ক্ষেমদাস বল্লেন–শুনেচি বটে। তবে মনে রাখবেন, আমি কবি ছিলাম, ভক্ত ছিলাম না আপনাদের মত। আপনারা ছিলেন শ্রীচৈতন্যের পার্শ্বচর, আপনাদের মত ভাগ্য আমি করি নি। আমার কৃষ্ণ বিশ্বের বনে বাঁশি বাজিয়ে বেড়ান, বালকস্বভাব–উদাস; কেউ যদি ডাকে তার কাছে যান, না ডাকলে আপন মনেই একা একা থাকেন। অনাদিকাল থেকে এমনি। তাঁকে যদি ভালবেসে কেউ ডাকে, তবে তিনি সঙ্গী পেয়ে খুশি হন–তিনি করুণস্বভাব, ভালবাসার বশ।
পুষ্প বল্লে–কেন একা থাকেন? রাধা কোথায়?
–ও সব কল্পনা। এই সব ভক্তপ্রভুরা বানিয়েছেন। কে রাধা? যে নারী ভালবাসে তাঁকে, সে-ই রাধা। সে-ই তাঁর নিত্যলীলার সহচরী। মীরাবাঈ যেমন।
–মীরাবাঈ আছেন?
–আছেন। তাঁরা নিত্যলীলার সহচরী ভগবানের–যাবেন কোথায়? বহু পুণ্যে তাঁদের দর্শন মেলে। বহু ঊর্ধ্বলোকে ওঁদের অবস্থিতি। আবার বিশ্ব ব্যেপে ওঁদের অবস্থান, তাও বলতে পারো। পৃথিবীর ব্যক্তিত্ব তাঁর নষ্ট হয়ে গিয়েছে বহুঁকাল, ও তো স্থূল দেহ ধরে লীলা করবার জন্যে যাওয়া। ওটা কিছু নয়। পৃথিবীর সেই মীরাবাঈকে কোথাও পাবে না। আছেন খাঁটি তিনি–অর্থাৎ যে শুদ্ধ, বুদ্ধ, চৈতন্যস্বরূপ আত্মা মীরাবাঈ সেজে অবতীর্ণ হয়েছিলেন দুদিনের জন্যে, তিনি আছেন।
যতীন বলে উঠলো–তাই আপনার মত একজন কবি বলেছেন–All the world’s a stage, and the men and women merely players–অর্থাৎ–
ক্ষেমদাস মৃদু হেসে বল্লেন-বুঝেচি। গভীর সত্যবাণী। নানাদিক থেকে সত্য–নানাভাবে।
যতীন একটু বিস্ময়ের সুরে বল্লে–আপনি কি ইংরিজি জানেন?
–ভাষার সাহায্যে বুঝি নি, তোমার মনের চিন্তা থেকে ও উক্তির অর্থ বুঝেচি। ওঁর সঙ্গে আমার দেখাও হয়েছে। পঞ্চম স্তরে কবি সম্মেলন হয়, সেখানে পৃথিবীর সব দেশের বড় বড় কবি আসেন
যতীন ব্যাকুল আগ্রহের সুরে বল্লে, আপনি কালিদাসকে দেখেচেন? ভবভূতি?
–সে সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পৃথিবীর সে কালিদাস নয়–যে নিত্য মুক্ত কবি-আত্মা কালিদাসরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, সেই আত্মার সঙ্গে আমার পরিচয়। একবার নয়, অনেকবার নানা দেশে নানা প্রাকৃত দেহ ধারণ করে তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু আসলে তিনি অপ্রাকৃত দেহধারী চিদানন্দময় আত্মা; আজ নাম কালিদাস, কাল নাম চণ্ডীদাস, পরে ক্ষেমদাস–তাতে কি?
–কবি-সম্মেলন হয় কোন্ সময়?
ক্ষেমদাস জিজ্ঞেস করলেন–তুমি বুঝি নতুন এসেচ পৃথিবী থেকে? তোমার কথাতে মনে হচ্চে। এখানে সময়ের কি মাপ? কালোহ্যয়ং নিরবধিঃ–অনন্তকাল বায়ুর মত শন শন বইচে। বিদগ্ধমাধবে। শ্রীরূপগোস্বামী বলেচেন তাই–অনৰ্পিতচরীং চিরাৎ–রূপগোস্বামীও কবি, তিনিও আসেন। আর তুমি জানো না, যাঁর সঙ্গে এসেচ এই আচার্য্য রঘুনাথ দাসও কবি? এঁর রচিত চৈতন্যস্তবকল্পবৃক্ষ কি পড়ে থাকবে? পড়ে বলে মনে হচ্চে না। শোনো তবে–
কচিন্মিশ্রাবাসে ব্রজপতিসুতস্যোরবিরহাৎ
শ্লথাৎ শ্ৰীসন্ধিত্বাদ্দধতি দৈর্ঘ্যং ভূজপদোঃ।
কেমন ছন্দ? কেমন লাগচে ওঁর শ্লোক?
