যতীন বল্লে–প্রভু, এই পৃথিবীর মানুষে ভগবানকে জানে?
সব পৃথিবীর অবস্থাই সমান। সত্য জানতে চায় ক’জন? এখানে তো দেখচো, ইন্দ্রিয় সুখ নিয়ে সবাই মত্ত। সেই বিরাট মহাশক্তির ধারণা করা এদের পক্ষে সহজ নয়। অবশ্য এরা পৃথিবীর জীবের চেয়ে অধিকতর জড়বুদ্ধিসম্পন্ন। বহুঁকাল, যুগ-যুগান্ত কেটে যাবে এদের সমস্ত জড়তা, মনের মালিন্য দূর করে সে ধারণা উদ্বুদ্ধ করতে। কিন্তু বিশ্বের ভগবানের অসীম ধৈৰ্য্য। কাউকে তিনি অবহেলা করেন। না। তবে অনেক দেরি হয়ে যাবে। যারা নিরলস আত্মা, আধ্যাত্মিক জ্যোতি যাদের মধ্যে জ্বলচে স্বয়ম্প্রভ মহিমায়, তারা এক জন্মেই ঘুম। ভেঙে চেয়ে দেখে। যেমন বলেছিলেন তোমাদের গ্রহের এক প্রাচীন। কবি–বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্ আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ আমি অন্ধকারের ওপারের সেই আদিত্যবর্ণ মহান্ পুরষকে জেনেচি– ওগো শোনো সবাই শোন–শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ। কত আনন্দ! আনন্দের ভাগ সবাইকে না দিলে যেন চলচে না। কিন্তু ভাবো, ক’জন সেজন্যে ব্যগ্র? আদিত্যবর্ণ পুরুষকে না জানলেও তাদের জন্মের পর জন্ম, যুগের পর যুগ, এমন কি কল্পের পর কল্প পরম আরামে অন্ধের মত কেটে যাচ্চে চির-অন্ধকারে! তাঁর ওপারে কি আছে কে সন্ধান রাখে?
যতীনের মনে একটা প্রশ্ন জাগলো। প্রশ্নটা সে করলে–তাঁদের মত অসীম শক্তিধর দেবতা কৃপা করলে তো একদিনে সব উদ্ধার হয়! সত্যের প্রচার করে দিলেই তো হয়।
দেবতার মুখে অনুকম্পার হাসি ফুটে উঠলো। বল্লেন–তা কি হয়? যে পৃথিবী যে সত্যের জন্যে প্রস্তুত নয়, যে মানুষকে যে কথা বল্লে সে বুঝবে না–সেখানে সে সত্য প্রচার করা হয় না–সে মানুষকে সে কথা জোর করে শোনানো হয় না। স্বাতীনক্ষত্রের জল ঝিনুকে পড়লে মুক্তা হয়–কিন্তু ধূলোয় পড়লে ভগবান মহাজ্ঞানী। যা হয় না, তা তিনি করেন না।
পুষ্প বল্লে–তবে মানুষের মুক্তি কেমন করে হবে?
–মানুষ যখন স্বেচ্ছায় এগিয়ে যাবে। তাঁর প্রতি উন্মুখ যে মন, সে। মনের সকল ভ্রান্তি তিনি ঘুচিয়ে দিয়ে সত্যের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেন।
–দেব, সহজ কথায় বলুন আমরা কি করবো? আমাদের কি কৰ্ত্তব্য?
-ত্বমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি–তাঁকে জেনেই মৃত্যুকে অতিক্রম করতে হবে।
–কি ভাবে প্রভু? মৃত্যুকে অতিক্রম করা মানে কি?
