সেই পুরোনো হাসি, পুরোনো আমলের স্নেহদৃষ্টি স্বামীর চোখে। আশা উদভ্রান্তের মত জানালার বাইরে চেয়ে রইল। কোথায় আজ সেই স্বামী, কোথায় তার সেই শ্বশুরবাড়ী! নিজের প্রতি করুণায় তার মন ভরে গেল, চোখে জল এল।
১৪. সেদিন পুষ্প বল্লে
সেদিন পুষ্প বল্লে–যতীন-দা, মন খারাপ করে বসে আছ নাকি? চলো করুণাদেবীর কাছে যাবে।
–আমি সেখানে যেতে পারবো না। অত উঁচুতে উঠলে আমার। চৈতন্য থাকে না জানো–সব সময় তাঁকে দেখতেও পাইনে। কি করবো বলো। তা ছাড়া, আমার অন্য অনেক রকম ভাবনা–
–ভাবনা তো জানি। ও ভেবে কোনো লাভ আছে? যার যেমন। অদৃষ্টে আছে, তেমনি হবে। চেষ্টা তো করলে অনেক। ওর কৰ্ম্মফল। ওকে ওই পথে নিয়ে যাচ্ছে, তুমি আমি কি করবো বলো।
আরও কয়েক মাস কেটে গিয়েছে। আশালতার মনের অবস্থা দিনকয়েকের জন্য একটু ভাল হয়েছিল বটে, কিন্তু স্থায়ী কোনো ফল তাতে হয়নি। নেত্য তাকে গ্রামের প্রান্তে আলাদা বাড়ী করেও দেয়নি। ভুলিয়ে তার কতকগুলো সোনার গহনা হাত করে সেই টাকায় ওকে কলকাতায় এনে রেখেচে। যতীন রোজ সেখানে যায় রাত্রে, একটা লম্বা ব্যারাকমত পুরনো বাড়ীর একটা ঘরের সংকীর্ণ রোয়াকে আশা বসে রাঁধে, এখানে সে পাশের ভাড়াটেদের সামনে সামাজিকতা বজায় রাখবার জন্যে বিধবার বেশ ঘুচিয়ে নেত্যর স্ত্রী সেজেচে, হাতে চুড়ি ।পরে, কপালে সিঁদুর দেয়। প্রথমে যেদিন নেত্যই তার কাছে এ প্রস্তাব করে যতীন সেখানে উপস্থিত ছিল।
নেত্য বল্লে–রাস্তা থেকেই তোমাকে এটি করতে হবে আশা। যেখানে যাবে, সেখানে আশপাশের ঘরে অনেক ফ্যামিলি বাস করে। তাদের সামনে কি বলে দাঁড়াবে, কি পরিচয় দেবে? বাড়ীওয়ালাই বা জায়গা দেবে কেন?
আশা বল্লে–সে আমি পারবো না। ব্রাহ্মণের ঘরের বিধবা হয়ে আবার পেড়ে কাপড় পরবো, সিঁদুর পরবো–এ হবে না আমায় দিয়ে নেত্য-দা–
নেত্য শ্লেষের সুরে বল্লেনাও নাও আর ন্যাকামি করতে হবে না! ব্রাহ্মণের বিধবার তো সব রাখলে, এখন যার সঙ্গে বেরিয়ে এলে তার কথামত চলো।
আশা বিস্ময়ের সুরে বল্লে–বেরিয়ে এলাম!
–আহা-হা নেকু! বেরিয়ে আসার কি হাতীঘোড়া আছে না কি? আবার তুমি ঘরে ফিরে যাও তো মানিক। এতক্ষণ গাঁয়ে ঢিঢি পড়ে গিয়েচে দ্যাখো গে যাও
–বা-রে, তুমি বল্লে আমাকে কলকাতায় আলাদা বাসা করে দেবে। আমি আমার গহনা বিক্রি করে চালাবো–তারপর মাকে সেখানে নিয়ে এসে রাখা হবে। বলো নি?
