বিস্মিত যতীন পুষ্পের দিকে চেয়ে দেখলে যে তার যাবার কোন। ব্যস্ততা নেই। সে চুপ করে বসেই রইল, কিছুক্ষণ পরে পুষ্পের বিশাল আয়ত চোখ দুটি বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।
যতীন বল্লে–কি হয়েছে, চলো চলো–
–গিয়ে কি হবে। এ যাত্রা রক্ষা হোল গিয়ে–
–বেঁচে গিয়েছে?
–আপাতত বটে। আহা, কি দুঃখ আশা বৌদির!
–আমি সেখানে যাবো পুষ্প। চলো দেখা যাক–
–না।
–তোমার ওই সব কথা আমার ভাল লাগে না পুস্প, সত্যি বলছি। আমি আলবৎ যাবো সেখানে। আমার মন কেমন হচ্চে বল তো?
–সেজন্যেই তোমার আরও যাওয়া উচিত নয়। দেখে কষ্ট পাবে খুব।
-চলো পুষ্প, তোমার পায়ে পড়ি, আচ্ছা তুমি বোঝ সব, অথচ মাঝে মাঝে–
অগত্যা পুষ্প ওকে নিয়ে কলকাতায় আশার বাসায় এসে উপস্থিত হোল। তখন যতীন বুঝতে পারলে কেন পুষ্প এখানে তাকে আনতে চায় নি। নেত্য আজকাল মদ খায়, মাতাল অবস্থায় এসে দিন-দুপুরে সে আশাকে এমন মার দিয়েছে যে, সে ঘরের মেঝেতে পড়ে ভয়ার্ল্ড চোখে দুর্দান্ত মাতালটার দিকে চেয়ে আছে। দরজার চৌকাঠের এপারে একখানা নেপালী কুরি পড়ে, সম্ভবত নেত্যর হাত থেকে ঠিকরে পড়ে থাকবে। ওদের দোরের বাইরে আশপাশের ঘরের ভাড়াটেরা জড়ো হয়ে উঁকি মেরে মজা দেখচে। নেত্য মত্ত অবস্থায় টলচে ও হাত নেড়ে নেড়ে জোর গলায় আস্ফালন করছে–ওকে আমি আজ খুন করে ফেলবো–আচ্ছা পাল মশায়, আপনি বিচার করুন, ওকে কে খেতে দিচ্চে, পরতে দিচ্চে? ও দেশে না খেয়ে মরছিল কিনা ওকে জিজ্ঞেস করুন না? আমি মশাই হক কথা হক কাজ বড় ভালবাসি। আমি আনলাম ওকে এখানে, খাওয়াই পরাই, অথচ সেই শম্ভু ব্যাটা এসে তলায় তলায় ফুৰ্তি মারে। কত দিন পই পই করে বারণ করিচি-করি নি? তেমন পুরুষ বাপে নেত্যনারাণের জন্ম দেয় নি–আজ তোকে খুন। করে ফাঁসি যাবো, সেও থোড়াই কেয়ার করে এই শৰ্ম্মা। এত বড় তোর বদমাইসি! কম করেছি আমি তোর জন্যে? তোর নিজের বিয়ে করা ভাতার কোনো দিন তোকে খেতে দেয়নি, আর আমি কিনা.. দিয়েচে কোনো দিন সেই যতীন?
এই সময় আশা আধ-বসা অবস্থায় উঠে ঝাঁঝের সঙ্গে বল্লে–খবরদার! তিনি স্বগে গিয়েছেন, তাঁর নামে কিছু বোলো না–
নেত্য বিদ্রুপের সুরে বল্লে–ওরে আমার স্বামী-সোহাগী সতী রে! মারো মুখে ঝাঁটা, বলতে লজ্জাও করে না? আমি বলচি, না তুই বলতিস্ সেই যনেটা বেঁচে থাকতে? আবার স্বামী-সোহাগ দেখাতে এসেচেন, মরণ নেই? ভারি স্বামী ছিল মুরোদের, সব জানি, বিয়ে করে একখানা কাপড় কিনে দেবার, এক মুঠো অন্ন দেবার ক্ষমতা হয় নি–
আশা আবার উঠে বল্লে–আবার ওই কথা! তিনি মরে স্বগগে গিয়েছেন, তাঁর নামে কেন বলবে তুমি?
