মন্দিরের চারপাশে খুব বড় বাগান। প্রায় সবই ফুলের গাছ, কিন্তু অত সুন্দর ও সুগন্ধি ফুল এ পর্যন্ত যতীনের চোখে পড়ে নি। খুব বড় উদ্যানশিল্পীর রচনার পরিচয় সেখানকার প্রতিটি ফুলগাছের সারিতে, লতাবিতানের সমাবেশে। যতীন ভাবলে–এ স্তরেও বাগান থাকে? এসব করে কে? কে গাছ পোঁতে না জানি। পৃথিবীর মত কোদাল দিয়ে মাটি কোপাতে হয় নাকি?
পুষ্প একটি নিভৃত লতাবিতানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল যতীনকে সঙ্গে করে।
ভেতর থেকে কে বল্লে–এসো মা, তোমার অপেক্ষা করচি
পুষ্প ও যতীন দুজনে লতাকুঞ্জের মধ্যে ঢুকে দেখলে একজন জ্যোতির্ময়দেহ সুশ্রী বৃদ্ধ পাথরের বেদীতে বসে। দুজনে পাদস্পর্শ করে প্রণাম করলে।
ভুর ভুর করচে চন্দন ও ফুলের সুবাস লতাবিতানে, অথচ শৌখীন বিলাসলালসার কথা মনে হয় না সে সুগন্ধে, মনে জাগে অতীতকালের ভক্তদের প্রেমোচ্ছল অনুভূতি, মনে জাগে ভগবানের নৈকট্য, শান্ত পবিত্রতার আনন্দময় মৰ্ম্মকেন্দ্র। দিগন্তে বিলীন প্রেমভক্তির মধুর বেণুরব কান পেতে শোনো এখানে বসে বসে, শুনে নবজন্ম লাভ করো।
বৃদ্ধ বল্লেন–আগে গোপাল দর্শন করে এসো
মন্দিরের কাছে গিয়ে ওরা দেখলে নীল রঙের পাথরের অতি সুশ্রী একটি গোপালমূৰ্ত্তি, যেন হাসচে–এত জীবন্ত। নানা রঙের ফুল দিয়ে বিগ্রহের পাদপীঠ সাজানো, গলায় বনফুলের মালা। পুষ্প করজোড়ে কতক্ষণ ভাবে তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল–যতীন ভক্ত-টক্ত নয়, সে একটু অধীর ভাবেই পুষ্পের ভাব ভাঙবার প্রতীক্ষা করতে লাগলো।
যতীন অবশেষে পুষ্পকে বল্লে–ইনি কে?
–ইনি কে আমি জানিনে। সেকালের একজন বড় বৈষ্ণব আচার্য্য পৃথিবীতে নাকি এখনও এর আবির্ভাবের তিরোভাবের উৎসব হয়। বহুদিন পৃথিবী ছেড়ে এসেচেন।
বৈষ্ণব সাধু জিজ্ঞেস করলেন-বিগ্রহদর্শন করলে?
যতীন বল্লে–দেখেচি, অতি চমৎকার। প্রভু, আপনি কতদিন পৃথিবী থেকে এসেছেন?
–অনেককাল। এখানে ওসব হিসেব রাখবার মন হয় নি, কি হবেই বা পৃথিবীর হিসেব রেখে?
যতীনের মনে অনেক সংশয় উঁকি মারছিল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বল্লে–প্রভু, এখানেও বিগ্রহ?
–কেন বল তো? কি আপত্তি তোমার?
–এ তো স্বর্গ। ভগবানের সাক্ষাৎ এখানে পাওয়া যাবে। কাঠ পাথরের মূর্তি পৃথিবীতে দরকার হতে পারে, এখানে কেন?