-হ্যাঁ গো হ্যাঁ। এখনও তাই বলচি, বলচি নে? আমার হাত ধরে যে মাত্তর বাড়ীর বাইরে পা দিয়েচ, সেই মাত্তরেই তুমি বেরিয়ে এসেচ। ওকেই বলে বেরিয়ে আসা। এখন আর ফেরবার পথ নেই–যা বলি, সেই রকমই করো। তোমার ভালোর জন্যেই তো বলচি। দেখো কত সুবিধে হবে, কলকাতায় বড় বড় লোকের সঙ্গে আলাপ হবে। আখেরে ভালো হয় কিনা দেখে নিও।
যতীন সেদিন ফিরে এসে পুষ্পকে সব বলেছিল। পুষ্প বলে– আশাদি বড় নির্বোধ, নেত্য লোকটা ওকে ভুলিয়ে এই কাণ্ডটা ঘটাচ্চে। কিন্তু কিছু করবার নেই।
–কেন পুষ্প? এক অবলা মেয়েকে সর্বনাশের পথ থেকে বাঁচাতে পারো না তোমরা?
-কই পারি। যে যার কৰ্ম্মফলের পথে চলে, কে কাকে সামলায়?
এরপর প্রায় তিন মাস কেটেছে। আশা ও নেত্য বাসাবাড়ীতে বেশ পাকাঁপোক্ত হয়ে বসে স্বামী-স্ত্রীর মত সংসার করচে। নেত্য বাজার করে নিয়ে আসে, আশার সামনে বসে গল্প করে, দুবার সিনেমা দেখাতে নিয়ে গিয়েছে, একবার পাশের ঘরের ভাড়াটেদের সঙ্গে আশা কালীঘাটেও ঘুরে এসেচে।
পুষ্প কত চেষ্টা করেচে যতীনকে ওখান থেকে আনবার। কিন্তু যতীন শোনে না, পুষ্পকে লুকিয়ে সে আজকাল প্রায়ই আশার বাসায় যায়। একদিন রাত্রে একটা স্বপ্নও দেখিয়েছিল, কিন্তু পুষ্পের সাহায্য না পাওয়ায় সে স্বপ্ন হয় বড় অপষ্ট, তাতে ঘুম ভেঙে উঠে আশা সারা সকালটা মন ভার করে থেকে নেত্যর কাছে বকুনি খায়।
পুষ্প বল্লে–চলো আজ করুণাদেবীর কাছে গিয়ে বলি–
–এইখানেই তাঁকে আনো। আমি কোথাও যাবো না।
–পৃথিবীর মধ্যে ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াবে এই রকম?
–কি করি বলো। আমরা তো খুব উঁচুদরের মানুষ নই তোমাদের মত, এই আমাদের পরিণাম। কৰ্ম্মফল!
যতীনের ঠেস দেওয়া কথায় পুষ্প মনে আঘাত পেলেও মুখে কিছু বল্লে না। সে বেশ বুঝেছে যতীনদাকে এ পথ থেকে নিবৃত্ত না করলে ওর উন্নতি হবে না। যতদিন আশা বাঁচবে, তার পেছনে অস্থানে কুস্থানে ও ঘুরে ঘুরে বেড়াবে–তাতে কোনো পক্ষেরই কোনো সুবিধে হবে না।
ইতিমধ্যে একদিন একটা ব্যাপার ঘটে গেল আশাদের বাসায়। আশার গ্রামের শম্ভ চক্কত্তি বলে সেই ছেলেটি অনেক খোঁজাখুঁজির পরে আশার সন্ধান পেয়ে সেখানে এল। আশা তখন রান্না করচে। শম্বুকে ঢুকতে দেখে ওর মুখ শুকিয়ে গেল। শম্ভ এসে বল্লে–কি আশাদি, চিনতে পারো?
আশা শুকনো মুখে ভয়ের সুরে বল্লে–এসো বোসো শম্ভুদা–কি করে চিনলে ঠিকানা?
–নেত্য স্কাউলেটা কোথায়? আমি একবার তাকে দেখে নিতাম। তারপর, কি মনে করে এখানে এসে আছ?
-কারু দোষ নেই শম্ভুদা, আমি নিজের ইচ্ছেতেই এসেচি।
–গাঁয়ে কি রকম হৈ চৈ পড়ে গিয়েচে তুমি জানো না। কেন তুমি এরকম করে এলে? কতদূর খারাপ করেচ তা তুমি বুঝেচ?
–গাঁয়ে থেকেই বা কি করতাম শম্ভুদা। এ বেশ আছি। আমাদের মত মানুষের আবার গা আর অগাঁ কি? কি ছিল জীবনে? মা মরলে কোথায় দাঁড়াতাম? এখানে খারাপ নেই কিছু। ফিরে যখন যেতে পারবো না, তখন সেকথা ভেবে আর কি হবে।
