সেই আশা কেন এমন হয়ে গেল?
পুষ্প এসে বল্লে–এসো যতীন-দা। আশাবৌদি ঘুমিয়ে পড়েছে।
আশা খানিকক্ষণ আগে ঘুমিয়েছে। ময়লা বালিশটা মাথায় দিয়ে ছেঁড়া মাদুরে শরীর এলিয়ে দিয়েছে। যতীনের মন করুণায় ভরে উঠলো। মেয়েমানুষ অসহায়, ওদের কি দোষ। সংসারে বহুলোক ওৎ পেতে আছে ওদের বিভ্রান্ত করে ভুল পথে নিয়ে যাবার জন্যে। একটু আশ্রয়ের আশায় ওরা না বুঝে না ভেবে দেখে সে পথে ছোটে। যতীন। কাছে গিয়ে ডাকলে–আশা?
পুষ্প বল্লে–দাঁড়াও, শুধু ডাকলে হবে না, লেচারের কাজ নয়। ওর মনে তোমাদের কোনো একটা সুখের রাত্রির ছবি আঁকো। যেমন ধরো তোমাদের ফুলশয্যার রাত্রি, তোমাদের গাঁয়ের ভিটেতে।
–সে কি করে করব?
–সেদিনের কথা একমনে চিন্তা করো–
একটু পরে আশার সূক্ষ্ম শরীর ওর দেহ থেকে বের হয়ে মূঢ়, অভিভূতের মত চারিদিকে চাইলে। কিন্তু পুষ্প দেখেই বুঝলে সে দেহ ইদ্রিয়গ্রাহ্য স্থূল জগতের ঊর্ধের অতি নিম্নস্তরেও নিজের চৈতন্য পূর্ণ প্রকাশ করতে অসমর্থ।
পুষ্প বল্লে–ওকে ছবি দেখাও যতীন-দা–
–ছবি দেখবে কে? ওর তো এ লোকে জ্ঞান নেই দেখচি–
–ছবি দেখাও, তা হোলে একটু চাঙ্গা হয়ে উঠবে–
-ফুলশয্যার রাত্তিরের?
–বা যে কোনো একটা সুখের দিনের। পারবে তো? আমার দ্বারা তো হবে না। তোমার নিজের ছবি তোমাকে দেখাতে হবে।
যতীন একমনে ভেবে সত্যিই একটা ছবি তৈরি করতে সমর্থ হোল। এ স্তরে চিন্তার শক্তি ক্ষণস্থায়ী আকার নির্মাণ করতে সমর্থ একটা পুরোনো কোঠার ঘর আশাকে এবং ওদের সকলকেই যেন চারিদিক থেকে ঘিরে ফেললে। কাঁঠাল-কাঠের পুরোনো তক্তপোশে লেপ তোশক পাতা বিছানা যতীনের পৈতৃক, জানালার বাইরে মনসাতলার আমগাছটা, ঘরে জলচৌকির ওপর ঝকঝকে পুরোনো পেতল কাঁসা, যতীনের মায়ের হাতে মাজা। যতীনের শোবার সেই ঘরটি এমন বাস্তব হয়ে উঠলো যে আশার ঘরবাড়ী মিলিয়ে গেল। যতীনও যেন অবাক হয়ে গেল তার চিন্তাশক্তির কাৰ্য্য দেখে। আশা তার শ্বশুরবাড়ীর ঘরটাতে শুয়ে আছে–প্রায় নিখুঁত শ্বশুরবাড়ীর ঘর, দেওয়ালে টাঙানো কাঠের আর্শিটা পর্যন্ত। আশার সূক্ষ্ম দেহ তখনও অর্ধ-অচেতন। যতীন স্নেহপূর্ণ স্বরে ডাকলে–আশা, ও আশা–
আশা যেন ঘুম ভেঙে উঠে চারিদিকে চাইলে এবং কি দেখে একটু অবাক হয়ে গেল। যতীন আবার ডাকলে–আশা, ও আশা–
আশা যতীনের মুখের দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল, যেন কিছু বুঝতে পারলে না।
–আশা, ভাল আছ?
পুষ্প বল্লে–অমন ধরনের কথা বোলে না। ছবির সঙ্গে খাপ খাইয়ে পুরোনো দিনের মত কথা বলো।
যতীন বল্লে–আশা, কাল সকালেই উঠে কাঁপাসডাঙায় যাবো কাজে। ভোরে একটু চা করে দিতে পারবে?
আশা উত্তর দিলে–খুব ভোরে যাবে?
–সাতটার মধ্যে।
আশার চোখের মূঢ় দৃষ্টি তখনও কাটেনি। সে বল্লে–আমি কোথায়।
যতীন বল্লে–কেন, তোমার শ্বশুরবাড়ীতে–চিনতে পারছো না? কি হয়েছে তোমার? চা দেবে করে?
