কোথায় যেন রাশি রাশি বনপুষ্প ফুটেছে, নিৰ্ব্বাত ব্যোম তাদের সম্মিলিত সুবাসে ভরপুর…
এসবও ছাড়িয়ে চললো সে..মহাবিদ্যুতের মত তার গতি, কোথাও অনন্ত ব্যোমে, মহাশূন্যের সুদূরতম প্রান্তে, অনন্তের জ্যোতি-বাতায়ন। যেখানে চারিদিকে উন্মুক্ত…দেবদেবীর বাসস্থান এ সব মহাদেশও যেন আপেক্ষিক চৈতন্যের রাজ্য; বাসনার রাজ্য…এদেরও দূর, বহুদূর পারে, সব আকাশ ও সময়ের পারে, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যেখানে এক হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে–সোম সূর্য নেই, তারকা নেই, অন্ধকার নেই, আলোও নেই–সেই এক বহুদূর দেশে সে গিয়ে পৌঁছেচে…এদেশ আকারধারী জীব বা দেবদেবীর রাজ্য নয়, সৰ্ব্ববিধ আকার এখানে জ্যোতিতে লোপ পেয়েচে, অথচ এ জ্যোতিও দৃশ্যমান আলোকের জ্যোতি নয়, আগুন নয়, বিদ্যুৎ নয়–কি তা সে জানে না…তার সবদিকে, তাকে চারিধার থেকে ঘিরে এই জ্যোতি…আর কি একটা বিচিত্র, অনির্বচনীয় অনুভূতি…ওর মন লোপ পেয়েছে অনেকক্ষণ, চৈতন্যও যেন লোপ পেতে বসেছে…অথচ যতীনের মনে হোল এই তার আপন স্থান, এতদিনে আপন স্থানে সে ফিরে এসেচে..এই তার বহুপরিচিত স্বদেশ..যুগ-যুগান্ত, কত মহাযুগ ধরে সে এখানে আবার ফেরবার অপেক্ষায় ছিল। মহাব্যোমে আর কেউ নেই, আশালতা না, পুষ্প না, তার যতীনও না, সন্ন্যাসী, তাদের এ লোকে বাঁধা কত সাধের ঘর বা বুড়োশিবতলার ঘাট না, দেব না, দেবী না, পরলোক না, এমন কি ঈশ্বরও না…
মহাব্যোমের মহাশূন্যে অনাদি, অনন্ত স্বয়ম্ভু, স্বপ্রকাশ, নিৰ্ব্বিকার, নির্বিকল্প সে শুধু আছে–পাপহীন, পুণ্যহীন, মণ্ডলহীন, অমঙ্গলহীন, সুখহীন, দুঃখহীন সর্বপ্রকার উপাধিহীন…
সে-ই আছে মাত্র একা।
নিঃসঙ্গ মহাব্যোমে আর কোথাও কিছু নেই, কেউ নেই!
সে-ই সব।
এমন কি, এ মহাব্যোমও তার সৃষ্টি-সৃষ্টি নয়–সে নিজেই।
যতীন আর কিছু জানে না।
যখন ওর চৈতন্য হোল তখন সে দেখলে সেই মহাসন্ন্যাসী পাশেই বুড়োশিবতলায় ঘাটের রাণাতে বসে আছেন–সে তাঁর এপাশে বসে। যেন সে ঘুম ভেঙে উঠেচে এইমাত্র।
সন্ন্যাসী হেসে বল্লেন–কি হোল? দেখলে?
যতীন মূঢ় ও অভিভূতের মত তাঁর মুখের দিকে চেয়ে বল্লে–কি দেখলাম বলুন দিকি?
–আমি চলোম। যা দেখলে, দেখলে। মুখে কি বোঝাবো? মন। নিম্নস্তরের ইন্দ্রিয় মাত্র, ওর চেয়ে বড় অনুভূতির দরজা যেদিন খুলবে, সেদিন আমায় বোঝাতে হবে না, নিজেই বুঝবে। তোমার সে অবস্থার। এখনও বহু বিলম্ব। দু-চার জন্মে হবে না। অনেকবার এখনও পৃথিবীতে যাতায়াত করতে হবে।
তিনি যাবার উদ্যোগ করচেন দেখে যতীন ব্যাকুলভাবে বল্লে–প্রভু, যাবেন না, যাবেন না। পুষ্প বলে একটি মেয়ে আছে, তাকে একবার দেখা দিয়ে যাবেন দয়া করে?
