–যতীনদা,তাতে ফল হবে না। আশা বৌদির কৰ্ম্ম ওকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কেউ কিছু করতে পারবে না। নইলে চেষ্টা তুমি আমি কম করিনি। ওর মন ওকে টানচে নিচের দিকে–অধঃপতনের পথে। বাধা দেবার সাধ্য কার! এক যদি ভগবান সাহায্য করেন, কৃপা করেন–
কথাটা যতীনের মনঃপুত হোল না। সে বল্লেভগবান সাহায্য করলে এই অবস্থায় এসে ও দাঁড়ায় আজ? তিনি চোখ বুজে আছেন।
পুষ্প বল্লে–ভুলে যাচ্চ যতীন-দা, ভগবান তাকেই সাহায্য করেন, যে অকপটে সৎ হবার চেষ্টা করচে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। যেচে তিনি সাহায্য করতে গেলে তাতে কোনো ফল হবে না বলেই তাঁর কাছ থেকে সাহায্য আসে না।
-কেন?
–যে ভগবানকে চেনে না, তাঁকে স্বীকার করে না, তার হোল। আচ্ছাদিত চেতন। তার চেয়ে যে ভালো, তাকে বলে সঙ্কুচিত চেতন। এই দুই ধরনের লোককে ভগবকথা শোনালে উল্টো উৎপত্তি হয়। আশা বৌদির আচ্ছাদিত চেতন। আলো জ্বাললে কি হবে? ঢাকনির। মধ্যে আলো সেঁধোবে না। এদের ওপরে মুকুলিত চেতন, তাদের মনে। ভগবানের জ্ঞান জাগতে সুরু করেছে। তারও ওপরে বিকচিত চেতন, সবার ওপরে পূর্ণ বিকচিত চেতন–যেমন বড় বড় ভক্ত কি সাধকেরা। কত নিচে পড়ে আছে আশা বৌদি আর নেত্যর দল ভাবো!
যতীন কৌতুকের সুরে বল্লেও বাবা, তোমার পেটে এত! নবদ্বীপের ভট্টাচায্যিদের মত শান্তর কথা সুরু করলে যে। তোমার কী চেতন। পুষ্প, বিকচিত না পূর্ণ বিকচিত? আর আমিও বোধ হয় আচ্ছাদিত। চেতন–না, কি বলো?
পুষ্প খিল খিল্ করে হেসে বল্লে–আলবৎ। নইলে তুমি কি ভাবো তুমি খুব উন্নতি করেচো?
–না, তাই জেনে নিচ্চি তোমার কাছে।
–জেনে নিতে হবে কেন, নিজে বুঝতে পারছো না, না? কখনো ভগবানকে ডেকেচ? তাঁর দিকে মন দিয়েচ জীবনে? তাঁকে বোঝবার চেষ্টা তো দূরের কথা। আমার কথা বাদ দাও যতীনদা, আমি তুচ্ছাদপি তুচ্ছ, কিন্তু বড় বড় বিদ্বান, জ্ঞানী, গুণী লোকের মধ্যেও অনেকে মুকুলিত চেতনও নয়। পূর্ণবিকচিত তো ছেড়ে দাও, বিকচিত চেতনই বা ক’জন? পৃথিবীতে বা এই লোকে কোথাও জিনিসটা পথেঘাটে মেলে না। তবে নেই তা নয়, আছে।
–একজন তেমন লোকের কাছে একদিন নিয়ে যাবে?
–আমার কি সাধ্যি যতীনদা? তাঁদের দেখা পাওয়া কঠিন, ধরা দিতে চান না সহজে।
আচ্ছা, একজন মানুষকে আমি জানি–যাবে সেখানে? চলো, একটুখানি, দেখিয়ে দিই, সেখানে গিয়ে দেখে চলে আসবে, কোনো কথাবার্তা বোলো না। আশা বৌদিকে ছেড়ে একটু চলো দিকি। পৃথিবীর এ সব আবহাওয়া তোমার পক্ষে যে কত খারাপ তা তুমি বুঝতে পারবে না।
যতীন হেসে বল্লে–কেন, ম্যালেরিয়া ধরবে?