–সাধারণ মানুষে মরচে, আবার জন্মাচ্চে, আবার মরচে। একে বলে মানব-আবৰ্ত্ত। এ’কে জয় করাই মৃত্যুকে অতিক্রম করা। তাঁকে না জানলে কিছুতেই এ আবৰ্ত্ত এড়ানো যায় না। নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে আয়নায়–আর দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
–পথ বলে দিন দেবতা–আমরা শরণাগত।
গ্রহদেব গম্ভীর মুখে বল্লেন–তাঁকে ডাকো, তাঁর কাছে আলো ভিক্ষা চাও। তাঁর কাছে প্রার্থনা কর সৰ্ব্বদা। পরকে ভালোবাসো। যেখানে প্রেম, ভক্তি, স্নেহ, ক্ষমা–সেখানে তিনি। তিনিই তাঁকে বুঝবার শক্তি দেবেন। তাঁর জন্যে যে সৰ্ব্বত্যাগী, তাকে হাত ধরে তিনিই নিয়ে যান। পরের জন্যে যে সৰ্ব্বত্যাগী, তাকে হাত ধরে তিনিই নিয়ে যান।
–এই মানুষের ধর্ম।
–এর চেয়ে বড় ধর্ম নেই পৃথিবীর মানুষের। যারা নিরলস হয়ে তাঁকে ডাকে, ভালবাসে–পরের সেবা করে, এক অমানব পুরুষ তাদের হাত ধরে দেবযান পথে জন্মমৃত্যুর দুস্তর অকূল মহাসমুদ্র পার করে নিয়ে যান। ভগবান নিজেই সেই অমানব পুরুষ, অপার করুণায় যিনি নিজেই এগিয়ে এসে হাত ধরেন অসহায়ের, শরণাগতের। পৃথিবীর সৃষ্টির আদিকালের বাণী এ। কারণ যা সত্য, তা চিরযুগেই সত্য-এই একই বার্তা যুগে যুগে পৃথিবীতে প্রচার করা হয়েছে, দূতের পর দূত এসেচে, ‘অন্ধ জাগো!’ না–কিবা রাত্রি কিবা দিন! চোখ আছে, কেউ দেখে না; কান আছে কেউ শোনে না!
ওরা সে পৃথিবীর একটি সুরম্য হ্রদ-মত জলাশয়ের ধারে বসেচে। যতীন চেয়ে চেয়ে দেখছিল, ওদের দক্ষিণে-পৃথিবীর দেবদারুজাতীয়
বৃক্ষের মত এক প্রকার ঘন সবুজ বৃক্ষের সারি, কিন্তু তাতে থাবা দোপাটির মত রঙীন ফুল এত ফুটেছে যে, বড় বড় শাখা প্রশাখা নিৰ্ম্মল স্ফটিকের মত জলরাশির কূলে কূলে নুয়ে পড়েছে। বেলা উত্তীর্ণ হয়েছে, নীলকৃষ্ণ দিগন্তরেখার দিকে চেয়ে হঠাৎ সে দেখলে বিশালকায় এক দশমী কি একাদশীর চন্দ্র উদয় হচ্চে! অত বড় চন্দ্র। আকাশের এক দিক জুড়ে আলোয় আলো করে তুলেচে সারা দিক্চক্রবাল।
সে অবাক হয়ে বল্লেও কি রকম চাঁদের মত ওটা–অত বড়–
করুণাদেবী হেসে বল্লেন–বৃহস্পতি! ওর জ্যোৎস্না পড়বে এখনি। পৃথিবীর জ্যোৎস্নার চেয়ে অনেক বেশি জ্যোৎস্না আর অদ্ভুত শোভা। আর একটা ব্যাপার, তোমাদের পৃথিবীর মত অমাবস্যা এখানে নেই, উপগ্রহের ক্ষুদ্র দেহ অতবড় বৃহস্পতি গ্রহকে ঢাকতে পারে না, সুতরাং সপ্তমী থেকে পূর্ণিমা পৰ্য্যন্ত কলা হয়–কিন্তু দ’বৎসর ধরে শুক্লা রাত্রি চলে।
সে মুগ্ধ হয়ে গেল এই সুদূরতর পৃথিবীর অদ্ভুত জ্যোৎস্নাময় রজনীর শোভায়। হ্রদের ওদিকে জলজ ঘাসের আড়ালে তরুদলের ভ্রষ্ট কুসুমরাশি পদদলিত করে একদল পরমা রূপসী নারী জলে নামলো স্নান করতে। কে জানতো আবার এমন সব স্থান আছে, সেখানেও মানুষ আছে। ভগবানের যে কথা গ্রহদেব কিছু আগে বলছিলেন, তাতে তার মন ভরে আছে। যে আদিত্যবর্ণ পুরুষের মানস থেকে এই সব পৃথিবী, এই জ্যোৎস্না, পাহাড় পৰ্ব্বত, বেণু-বীণার ঝঙ্কারের মত সুস্বরা ওই সুন্দরীদের উৎপত্তি, তাঁতেই লয় কল্লান্তে, সৃষ্টি আর প্রলয়। যাঁর নিশ্বাস আর প্রশ্বাস–তিনি কোথায়? কে তাঁকে জানে? কি ভাবে তাঁকে জানা যায়? কে দেখিয়ে দেবে তাঁকে?
