না, ময়লা কাঁথা, ছেঁড়া মাদুর আর মাটির হাঁড়িকুঁড়ির গেরস্থালি। খানিক আগে পাশের ঘরের মেজেতে কে পান্তাভাত খেয়ে এঁটো থালা-বাসন ফেলে রেখেছে–একটা বেড়ালছানা থালার আশেপাশে ঘুরছে। হয়তো তার মা জ্বর আসবার আগে পান্তাভাত ক’টা খেয়ে থাকবেন, গরীবের ঘরে জ্বরের উপযুক্ত পথ্য জোটে নি। কেন তাকে পুষ্প নিয়ে গেল এখান থেকে? এই ঘরে মায়ের কোলটি জুড়ে সে বেশ থাকতো। তারপর একদিন সুখদুঃখে বড় হয়ে উঠতো, ভাল চাকুরী করে এই দরিদ্রের ঘরণী মায়ের সেবা করতো। ভাঙা বাড়ী সারাতো, মাকে ভালো ভালো শাড়ী, কানের দুল, হাতের বালা চুড়ি কিনে দিতো, ম্যালেরিয়ার সময় এখান থেকে নিয়ে যেতে দেওঘর মধুপুরে। ওইখানে সজনেতলায় বড় রান্নাঘর তৈরি করে দিত, সানাই বাজনার মধ্যে একদিন বিয়ে করে বৌ এনে মায়ের বুকে সুখের ঢেউ তুলতো, নানা দিক দিয়ে মায়ের শত সাধ পূর্ণ করতো। আজ এই যে অসহায় অশিক্ষিতা পল্লীবধূ জ্বরের ঘোরে তাকেই স্মরণ করে কিছুক্ষণ আগেও কেঁদেচে–কি অপূৰ্ব্ব! স্নেহের অমৃতেই ওর বুকে জমা রয়েছে তার জন্যে। এর জন্যে তার মন। পিপাসিত–কি হোল তার স্বর্গে গিয়ে? স্বর্গ তো পালাচ্ছিল না।