যতীন বিষণ্ণমুখে বল্লে–আজ্ঞে বেশ!
বৃন্দাবনের গোবিন্দ-মন্দিরের আরতি বহুক্ষণ থেমে গিয়েছে। পাশের রাজপথ দিয়ে দু একখানা গাড়ী যাতায়াত করচে, মন্দিরের বড় বড় দরজায় আলো জ্বলচে, কোথা থেকে উগ্র বকুল ফুলের গন্ধ ভেসে আসচে বাতাসে, মন্দিরের সামনে একটা হিন্দুস্থানী টাঙ্গাওয়ালা যাত্রীর সঙ্গে ভাড়া নিয়ে বকাবকি করচে। যতীন ভাবলে, স্বর্গ-মর্তের কি অদ্ভুত সম্বন্ধ! অথচ বেঁচে থাকতে পৃথিবীর লোকে কেউ এ রহস্য জানে না। মৃত্যুভয়ে ভীত হয়, এত বড় জীবনের খবর যদি কেউ রাখতো, প্রেম-ভক্তির এ সম্পর্ক যদি রাখতে জানতো ভগবানের সঙ্গে–তবে কি তুচ্ছ বিষয়-আশয়, টাকা-কড়ি, জমিদারী নিয়ে ব্যস্ত থাকে? এই মাত্র যে লোকটা সামনের রাস্তা দিয়ে মোটর চড়ে গেল। ও হয়তো একজন মাড়োয়ারী মহাজন, সারাজীবন ব্যাঙ্কে টাকা মজুত করে এসেচে–জীবনের অন্য কোনো অর্থ ওর জানা নেই, কেবল তেজীমন্দী, লাভলোকসান এই বুঝেচে। জয়পুর শহরে হয়তো ওর সাততলা অট্টালিকা। কিন্তু হয়তো ছেলে গুলো অবাধ্য বেশ্যাসক্ত, স্ত্রী কুচরিত্রা। মনে সুখ নেই–অথচ ওকি জানে, এই পাশেই মদনমোহনের মন্দিরে এই গভীর রাত্রে ভিন্ন ভিন্ন লোকের কবি সাধুরা আজ সমবেত হয়েচেন, সেখানে পুষ্পের মত নারীর স্নেহ, কত শতাব্দীর পার থেকে ভেসে আসা অমর মহাপুরুষদের বাণী, বকুলপুষ্পের সুবাস, ভগবানে অর্পিত মধুর প্রেমভক্তির পরিবেশ–এইখানেই স্বর্গ-মর্তের বিশাল ব্যবধান রচনা করেচে। হায় অন্ধ পৃথিবীর মানুষ।
১৫. পৃথিবীর হিসেবে দীর্ঘ দু বছর
পৃথিবীর হিসেবে দীর্ঘ দু বছর কেটে গেল।
সেদিন পুষ্প ও যতীন বসে কথা বলচে বুড়োশিবতলার ঘাটে, এমন সময় পুষ্প হঠাৎ চীকার করে বল্লে–এই! থামোথামো–খবরদার–
পরক্ষণেই সে ব্যাকুল, উদ্বিগ্ন মুখে বহুদূর আকাশের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বল্লে–যতীনদা, যতীনদা–
যতীন বিস্মিত সুরে বল্লে–কি হোল? পুষ্প বল্লে–কিছু না। যতীন নাছোড়বান্দা, সে বার বার বলতে লাগলো–কি হোল বল না পুস্প? বলবে না?
অবশেষে পুষ্প বল্লে–আশা বৌদিকে খুন করতে যাচ্চে তার সেই উপপতি নেত্য
–সে কি!
–ঐ যে দেখতে পাচ্ছ না?
যতীন ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে বলে–চলো চলো ছুটে যাই সামলাই গিয়ে– আমি তো কোনো দিকে কিছু দেখচি নে–ওঠো।
