অতসী বুদ্ধিমতী মেয়ে, সে বুঝিল যাহার সহিত কথা বলিতেছে, রান্নার সম্বন্ধে সে একজন ওস্তাদ শিল্পী। সঙ্গীতের তরুণী ছাত্রী যেমন সঙ্কোচের সহিত তাহার যশস্বী সঙ্গীত শিক্ষকের সহিত রাগরাগিণী সম্বন্ধে কথা বলে-–তেমনি সঙ্কোচে বলিল–তা পারি সব, শুক্তুনি, চচ্চড়ি, ডাল, মাছের ঝোল–মা তো বড় একটা রান্নাঘরে যেতে পারেন না, তার মন খারাপ, আমাকেই সব করতে হয়। টেঁপি বলচিল আপনি নিরিমিষ রান্না বড় চমৎকার করেন, আমায় দেবেন শিখিয়ে কাকাবাবু?
–টেঁপি বুঝি এই সব বলে তোমার কাছে? পাগলী মেয়ে কোথাকার, ওর কথা বাদ দাও
–না কাকাবাবু, আমি অন্য জায়গাতেও শুনেছি আপনার রান্নার সুখ্যাতি। সবাই তো বলে।
পরে আবারের স্বরে বলিল–আমাকে শেখাতে হবে কাকাবাবু–আমি ছাড়চি নে, আমি টেঁপিকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, আপনি কবে আসবেন আমি খোঁজ নিই–ও বলেনি আপনাকে? না কাকাবাবু, আমায় শেখান আপনি। আমার বড় শখ ভাল রান্না শিখি।
হাজারি বলিল–ভাল রান্না শেখা একদিনে হয় না মা। মুখে বলে দিলেও হয় না। তোমার পেছনে আমায় লেগে থাকতে হবে অন্ততঃ ঝাড়া দু’মাস তিন মাস। হাত ধরে বলে দিতে হবে–তুমি রাঁধবে। আমি কাছে দাঁড়িয়ে তোমার ভুল ধরে দেবো, এ না হলে শিক্ষা হয় না। তুমি আমার টেঁপির মত, তোমাকে ছেঁদো কথা বলে ফাঁকি দেবো না মা, ছেলেমানুষ, শিখতে চাই শিখিয়ে দিতে আমার অসাধ নয়। কিন্তু কি করে সময় পাবো যে তোমায় শেখাবো মা!
অতসী সপ্রশংস দৃষ্টিতে হাজারির মুখের দিকে চাহিয়া তাহার কথা শুনিতেছিল। বিশেষজ্ঞ ওস্তাদের মুখের কথা। গুরুত্বপূর্ণ কথা–বাজে ছেঁদো কথা নয়, অনভিজ্ঞ, আনাড়ির কথাও নয়। তাহার চোখে হাজারি দরিদ্র রাঁধুনী বামুন পিতা নয়–যে ব্যবসায় সে ধরিয়াছে, সেই ব্যবসায়ে একজন অভিজ্ঞ, ওস্তাদ, পাকা শিল্পী।
হাজারির প্রতি তাহার মন সম্ভ্রমে পূর্ণ হইয়া উঠিল।
.
পরদিন হাজারি ঘুম হইতে উঠিয়া তামাক টানিতেছে, এমন সময় হঠাৎ অতসীকে তাহাদের বাড়ীর মধ্যে ঢুকিতে দেখিয়া সে রীতিমত বিস্মিত হইল। বড়মানুষের মেয়ে অতসী, অসময়ে কি মনে করিয়া তাহার মত গরীব মানুষের বাড়ী আসিল?
টেঁপি বাড়ী ছিল না, টেঁপির মা-ও অতসীকে আসিতে দেখিয়া খুব অবাক হইয়াছিল, সে ছুটিয়া গিয়া তাহার বুদ্ধিতে যতটুকু আসে, সেই ভাবে জমিদার-বাটীর মেয়ের অভ্যর্থনা করিল।
অতসী বলিল–কাকাবাবু বাড়ী নেই খুড়ীমা?
টেঁপির মা বলিল –হ্যাঁ মা, এসো আমার সঙ্গে, ঐ কোণের দাওয়ায় বসে তামাক খাচ্ছে।
–টেঁপি কোথায়?