নেত্য হঠাৎ তেড়ে এসে আশার কাঁধে এক লাথি মেরে বল্লে– স্বামীর সোহাগ উথলে উঠলো বদমায়েশ মাগীর, যে বেরিয়ে এসেছে তার মুখে আবার–গলায় দড়ি দিগে যা–
আশার চেহারা আগের চেয়ে খুব খারাপ হয়ে গিয়েচে, গায়ের রঙেও আগের মত জলুস নেই, লাথি খেয়ে সে কিন্তু এবার ঠেলে
উঠলো। বল্লে–তাই দেবো, গলায় দড়ি দিয়ে তোমায় পুলিশের হাতে যদি তুলে না দিই–
-চুপ–পুলিশ তোর বাবা হয়!
–আবার মুখে ওই সব কথা?
এইবার একটি প্রৌঢ়া স্ত্রীলোক এগিয়ে ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়ালো। বল্লে–এসব আপনাদের কি কাণ্ড? আপনার না ভদ্র লোক? আশপাশের বাড়ীতে গেরস্তর ঝি-বউ সব রয়েছে, এখানে মদ খেয়ে চেঁচামেচি চলবে না। হ্যাংগামা করতে হয়, ন্যারা করতে হয়, সরকারী রাস্তা পড়ে রয়েছে। আমার বাড়ী ওসব করলে পুলিশে খবর দিতে হবে।
পালমশায় এবার বোধ হয় সাহস পেয়ে এগিয়ে এসে বল্লেন– আমিও তাই বন্ধু। বলি এখানে ওসব কোরোনি–তা মাতালের সামনে। এগোতে কি সাহস হয়!
প্রৌঢ়া স্ত্রীলোকটি আশাকে ধরে ঘরের বাইরে আনতে আনতে বল্লে–মাতালের সামনে তক্কো কত্তে আছে, ছিঃ মা–দেখচো না ওর এখন কি ঘটে জ্ঞান আছে? এসো আমার ঘরে
আশা চলে যায় দেখে নেত্য জড়িত কণ্ঠে বাজখাঁই আওয়াজে বল্লে– এই, কোথাও যাবিনি বলে দিচ্চি–হাড় ভাঙবো মেরে–খবরদার! এই। আমি এখন চা আর ডিম ভাজা খাবো–করে না দিয়ে যদি নড়বি– নিয়ে যেও না মাসী–
প্রৌঢ়া স্ত্রীলোকটি যেতে যেতে বল্লে–আচ্ছা, চা করে ডিম ভেজে আমার ঘর থেকে পাঠিয়ে দিচ্চি বাবা–আপনি একটু শান্ত হয়ে শুয়ে থাকুন–
পালমশায় উপস্থিত লোকজনদের দিকে চেয়ে বল্লে–চলো সব। চলো, কি দেখতে এসেচো সব? দুটো হাত পা বেরিয়েচে কারো, না ঠাকুর উঠেচে? বনু তখন ওখানে যেওনি, যে বড় কে বাপের ব্যাটা।
শেষের কথা ক’টি পৌরুষগর্বের উচ্চারণ করবার সময় তিনি নেত্যনারায়ণদের ঘর থেকে বেশ একটু দূরে বারান্দার প্রায় ওপাশে চলে গিয়েচেন যদিও, তবুও চলতে চলতে একবার পেছন ফিরে দেখে নিলেন, দুর্দান্ত মাতালটা তাঁর কথা শুনলো কিনা।
যতীন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বল্লে এতদূর নেমেচে ওর অবস্থা। এ। আমি ভাবিনি–
পুষ্প বল্লে–ভাবা উচিত ছিল, এ সব জিনিসের এই কিন্তু পরিণাম এখান থেকে চলো যাই–
যতীন চুপ করে বসে ছিল, আশার দুর্দশা তার মনে গভীর রেখাপাত করেছে। সে দুঃখিত ভাবে বল্লে–তুমি কেবলই এসে চলে যেতে চাও, কিন্তু আমি কোথায় গিয়ে শান্তি পাবো পুষ্প? আমার কর্ত্তব্য পালন করিনি বলেই আজ ওর এই দুর্দশা। আমি যদি স্বামীর কর্তব্য পালন করতাম, যদি আশার জন্যে তেমন টাকাকড়ি রেখে যেতে পারতাম, তাহোলে–