–হ্যাঁ।
–খাবার দেবে না?
–কি খাবে? চিঁড়ে দিয়ে ঘোল দিয়ে খেও এখন।
একদিন আশা সত্যিই এই কথা বলেছিল। যতীনের চোখে জল এল আবেগে। সে আবার তার পুরোনো পৈতৃক বাড়ীর বিস্মৃত দিনে ফিরে গিয়েচে নববিবাহিতা আশার পাশে। যতীনের অনুভূতির তীব্রতার সঙ্গে সঙ্গে তার তৈরি ছবি আরও স্পষ্ট নিখুঁত হয়ে উঠলো। আশা এবার আরও সজাগ হয়ে উঠে চারিদিকে চাইলে, কিন্তু তার বিস্ময়ের দৃষ্টি এখনও কাটেনি।
যতীন বল্লে–তাহলে তাই। আমায় তুমি ভালোবাসো আশা?
কথা বলেই নেত্য চক্কত্তির মত সে আশার হাতখানা নিয়ে নিজের হাতের মধ্যে রাখলে। তারপর পেছনে চেয়ে দেখলে পুষ্প সেখানে নেই। মেয়েমানুষ, যত উচ্চস্তরের হোক না কেন, প্রেমাস্পদ অন্যকে ভালবাসচে, এতে মন স্থির রাখতে পারে না।
আশা বল্লে–হ্যাঁগা, তুমি কখন এলে?
–কোথা থেকে আসবো?
–যেন তুমি অনেকদিন বাড়ি ছিলে না!
–নিশ্চয়ই ছিলাম। কোথায় আমি যাবো? খেপলে নাকি আশা?
আশা প্রবোধপ্রাপ্ত ছোট মেয়ের সুরে বল্লে–যাওনি তাহলে?
–না আশা–কোথায় যাবো?
–আমার জন্যে একজোড়া শাড়ী এনে দিও কাল। আটপৌরে শাড়ী নেই। –ক’হাত?
–এগারো হাত দিও, দশহাতে ঘোমটা দিতে পারিনে মার সামনে, লজ্জা করে।
–বেশ।
তারপর আশা ভেবে ভেবে বল্লে–আচ্ছা, আমার কি একটা হয়েছিল। বলো তো, কিছুতেই যেন মনে নিয়ে আসতে পারচি নে।
–কি আবার হবে, কিছুই না।
–ও! তবে বোধহয় স্বপ্ন দেখেছিলাম। না?
–তাই হবে। লক্ষ্মীটি, ও সব ভাবতে নেই। তুমি আমায় ভালবাসো?
আশা সলজ্জ সুরে বল্লে–হুঁ-উ–
যতীন ভাবলে, কোন্ জগৎ সত্য? এই ছবিতে গড়া স্বপ্নের জগৎ,
বাস্তব জগৎ? না কি সবই স্বপ্ন? সেদিন সেই অবধূত যা বলে গিয়েছিল। জগৎটাই জাগ্রত স্বপ্ন ছাড়া আর কি? কোথাকার আশা, কি সে দেখচে, কে তাকে কি ভাবাচ্চে। অথচ আশা ভাবচে এই বুঝি সত্য। ভগবান কি জীবকে ছবি দেখাচ্ছেন না তাঁর সৃষ্ট জগতের মধ্যে দিয়ে, যেমন সে এখন দেখাচ্চে আশাকে?
সে সস্নেহ সুরে বল্লে–তা হলে তুমি ঘুমিয়ে পড় আশা, রাত হয়েছে–
–আজ বড্ড গরম না? ঘুম হচ্চে না। একটা মশারি এনে দিও বড়ড় মশা
–তা হবে। সকালে সকালে উঠে চা করে দিও তাহলে?
–আচ্ছা।
পুষ্প বাইরে থেকে বল্লে–চলো, যতীন-দা। একদিনে ওর বেশি। আর কিছু তুমি করতে পার না।
ওরা চলে যাওয়ার একটু পরে আশার ঘুমও ভেঙে গেল। সে ধড়মড় করে বিছানা থেকে উঠে চারিদিকে দেখলে। এ কোথায় সে আছে? এমন স্পষ্ট স্বপ্ন সে আর কখনো দেখেনি। কতদিন পরে সে। তার স্বামীকে এত স্পষ্ট ভাবে দেখেচে, এইমাত্র যেন তিনি পাশে বসে ছিলেন। কতক্ষণ স্বপ্নের কথা সে ভাবলে। সব কথা তার মনে নেই, এইটুকু মনে আছে, তিনি যেন বলছেন–একটু চা করে দিতে পারো? চা খাবো
