আর ওখানে গিয়া বসিলেই হাজারির মাথায় হোটেল সংক্রান্ত নানা রকম নতুন কথা আসে, অন্য কোথাও তেমন হয় না।
আজ জায়গাটাতে গিয়া বসিতেই হাজারির প্রথমে মনে হইল, হোটেল চলে রান্নার গুণে। যাহারা পয়সা দিয়া খাইতে আসিবে, তাহারা চায় ভাল জিনিস খাইতে–ফেন-মিশানো ডাল খাইতে তারা আসে না।
পদ্ম ঝিয়ের অনাচারের দরুন বেচু চক্কত্তির হোটেল উঠিয়া যাইবে। তাহার নিজের হোটেল ততদিনে খোলা হইয়া যাইবে। তাহার রান্নার গুণেই হোটেল চলিবে। হঠাৎ হাজারি লক্ষ্য করিল, যতীশ ভটচাজ, চূর্ণীর খেয়াঘাটে দাঁড়াইয়া আছে। বোধ হয় পার হইয়া ওপারে যাইবে।
–ও ভটচাজ মশায়–ভটচাজ মশায়—
যতীশ চাহিয়া দেখিয়া উঠিয়া হাজারির কাছে আসিল।
–কোথায় যাবেন?
–যাচ্ছি একটু ফুলে-নবলা, আমার ভায়রাভাই থাকে, তারই ওখানে। দেখলে তো হাজারি তোমাদের চক্কত্তি মশায়ের কাণ্ডটা আজ! বলি টাকা কি আমি দিতাম না? দুপুরবেলা না খাইয়ে কি-না বল্লে অন্য জায়গায় চেষ্টা করুন গিয়ে। ভাত-বেচা বামুন যদি ছোটলোক না হয়, তবে আর কে হবে! বিড়ি আছে? দাও তো একটা–
হাজারি নিকট হইতে বিড়ি লইয়া ধরাইয়া বলিল–দুশো ঝাঁটা মারি শহরের মাথায়। আর থাকচি নে। যাচ্ছি ফুলে-নবলা, আমার বড় ভায়রাভাই পাৰ্বতী চক্কত্তি সেখানে একজন নামকরা লোক। পার্বতী দাদা একবার বলেছিল ওদের জমিদারী কাছারীতে একটা চাকরি করে দেবে। পালচৌধুরীদের জমিদারী। মস্ত কাছারী। সেখানেই যাচ্ছি। একটা হিল্লে হয়ে যাবেই।
হাজারি বলিল–একটা কথা বলি ভটচাজ মশাই, যদি কিছু মনে না করেন–
যতীশ ভটচাজ, বলিল–কি?–টাকাকড়ি এখন কিছু নেই আমার কাছে তা বলে দিচ্ছি। তবে দেনা আমি রাখবো না–খাওয়ার টাকা আগে শোধ দিয়ে তখন অন্য কথা। সে তুমি বলে দিও চক্কত্তি মশাইকে।
হাজারি বলিল–টাকাকড়ির কথা বলিনি। বলচিলাম, আপনি আহার করেচেন?
যতীশ ভটচাজ, কিছুমাত্র না ভাবিয়া সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর দিল–না। কোথায় করবে? এত বেলায় চক্কত্তি মশায়ের হোটেল থেকে ফিরে আর ভাত কে আমার জন্যে নিয়ে বসে ছিল?
হাজারি খপ করিয়া যতীশ ভটচাজের ডান হাতখানা ধরিয়া বলিল–আমার সঙ্গে চলুন ভটচাজ মশায়–আমি আপনাকে রেঁধে খাওয়াবো আজ। আসুন আমার সঙ্গে—
যতীশ ভটচাজ বলিল–কোথায়? কোথায়? আরে না, না হাজারি, আজ ও-সব থাক, আমি জল-টল খেয়ে–আর এমন অবেলায়–
হাজারি নাছোড়বান্দা। তাদের হোটেলের একজন পুরানো খদ্দের আজ পয়সা নাই বলিয়া সারাদিন অনাহারে থাকিয়া রাণাঘাট হইতে চলিয়া যাইতেছে–কি জানি কেন, এ ব্যাপারটার জন্য হাজারি যেন নিজেকেই দায়ী করিয়া বসিল।
যতীশ ভটচাজ বলিল–আমি তোমাদের হোটেলে আর যাবো না কিন্তু হাজারি। আচ্ছা তুমি যখন ছাড়চো না তখন বরং একটু জল-টল খাওয়াও।
–হোটেলে নিয়েই বা যাবো কেন? আসুন না জল-টল নয়, ভাত খাওয়াবো রেঁধে। যতীশ ভটচাজ ব্যস্ত হইয়া বলিল, না না, ফুলে-নবলা যেতে পারবো না আজ তাহলে। আজ সেখানে পৌঁছুতেই হবে।
নিকটেই কুসুমের বাড়ী, একবার হাজারি ভাবিল ভটচাজকে সেখানে লইয়া যাইবে কি না। শেষে ভাবিয়া-চিন্তিয়া তাহাই করিল। ভদ্রলোককে নতুবা কোথায় বসাইয়া সে খাওয়ায়?
