ছেলেটি অপ্রতিভের সুরে বলিল–না মামা, বেশী করি নি। আমাদের গায়ের ছাত্রবৃত্তি ইস্কুলের ফোর্থ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলাম, তারপর বাবা মারা গেলেন, আর লেখাপড়া হল না।
–তোমার নামটি কি?
–শ্রীনরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।
হঠাৎ একটা চিন্তা বিদ্যুতের মত হাজারির মনের মধ্যে খেলিয়া গেল, চমৎকার ছেলেটি, ইহার সঙ্গে টেঁপির বিবাহ দিলে বড় সুন্দর মানায়!…
কিন্তু তাহা কি ঘটিবে? ভগবান কি এমন পাত্র টেঁপির ভাগ্যে জুটাইয়া দিবেন।
ছেলেটি খাওয়া শেষ করিয়া উঠিয়া বলিল–আপনার খাওয়া হয়েছে মামা?
–এইবার খেতে বসবো বাবা। আমাদের খাওয়া এইরকম। বেলা তিনটের এদিকে বড় একটা মেটে না, সেইজন্যই তো বলচি বাবা এসব ছ্যাঁচড়া লাইন, তোমাদের জন্যে নয় এসব। রান্না কাজ বড় ঝঞ্ঝাটের কাজ।
ছেলেটি একটু হতাশ সুরে বলিল–তবে কোন্ লাইন ধরবো বলুন মামা? কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে দেখলাম। আজ ছ’মাস ধরে ঘুরচি। কোথাও কিছু জোটাতে পারিনি। আপনি বলছেন রাঁধুনীর কাজ–কলকাতায় একটা হোটেলের বাইরে লেখা ছিল–দুজন চাকর চাই। আমি গিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করলাম, বল্পে–কি? আমি বল্লাম–চাকরের কাজ খালি আছে দেখে এসেচি। বল্লে–-তুমি ভদ্রলোকের ছেলে, এ কাজ তোমার জন্যে নয়। কত করে বল্লাম, কিছুতেই নিলে না।
হাজারি অবাক হইয়া শুনিতেছিল। বলিল–বলো কি?
–তারপর শুনুন। কোথাও চাকুরি জোটে না। কলকাতায় শেষকালে খেতে পাইনে এমন হল। দু-একদিন তো না খেয়েই কাটলো। তারপর ভাবলাম, আমার এক মামা রাণাঘাটে হোটেলে কাজ করেন সেখানেই যাই। তাই আজ এলাম–উনি আমার আপন মামা নয়। মায়ের জ্ঞাতি ভাই। তা এখানেও আপনি বলছেন এ লাইন আমার জন্যে নয়–তবে কোথায় যাবো আর কি-ই বা করবো?
ছেলেটির হতাশার সুর এবং তাহার দুঃখ-কষ্টের কাহিনী হাজারির মনে বড় লাগিল। সে তখনও ভাবিতেছিল–আহা, ছেলেমানুষ! আমার বড় ছেলে সন্তু বেঁচে থাকলে এতদিন এত বড়টা হোত। টেঁপির সঙ্গে ভারি মানায়। সোনার চাঁদ হেন ছেলে! টেঁপি কি আর সে অদেষ্ট করেছে! নাই বা হোল চাকরি। ও গিয়ে টেঁপিকে বিয়ে করে আমার বড় ছেলে হয়ে আমার গায়ের ভিটেতে গিয়ে বসুক–ওকে কোনো কষ্ট করতে হবে না, আমি নিজে রোজগার করে ওদের খাওয়াবো। জমিজমাও তো আছে কিছু।
০৪. খাওয়া শেষ করিয়া বংশীধরের ভাগিনেয়টি
খাওয়া শেষ করিয়া বংশীধরের ভাগিনেয়টি চলিয়া গেল বটে কিন্তু হাজারির প্রাণে যেন কি এক অনিৰ্দেশ্য নূতন সুরের রেশ লাগাইয়া দিয়া গেল। তরুণ মুখের ভঙ্গি, তরুণ চোখের চাহনি হইতে এত প্রেরণা পাওয়া যায়?…… জীবনে এ সব নবীন অভিজ্ঞতা হাজারির।
বৈকালে চূর্ণীর ধারের গাছতলায় নির্জনে বসিয়া সে কত স্বপ্ন দেখিল। নতুন সব স্বপ্ন। টেঁপির সহিত বংশীধরের ভাগিনেয়টির বিবাহ হইতেছে। বাধা কিছুই নাই, তাহাদেরই পালটি ঘর।
টেঁপির ক্ষুদ্র, কোমল হাতখানি নরেনের বলিষ্ঠ হাতে তুলিয়া দিয়াছে… দুই হাত একত্র মিলাইয়া হাজারি মেয়ে-জামাইকে আশীর্বাদ করিতেছে।…টেঁপির মার চোখ দিয়া আনন্দে জল পড়িতেছে–কি সুন্দর সোনার চাঁদ জামাই!
