সন্ন্যাসী হেসে বল্লেন–খুব সোজা নয়, শক্তও নয়। আমি পৃথিবীতে তোমারই মত মানুষ ছিলাম। যৌবনে স্ত্রী-বিয়োগ হোল, সংসার মিথ্যা মনে হোল। তবুও পাঁচ বছর সংসারেই রয়ে গেলাম। তারপর সন্ন্যাস। গ্রহণ করলাম। সদ্গুরুর সন্ধান পেলাম। আসামের এক জঙ্গলে পনের বছর যোগ অভ্যাস করবার পর একদিন গুরুর কৃপায় নির্বিকল্প সমাধি হোল।
যতীন রুদ্ধনিশ্বাসে বল্লে–তারপর।
সন্ন্যাসী হেসে বল্লেন-তারপর? তারপর আর কিছুই না। মুখে সে অবস্থার কথা বলা যায় কি? সে তুমি কি বুঝবে? এখনও তুমি ছেলেমানুষ মাত্র। বড় উচ্চ অবস্থার কথা সে সব। তুমি আর নিষ্ঠুণ ব্রহ্ম এক। মায়া তোমার স্বরূপ আবরণ করে বসেচে। তুমি কেন, পৃথিবীর সব কিছু। ছোট কেউ নও। তোমরা সবাই অজর অমর, শাশ্বত আত্মা–তুমিই এ জগতের কর্তা, এ জগৎকে সৃষ্টি করেচ–তবে ছোট হয়ে আছ কেন? এই লোকে এসেচ–এও উপাধির লোক। এর। আরও ওপরে উচ্চতর লোক আছে–মহা জ্যোতির্ময় লোক, দেবদেবীরা সেখানে বাস করেন। তোমার মত লোক তার ধারণা করতে পারবে না। জগৎকে সৃষ্টি ও লয় করতে তাঁরা সমর্থ। কিন্তু সেও অনিত্য। সেখানে পৌঁছনো মানুষের জগৎ। তারও ওপরে নিরুপাধি নির্গুণ। ব্ৰহ্ম বিরাজ করেন। সেখানে পৌঁছুনো মানুষের আগ্রহ থাকলেই হয়। আসলে তোমার সঙ্গে তার অভিন্নতা কোথায়? এ জগতে দুঃখ নেই, পাপ নেই, শোক নেই, ভয় নেই, মৃত্যু নেই, সে তো দেখেই নিলে, ক্ষুদ্রত্ব নেই, এসব কিছু নেই–আছে শুধু আনন্দ, অমরত্ব, বিরাটত্ব। আর তুমিই তার অধিকারী। অতএব ওঠো, জাগো–তং ত্বমসি তুমিই সেই।
সন্ন্যাসীর সৰ্ব্বদেহ দিয়ে একপ্রকার নীল বিদ্যুতের মত জ্যোতি যেন ঠিকরে বেরুচ্চেতাঁর দিকে চাওয়া যায় না। যতীন তাঁর পদস্পর্শ করবার জন্য মাথা নীচু করতেই তিনি বল্লেন–উঁহু–ছোট ভেবে আমার পা ছুঁয়ে তোমার কি হবে? ছোট তুমি নও। তুমিই দেব, তুমিই দেবী, তুমিই সগুণ ঈশ্বর–তুমিই জগকারণ নিরুপোধি অখণ্ড সচ্চিদানন্দ ১৩৭।
একই আছে, আর কিছু নেই জগতে–একস্ এব, অদ্বিতীয়–পৃথিবী বা পরলোক সব দুদিনের খেলা, আবার জন্ম, আবার মৃত্যু–বার বার। আসা-যাওয়া–সব অনিত্য–জেগে ওঠো–ঘুম ভেঙে জেগে ওঠো।
সন্ন্যাসী এত জোরে জোরে কথাগুলো বল্লেন–যতীনের মনে হোল তার সমস্ত শরীরে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল–সন্ন্যাসীর দেহ থেকেই যেন সে বিদ্যুৎতরঙ্গ ছুটে এল তার দেহে। সে চোখের সামনে কতকগুলো গোল গোল জড়ানো জড়ানো গোলকধাঁধাঁ খেলার মত কি দেখলে–তারপর আর তার জ্ঞান রইল না। যেন হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের মধ্যে সে যেন কোথায় চলেচে!