বৈষ্ণব ভক্তটি হেসে বল্লেন–ভগবানের সাক্ষাৎ তুমি যেভাবে বলচো। ওভাবে পাওয়া যায় কিনা জানিনে। আমি পৃথিবীতে এই বিগ্রহের পূজারী ছিলাম, বড় ভালবাসি ওকে, ছেড়ে থাকতে পারিনে–তাই এখানে এসে এই মন্দির স্থাপন করে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেচি, ওঁরই সেবা-আরাধনায় দিন কাটে বড় আনন্দে। মন্দির আর বাগান সবই মানসী কল্পনায় সৃষ্টি করেছি, এ স্বর্গে তা করা যায় তা নিশ্চয়ই জানো।
–আজ্ঞে হ্যাঁ, তা এর নিচের স্বর্গেও দেখেচি।
-–আমার দেবতা শুধু পাথরের নয়, জীবন্তও বটে। কিন্তু তোমাকে তো দেখাতে পারবো না। আমার মা দেখতে পারেন। দেখেচেনও। একবার।
পুষ্প আবদারের সুরে বল্লে–আপনি দয়া করলে ইনিও দেখতে পারেন, বাবা।
সাধু হেসে বল্লেন–ইনি দেখতে পারেন না। ইনি ভাবেন, ভগবানকে নিয়ে আমি এভাবে পুতুলখেলা করচি। বালগোপাল বড় লাজুক, এর সামনে বার হবেন না। যে তাঁকে মন অর্পণ করে ভাল না বেসেছে, বিশ্বাস না করেচে–তিনি যেচে অপমান কুড়তে যাবেন সেখানে? ভগবান যখন ইষ্টদেবের বেশে লীলা করেন কৃষ্ণ সেজে, কালী সেজে তখন তিনি মানুষের বা দেবদেবীদের মনোভাব–যেমন রাগ, লজ্জা, মান অভিমান, এমন কি ভয় পৰ্য্যন্ত পান। এই তো লীলা–এরই নাম লীলা। বিরাট ঐশী শক্তি যা বিশ্বচরাচর নিয়ন্ত্রণ করছে, তাকে কে ভালবাসতে পারে আপনার ভেবে? শত শত নক্ষত্র, শত শত সুৰ্য্য যার ইঙ্গিতে লয় হয়, যে পলকে সৃষ্টি, পলকে স্থিতি, পলকে প্রলয় করতে পারে–তাকে কে ভক্তি করতে পারে, যদি তিনি
মন্দির থেকে চঞ্চল, মধুর, সজীব কণ্ঠে কে বলে উঠলো–ওখানে বসে বক্ব না করে এখানে এসে আমায় একবার জল খাইয়ে যাও না বাপু? তেষ্টায় মলুম–
সাধু চমকে উঠলেন, পুষ্প ও যতীন চমকে উঠলো।
পুষ্প হেসে বল্লে–যান, যান, জল খাইয়ে আসুন–
যতীন অবাক হয়ে বল্লে–কে ছেলেটি?
সাধু যতীনের মুখের দিকে চেয়ে বল্লেন–বুঝতে পারলে না? ঐ তো বালগোপাল। তোমার খুব ভাগ্য তোমাকে গলার স্বর শুনিয়ে দিলেন। আমার পুষ্প মায়ের ভাগ্য। যাই আমি
সাধুর মুখে স্নেহ-বাৎসল্যের রেখা ফুটে উঠলো, তৃষ্ণার্ত সন্তানকে পানীয় জল দেবার ব্যাকুলতা নিয়ে তিনি মন্দিরের দিকে অদৃশ্য হোলেন।
যতীন ভাবলে, এও পুতুলখেলা, নয় আবার!
পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলে। সাধু অন্তর্যামী, সবার মনের কথা বুঝতে পারেন, অন্তত তার তো মনের অন্ধিসন্ধি খুঁজে বার করেছেন। এখানে কিছু ভাবা হবে না।
পুষ্প হঠাৎ বলে উঠলো–মনে পড়েচে, ইনি বৈষ্ণব আচাৰ্য্য রঘুনাথ দাস।
বেলা পড়ে যেন অপরাহ্ন হয়ে এসেচে। অপূৰ্ব্ব পুষ্প-সুবাসে আশ্রম আমোদিত। বৈষ্ণব সাধু বল্লেন–বিকেল বড় ভাল লাগে, তাই সৃষ্টি করি। নইলে এখানে আর সকাল বিকেল কি? সূৰ্য নেই, চন্দ্র নেই, অন্ধকারও নেই। হ্যাঁ, কি সংশয় তোমার, যতীন? এখনও যায়নি, অন্ধকার বড় একগুয়ে। তাড়ানো যায় না।
–প্রভু কি করি বলুন। আপনি বৈষ্ণব আচার্য্য, কতদিনের লোক আপনি!