কুসুমের বাড়ীর দোরে কড়া নাড়িতেই কুসুম আসিয়া দোর খুলিয়া হাজারিকে দেখিয়া হাসিমুখে কি বলিতে যাইতেছিল, হঠাৎ যতীশ ভটচাজের দিকে দৃষ্টি পড়ায় সে লজ্জিত হইয়া নীচুস্বরে বলিল–বাবাঠাকুর কি মনে করে? উনি কে সঙ্গে?
–ওর জন্যেই আসা। উনি বামুন মানুষ, আজ সারাদিন খাওয়া হয়নি। আমার চেনাশুনা–আমাদের হোটেলের পুরোনো খদ্দের। পয়সা ছিল না বলে খেতে দেয়নি কর্তামশাই। উনি না খেয়ে শান্তিপুর চলে যাচ্ছিলেন, আমার সঙ্গে দেখা–ধরে আনলুম। উকে কিছু না খাইয়ে তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। বাইরের ঘরটা খুলে দাও গিয়ে—
কুসুম ব্যস্ত হইয়া বাহিরের ঘরের দোর খুলিতে গেল। যতীশ ভটচাজ, কিছু দূরে দাঁড়াইয়া ছিল–হাজারি তাহাকে ডাক দিয়া বাহিরের ঘরে বসাইল। তাহার পর বাড়ীর ভিতর যাইতেই কুসুম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলিল–কি করবেন বাবাঠাকুর, রান্না করবেন? সব যোগাড় করে দিই। আর ততক্ষণ ধরে যা-কিছু আছে, ও বাবাঠাকুরকে দিই, কি বলেন?
হাজারি বলিয়া–রান্না করে খাওয়াতে গেলে চলবে না কুসুম। উনি থাকতে পারবেন না; ফুলে-নবলা যাবেন। আমি বাজার থেকে খাবার কিনে আনি–এখানে একটু বসবার জন্যে নিয়ে এলাম।
কুসুম দিয়া বলিল–বাবাঠাকুর, আপনি ব্যস্ত হবেন না দিকিনি। আমি সব যোগাড় করচি জলখাবারের। আমার ঘরে সব আছে, ঘরে থাকতে বাজারে যাবেন খাবার আনতে কেন? আমার বাড়ীতে যখন ব্রাহ্মণের পায়ের ধূলো পড়েছে, তখন আমার ঘরে যা আছে তাই দিয়ে খেতে দেব–কিন্তু বাবাঠাকুর, সেই সঙ্গে আপনিও–মনে থাকে যেন। হাজারি প্রতিবাদ-বাক্য উচ্চারণ করার পূৰ্বেই কুসুম ঘরের মধ্যে চলিয়া গেল–অগত্যা হাজারি বাহিরের ঘরে যতীশ ভটচাজের কাছে ফিরিয়া আসিল।
যতীশ ভটচাজ, বলিল–তোমার কোনো আত্মীয়ের বাড়ী নাকি হে?
–না, আত্মীয় নয়, এরা হোল ঘোষ-গোয়ালা। এই বাড়ীতে আমার ধর্মমেয়ের বিয়ে হয়েছে, ওই যে দোর খুলে দিলে, ওই মেয়েটি।
পনেরো মিনিট আন্দাজ পরে ঝন ঝন করিয়া শিকল নড়িয়া উঠিতে হাজারি বাহিরের বাড়ীর অক্ষয়ের দিকে দাওয়ায় গিয়া দাঁড়াইল–দাঁড়াইয়া দাওয়ার দিকে চাহিয়া অবাক হইয়া গেল। দু’খানি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আসন পাতা–দু’বাটি জ্বাল দেওয়া দুধ, দুখানা থালে ফল-মূল কাটা, বড় বাতাসা, ছানা, দুটি মুখ-কাটা ভাব। ঝকঝকে করিয়া মাজা দুটি কাঁসার গ্লাসে দু’গ্লাস জল।