নীল আকাশ, সোম-সূর্য-তারকাচিহ্নিত–তার আশেপাশে, ঊর্ধে, নামোতে। বহু দূরে নীল সমুদ্রে ডুবে একটা কুণ্ডলীকৃত নীহারিকা পাক খাচ্চে–লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি নক্ষত্র, সূৰ্য্য, কুয়াসার ঢেউএর মত উল্কাপিণ্ডদল বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের বহির্দেশে ভ্রাম্যমান–লক্ষ লক্ষ জীবজগৎ, কোটি কোটি জীবজগৎ, লক্ষ কোটি লক্ষ কোটি আত্মিক লোক–কত লীলা, কত খেলা, কত সুখদুঃখের অনন্ত প্রবাহ-অনন্ত জীবজগৎ…
এ সবও ছাড়িয়ে এক জ্যোতির্ময় রাজ্যের প্রান্তে গিয়ে একটি অপূৰ্ব্ব শান্তির অনুভূতি সে অনুভব করলে..সুগভীর আনন্দ ও শান্তি, আর যেন মনে কোনো আশা নেই, কোনো তৃষ্ণা নেই, সুখ নেই, দুঃখ নেই, পাপের ভয় নেই, পুণ্যের স্পৃহা নেই, স্বৰ্গভোগের আকাঙ্ক্ষা নেই, পুষ্পের প্রতি প্রেম নেই, আশালতার প্রতি অনুকম্পা নেই– মনই নেই–যেন শুধু আছে ‘আমি আছি’ এই অনুভূতি, আর আছে তার সঙ্গে মিশে এক অতি উচ্চস্তরের আনন্দ, শান্তি, মহা উচ্চ জ্ঞান ও স্বয়ম্ভু স্বপ্রতিষ্ঠ অস্তিত্বের গভীর অনির্বচনীয় আনন্দ।
যতীনের মনে হোল সেই সন্ন্যাসী যেন কোথায় তার আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেচেন..কখনও তাঁর জ্যোতির্ময় দেহ দেখা যায়, কখনও যায় না।
তারপর সেই জ্যোতিৰ্ম্ময় দেশের অপূৰ্ব্ব শান্তি ও আনন্দময় আবেষ্টনীর মধ্যে সে প্রবেশ করলে..সঙ্গে সঙ্গে সেই সুগভীর পুলকে তার মন আবার ভরে উঠলো–উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় দেহধারী দেবদেবীরা সে রাজ্যের মণ্ডলে বিচরণ করছেন, তাঁরা যে আসনপীঠে ঠাকুর সেজে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছেন তা নয়, তাঁরা যেন সে জগতের সাধারণ অধিবাসী, নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত আছেন, তাই কেউ আকাশপথে বায়ুভরে চলেচেন, সমতল ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল পৃথিবীর মানুষের মত নন তাঁরা–ঊর্ধ্বে, নিম্নে–সবদিকে সমান গতি তাঁদের দু’একজনকে কাছে থেকে দেখবারও অবসর সে পেলে… পৃথিবীর মানুষের মত দেহ বটে, কিন্তু যেন বিদ্যুৎ দিয়ে গড়া, দেবীদের মুখের সৌন্দর্য অতুলনীয়, তাদের পৃথিবীর বাড়ীতে ছেলেবেলায় একটি প্রাচীন পটুয়ার আঁকা রাজরাজেশ্বরী মূর্তি ছিল দেওয়ালে টাঙানো, তার বৃদ্ধা ঠাকুরমা রোজ স্নান সেরে সেই পটের পূজো করতেন, খানিকক্ষণের জন্যে যেন পটের মুখ হাসতো–এতদিনের মধ্যে জীবনে সে সেই পটে আঁকা। রাজরাজেশ্বরীর মুখশ্রীর মত সুন্দর ও কমনীয় মুখশ্রী আর দেখেনি.. এখানে সে দু-একটি দেবীর মুখ যা দেখবার সুযোগ পেলে, পটের সে ছবির মুখের চেয়ে অনেক, অনেকগুণে সুশ্রী, আরও মহিমময়ী, বক্ৰ চাহনির মধ্যে ত্রিভুবন-বিজয়ী শক্তি…অথচ মুখে অনন্ত করুণার বাণীমূৰ্ত্তি।