সন্ন্যাসী হেসে বল্লেন–সময় হোলে দুজনেই দেখা পাবে আবার। তবে স্ত্রীলোকের পথ ভক্তির, জ্ঞানের নয়। আমি তোমাদের দুজনকেই জানি, গত তিন জন্ম তোমরা আমার দেখা পেয়ে, তোমাদের ভালবাসি।
কিন্তু তাতে কি হবে? সময় হয়নি। চক্রপথে ঘুরতে হবে অনেকদিন।
আমি আছি তোমাদের পেছনে। নতুবা আমার দেখা পেতে না।
সন্ন্যাসী অন্তর্হিত হলেন।
১৩. একটু পরে পুষ্প এল
একটু পরে পুষ্প এল। বল্লে–কি করছিলে?
যতীন তার দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে বল্লে–পুষ্প, তুমি মায়া? মিথ্যে?
–সে কি যতীন-দা? ব্যাপার কি?
–এ সব ভেল্কি? তুমি ভুল বুঝিয়েচ পরলোক-টরলোক। আমরা মরে ভূত হয়ে আছি। চক্রপথে এখনো আমাদের অনেক ঘুরতে হবে।
পুষ্প খিল খিল করে হেসে বল্লে–এ তত্ত্ব তুমি জানলে কোথায়? নতুন কথা তোমার মুখে!
–হাসি নয়। আমার মনে শান্তি নেই। এক মহাপুরুষ এসে অদ্ভুত দর্শন করিয়ে গেলেন আমার গা ছুঁয়ে। এখন বুঝেচি সব মিথ্যে।
–কিছুই বোঝোনি। বুঝতে অনেক দেরি! ভগবানের দয়া যেদিন হবে সেদিন বুঝবে। এ আমি অনেকদিন জানি। কিন্তু তাতে কি? এতেই আনন্দ। যুগে যুগে আসবো যাবো, এর শোক-দুঃখেও আনন্দ। খুঁজে নেবো। লীলাসঙ্গী হয়ে থাকবো তাঁর। তিনিই খেলা করছেন,
খেলুড়ে না পেলে খেলা করবেন কাকে নিয়ে? সবাই ব্ৰহ্ম হয়ে বসে থাকলে সব শূন্য, নিরাকার। তুমি নেই, আমি নেই, জগৎ নেই–ইহলোক নেই, পরলোক নেই। সত্যি কথা। কিছুই নেই–আবার সবই আছে। খেলা করো না দুদিন, যতদিন তিনি খেলাবেন।
-তারপর?
-তারপর সকলের যা গতি, তোমারও তাই। তাঁতে ভক্তি রাখো, সব হবে। তুমি তো তুমি, আমি তো আমি–লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অতি উচ্চ স্তরের আত্মা, যাঁরা দেব-দেবী হয়ে গেছেন–তাঁরাও তাই।…সব অনিত্য।
–তুমি এসব কি করে জানলে?
–করুণাদেবী সেদিন বলেচেন। ও নিয়ে মন খারাপ কোরো না। ও শেষ অবস্থার কথা। যখন সে অবস্থা আসবে, তখন আর বসে ভাবতে হবে না। তিনিই পথ দেখিয়ে দেবেন। এখন চলো, আশাবৌদির বড় বিপদ, কিছু করতে পারি কিনা দেখা যাক–
যতীন ব্যস্ত হয়ে বল্লে–কি-কি-বিপদ? আশার? কি হয়েছে?
পুষ্প কৌতুকের হাসিতে ভেঙে পড়লো যেন। বল্লে–ঐ! এত বাসনা এত মায়া যার মধ্যে এখনও, তিনি জগৎকে উড়িয়ে দিয়ে ভগবানে মিশে যেতে চান! সন্নিসি ভেল্কি দেখালে কি হবে, ও অবস্থা তোমার আমার জন্যে নয়। পৃথিবী ছেড়ে এসে এখনও তার বাঁধন কাটাতে পারেন না, উনি বড় বড় বুলি ঝাড়েন।
–সন্ন্যাসী তাই বলছিলেন, সময় হয়নি।
–সময় শুধু হয়নি যে তা নয়–হোতে ঢের দেরি। ও নিয়ে মাথা ঘামাবে না বলে দিচ্চি। তাঁর লীলাসঙ্গী হয়ে থাকো, মনে মনে সৰ্ব্বদা তাঁকে ভক্তি করে ডাকো। তিনিই আলো জ্বালবার কর্তা। করুণাদেবী কি কম উঁচু স্তরের জীব? কিন্তু উনি বলেন, আমি মনেপ্রাণে মেয়েমানুষ সুখদুঃখ স্নেহভালবাসা নিয়ে থাকতে ভালবাসি। তাঁর সঙ্গে মিশে যেতে চাই নে, লীলাসহচরী হয়ে থাকি তাঁর সৃষ্টিতে। তাঁকে ভালবাসি মনেপ্রাণে, তাঁর জীবদের সেবা করি যুগে যুগে। এই আমার তপস্যা। মুক্তি চাইনে।