কেন সে হোটেলে রাঁধুনীগিরি করিতে যাইবে ছেলেবয়সে? হাজারির নিজের হোটেলে জামাই থাকিবে ম্যানেজার, চক্কত্তি মশায়ের মত গদিতে বসিয়া খরিদদারকে টিকিট বিক্রয় করিবে–হিসাবপত্র রাখিবে।
দ্বিগুণ খাটিবার উৎসাহ আসিবে হাজারির–জামাইও যা ছেলেও তাই। অত বড় অত সুন্দর, উপযুক্ত ছেলে। টেঁপির সারাজীবনের আনন্দ ও সাধের জিনিস। ওদের দুজনের মুখের দিকে চাহিয়া সে প্রাণপণে খাটিবে। তিন মাসের মধ্যে হোটেল দাঁড় করাইয়া দিবে।
বেলা পড়িল। চূর্ণীর খেয়ায় লোক পারাপার হইতেছে, যাহারা শহরে কেনা-বেচা করিতে আসিতেছিল–এই সময় তাহারা বাড়ী ফেরে।
একবার কুসুমের সঙ্গে দেখা করিয়া হোটেলে ফিরিতে হইবে–গাছতলায় বসিয়া আর বেশীক্ষণ আকাশ-কুসুম ভাবিলে চলিবে না। রতন ঠাকুর সম্ভব এবেলাও দেখা দিতেছে না, তাহাকে একাই সব কাজ করিতে হইবে।
কিন্তু সত্যই কি আকাশ-কুসুম? হোটেল তাহার হইবে না? টেঁপির সঙ্গে ওই ছেলেটির–
যাক। বাজে ভাবনায় দরকার নাই। দেরি হইয়া যাইতেছে।
পদ্ম ঝি বৈকালের দিকে হাজারিকে বলিল–বলি, হ্যাঁগো ঠাকুর, আজ মাছের মুড়োটা কি হ’ল গা? আজ ত কর্তাবাবুর জর। তিনি বেলা এগারোটার মধ্যেই চলে গিয়েছেন– অত বড় মুড়োটার কি একটা টুকরোও চোখে দেখতে পেলাম না–
হাজারি মাছের মুড়োটা লুকাইয়া কুসুমকে দিয়া আসিয়াছিল। বড় মাছের মুড়ো সাধারণতঃ কর্তার বাসায় যায়, কিন্তু আজ কর্তার অসুখ –তিনি বেশীক্ষণ হোটেলে ছিলেন না –মুড়োটা পদ্ম ঝি নিজের বাড়ী লইয়া যাইত–হাজারি কখনও মুড়ো নিজে খায় নাই– রতনঠাকু খাইয়াছে, পদ্ম ঝি ত প্রায়ই লইয়া যায়–হাজারির দাবি কি থাকিতে পারে না মুড়োর উপর? তাই সে সেটা কুসুমকে দিয়া আসিয়াছিল যখন ছুটি করিয়া চূর্ণীর ঘাটে বেড়াইতে যায় তখন।
পদ্ম ঝিয়ের প্রশ্নের উত্তরে হাজারি বলিল–কেন গা পদ্মদিদি, এতক্ষণ পরে মুড়োর খোঁজ হল?
–এতক্ষণ পরেই হোক আর যতক্ষণ পরেই হোক–কি হ’ল মুড়োটা?
–আমায় কি একদিন খেতে নেই? তোমরা ত সবাই খাও। আমি আজ খেয়েছি।
–কই মুড়োর কাঁটাচোকডা ত কিছু দেখলাম না? কোথায় বসে খেলে?