–সে মূলোর বীজ আনতে গিয়েছে সদগোপ-বাড়ীতে। এল বলে, বসো, বসো। দাঁড়াও আসনখানা পেতে–
অতসী টেঁপির মার হাত হইতে আসনখানা ক্ষিপ্র ও চমৎকার ভঙ্গিতে কাড়িয়া লইয়া কেমন একটা সুন্দর ভাবে হাসিয়া বলিল–রাখুন আসন খুড়ীমা, ভারি আমি একেবারে গুরুঠাকুর এলুম কিনা– তা আবার যত্ন করে আসন পেতে দিতে হবে—
এই হাসি ও এই ভঙ্গিতে সুন্দরী মেয়ে অতসীকে কি সুন্দরই দেখাইল!–টেঁপির মা মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল অতসীর দিকে। ইতিমধ্যে হাজারি সে স্থানে আসিয়া বলিল–কি মনে করে সকালে লক্ষ্মী-মা?
অতসী হাজারির কাছে গিয়া বলিল–আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে।
–কি কথা মা?
–চলুন ওদিকে, একটু আড়ালে বলব।
হাজারি ভাবিয়াই পাইল না, এমন কি গোপনীয় কথা অতসী তাহাকে আড়ালে বলিতে আসিয়াছে এই সকালবেলায়। দাওয়ায় ছাঁচতলার দিকে গিয়া বলিল–কি কথা মা?
অতসী বলিল–কাকাবাবু, আপনি যদি কাউকে না বলেন, তবে বলি—
হাজারি বিস্মিত মুখে বলিল–বলবো না মা, বলো তুমি।
–আপনি হোটেল খুলবেন বলে বাবার কাছে টাকা ধার চেয়েছিলেন?
–হ্যাঁ, কিন্তু সে তো এবার নয়, সেবার। তোমায় কে বললে এসব কথা?
–সে সব কিছু বলব না। আমি আপনাকে টাকা দেবো, আপনি হোটেল খুলুন—
–তুমি কোথায় পাবে?
অতসী হাসিয়া বলিল–আমার কাছে আছে। দুশো টাকা দিতে পারি–আমি জমিয়ে জমিয়ে করেছি। লুকিয়ে দোবো কিন্তু, বাবা যেন জানতে না পারেন। কেউ জানতে না পারে।
হাজারির চোখে জল আসিল।
এ পর্যন্ত তিনটি মেয়ে তাহার জীবনে আসিল, যাহারা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে তাহাকে তাহার উচ্চাশার পথে ঠেলিয়া দিতে চাহিয়াছে — তিনজনেই সমান সরলা, তিনজনেই অনাত্মীয়া–তবে অতসী জমিদারবাড়ীর সুন্দরী, শিক্ষিত মেয়ে, সে যে এতখানি টান টানিবে ইহা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ধরণের আশ্চর্য ঘটনা!
হাজারি বলিল–কিন্তু তুমি একথা শুনলে কোথায় বলতে হবে মা।
অতসী হাসিয়া বলিল–সে কথা বলবো না বলেছি তো।
–তা হোলে টাকাও নেবো না। আগে বলো কে বলেছে?
–আচ্ছা, নাম করলে তাকে কি বলবেন না বলুন–
–কাকে কি বলবো বুঝতে পারছি নে তো? বলাবলি কথা কি আছে এর মধ্যে? আচ্ছা, বলবো না। বলো তুমি।
–টেঁপি বলেছিল, বাবার ইচ্ছে একটা হোটেল খোলেন, আমার বাবার কাছে নাকি টাকা চেয়েছিলেন ধার–তা বাবা দিতে পারেন নি। দেখুন কাকাবাবু, দাদা মারা যাওয়ার পরে বাবার মন খুব খারাপ। ওঁকে বলা না বলা দুই সমান। আমি ভাবলাম আমার হাতে তো টাকা আছে–কাকাবাবুকে দিই গে–ওঁদের উপকার হবে। আমার কাছে তো এমনি পড়েই আছে। আপনার হোটেল নিশ্চয়ই খুব ভাল চলবে, আপনারা বড়লোক হয়ে যাবেন। টেঁপিকে আমি বড় ভালবাসি, ওর মনে যদি আহ্লাদ হয় আমার তাতে তৃপ্তি। টাকা বাক্সে তুলে রেখে কি হবে?