–আত্মারও ম্যালেরিয়া আছে। দেহ থেকে মুক্ত হয়েচ বলে গুমর কোরো না। এমন ম্যালেরিয়া ধরে যাবে মনের আত্মার যে কেঁদে কূল পাবে না যতীনদা। তখন ডাক্তার দেখাতে হোলে এই ছাই ফেলতে ভাঙা-কুলো পুষ্প হতভাগীকেই দরকার হবে।
পৃথিবী দেখতে দেখতে নীচে মিলিয়ে গিয়েচে ততক্ষণ। সাদা সাদা মেঘ, অনন্ত আকাশ। সূর্যের আলোর রং আরও সাদা। মানুষের। স্থূল চোখ হোলে ধাঁধিয়ে যেতো। যতীন ভাবলে, এই তো রাত দেখে এলাম কলকাতা সহরে, এখানে-চোখ-ধাঁধানো সূর্যের আলো! জগতে সব ভেলকিবাজি, অথচ পৃথিবীতে বসে কিছু বোঝবার জো নেই।
ভুবর্লোকের বিশাল আলোর সরণী দিক থেকে দিগন্তরে বিসর্পিত তাদের সামনে! বহু লোক যাতায়াত করছে, কেউ ধূসর বর্ণের, কেউ লাল মেটে সিঁদুরের রং, ক্বচিৎ কেউ নীল রঙের। পুষ্পকে যতীন বল্লে–দ্যাখো বেশির ভাগ আত্মাই কিছু ছাই রঙের আর লাল রঙের। নীলবর্ণের আত্ম পথেঘাটে কত কম।
পুষ্প হেসে বল্লে–তুমিও ওদের দলে। ভেবো না তুমি নীলবর্ণের দেহধারী আত্মা। অনেক উঁচু জীব তাঁরা। পথে-ঘাটে তাঁদের কি ভাবে দেখবে? ও যা দেখচো, ওরাও তেমন উঁচু স্তরের নয়। পঞ্চম স্বর্গের লোকের দেহ উজ্জ্বল নীল, দামী নীল রঙের হীরের মত। সে বড় একটা দেখতে পাবে না।
–তারও ওপরে?
–উজ্জ্বল সাদা। ষষ্ঠ সপ্তম স্বর্গের আত্মারা দেবদেবী, তাঁদের দিকে চাইলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
–তোমার মত?
হঠাৎ যতীন লক্ষ্য করলে সে এমন এক স্থানে এসে পড়েছে যেখানকার বায়ুমণ্ডলে একটি অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ও পবিত্র আত্মার চিরযৌবন নির্দেশ করচে যেন। কিসের সুগন্ধ সৰ্ব্বত্র সেই গন্ধে ভরা বনপথের আবছায়া অন্ধকারে শত শত চিরযৌবনা অভিসারিকা যেন চলেছে তাদের পরমপ্রিয়ের মিলন আকাঙ্ক্ষায়, কত যুগের কত রাজ্য-সাম্রাজ্যের অতীত কাহিনীর দুঃখবেদনা যেন এর পরিবেশকে কোমল করুণ করে রেখেচে মুখে ঠিক বোঝানো যায় না, কিন্তু যতীন যেন হঠাৎ বুঝলে মনে সে অনন্তকালের শাশ্বত অধিবাসী, চিরযৌবন, অমর আত্মা–অনাদ্যন্ত বিশ্বের লীলাসহচর, সে ছোট নয়, পাপী নয়, পরমুখাপেক্ষী নয়–ভগবানের চিহ্নিত শিশু, অন্য হতভাগ্য আত্মাকে টেনে তোলবার জন্যে তার জন্মমৃত্যুর আবর্ত-পথে সুখ দুঃখময় পরিভ্রমণ।
অদূরে একটি সাদা পাথরের মন্দির, মন্দিরের চূড়োটা তার গম্বুজের তুলনায় একটু যেন বেশি লম্বা বলে মনে হোল যতীনের। কিন্তু আশ্চর্য রকমের দুগ্ধ-ধবল কী পাথরের তৈরী, না মার্বেল, না এলাবেস্টাস, যেন স্বয়ংপ্রভ পালিশ করা স্ফটিক প্রস্তরে ওর বিমান ও জঘা গাঁথা।
পুষ্প বল্লে–খুব বড় একজন ভক্ত সাধকের আশ্রমে তোমায় এনেচি।
