অনেক রাত্রে সুপ্তোত্থিতা কুসুম চোখ মুছিতে মুছিতে বাহিরের দরজা খুলিয়া সম্মুখে মস্ত এক পোঁটলা-হাতে-ঝোলানো অবস্থায় হাজারি ঠাকুরকে দেখিয়া বিস্ময়ের সুরে বলিল–কি বাবাঠাকুর, কি মনে করে এত রাত্রে?…
হাজারি বলিল–এতে লুচি আছে মা কুসুম। হোটেলে লুচি ভাজতে দিয়েছিল খদ্দেরে। বেলে দেবার লোক নেই–শেষকালে খদ্দের পাঁচ সের ময়দার লুচি নিলে না, কর্তাবাবু বলেন আমায় তার দাম দিতে হবে। বেশ আমায় দাম দিতে হয় আমিই নিয়ে নিই। তাই তোমার জন্যে বলি নিয়ে যাই, কুসুমকে তো কিছু দেওয়া হয় না কখনো। রাত বড্ড হয়ে গিয়েচে– ঘুমিয়েছিলে বুঝি? ধর তো মা বোঁচকাটা রাখো গে যাও।
কুসুম বোঁচকাটা হাজারির হাত হইতে নামাইয়া লইল। সে একটু অবাক হইয়া গিয়াছে, বাবাঠাকুর পাগল, নতুবা এত রাত্রে–(তাহার এক ঘুম হইয়া গিয়াছে–), এখন আসিয়াছে লুচির বোঁচকা লইয়া।
হাজারি বলিল, আমি যাই মা–লুচি গরম আর টাটকা, এই ভেজে তুলিচি। তুমি খানকতক খেয়ে ফেলো গিয়ে এখনি। কাল সকালে বাসি হয়ে যাবে। আর ছেলেপিলেদের দাও গিয়ে। কত আর রাত হয়েচে– সাড়ে বারোটার বেশী নয়।
০৩. হোটেলে ফিরিয়া হাজারি ঠাকুর
হোটেলে ফিরিয়া হাজারি ঠাকুর একটি দুঃসাহসের কাজ করিল।
মতি চাকর পূর্ব হইতেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। তাহাকে তুলিয়া বলিল–মতি, আমি রাত তিনটের গাড়ীতে বাড়ী যাচ্চি। এত লুচি কি হবে, বাড়ীতে দিয়ে আসি। তুমি থাকো, আমি কাল সকাল দশটার গাড়ীতে এসে রান্না করবো, কর্তা মশায়কে বলো।
মতি অবাক লইয়া বলিল–এত রাত্রে লুচি নিয়ে বাড়ী রওনা হবে।–
–এত লুচি কি হবে? এখানে থাকলে কাল সকালে বারোভূতে খাবে তো। আমার জিনিস নিজের বাড়ী দিয়ে আসি। আমার বাড়ীতে ছেলেমেয়ে আছে, তারা খেতে পায় না, তাদের দিয়ে আসি! ছ’টা পয়সা তো খরচ।
হাজারি আর ঘুমাইল না। টেঁপির জন্য তার মন-কেমন করিয়া উঠিয়াছে। কুসুম যেমন, টেঁপিও তেমন। আরও দুটি ছেলে আছে ছোট ছোট। তাদের মুখ বঞ্চিত করিয়া এত লুচি এখানে রাখিয়া পদ্ম ঝি আর কর্তামশায়ের বাড়ীতে খাওয়াইয়া কোন লাভ নাই।
রাত সাড়ে তিনটার সময় গাংনাপুর স্টেশনে নামিয়া হাজারি নিজের গ্রামের পথ ধরিল এবং সাড়ে তিন কোশ পথ হাঁটিয়া ভোর হইবার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে পৌঁছিল।
এঁড়োশোলা এক সময়ে বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল–এখন পূর্বের শ্রী নাই। গ্রামের জমিদার কর বাবুরা এখান হইতে উঠিয়া কলিকাতা চলিয়া যাওয়াতে গ্রামের মাইনর স্কুলটির অবস্থা খারাপ হইয়া পড়িয়াছে। বড় দীঘিটা মজিয়া গিয়াছে, ভদ্রলোকের মধ্যে অনেকে এখান হইতে বাস উঠাইয়া কেহ রানাঘাট, কেহ কলিকাতা চলিয়া গিয়াছেন। নিতান্ত নিরুপায় যারা তারাই গ্রামে পড়িয়া আছে।
হাজারির বাড়ীতে দুখানা খড়ের ঘর। ছোট উঠান, একদিকে কাঁঠাল গাছ, অন্যদিকে একটা সজনে গাছ এবং একটা পেয়ারা গাছ। এই পেয়ারা গাছটা হাজারির মা নিজের হাতে পুঁতিয়াছিলেন– বেশ বড় বড় পেয়ারা হয়, কাশীর পেয়ারার বীজের চারা।
হাজারির ডাকাডাকিতে হাজারির স্ত্রী উঠিয়া দোর খুলিয়া, এ অবস্থায় স্বামীকে দেখিয়া বলিল–এসো, এসো। শেষ রাতের গাড়ীতে এলে কেন গো? এই দুরান্তর রাস্তা, অন্ধকার রাত–আবার বড্ড সাপের ভয় হয়েছে–সাপের কামড়ে দু-তিনটি মানুষ মরে গিয়েছে এর মধ্যে।
–আমাদের গাঁয়ে?
–আমাদের গায়ে নয়–নতুন কাওয়া পাড়ায় একটা মরেচে আর বামন পাড়ায় শুনচি একটা–অত বড় বোঁচকাতে কি গো?
হাজারি লুচির আসল ইতিহাস কিছু বলিল না। স্ত্রীর আনন্দপূর্ণ সাগ্রহ প্রশ্নের উত্তরে সে কেবল বলিল–পেয়েছি গো পেয়েছি। ভগবান দিয়েছেন, সবাই মিলে খেয়ে নাও মজা করে। টেঁপিকে খুব করে খাওয়াও, ও পেট ভরে খাবে আমি দেখি।
.
সেদিন সকালের গাড়ীতে হাজারি রাণাঘাটে ফিরিতে পারিল না।
দুপুরের পরে হাজারি কুসুমের বাপের বাড়ী বেড়াইতে গেল।
এই গ্রামেই গোয়ালপাড়ায় কুসুমের জ্যাঠামশায় হরি ঘোষের অবস্থা এক সময় যথেষ্ট ভাল ছিল, এখনও বাড়ীতে গোহাল-পোরা গরুর মধ্যে আট-দশটি অবশিষ্ট আছে, দুটি ছোট ছোট ধানের গোলাও বজায় আছে।
হাজারিকে হরি ঘোষ খুব খাতির করিয়া খেজুর পাতার চটে বসিতে দিল। বলিল–কবে আলেন বাবাঠাকুর? সব ভালো।
–তোমরা সব ভাল আছ?
–আপনার ছিচরণের আশিব্বাদে এক রকম চলে যাচ্ছে। রাণাঘাটেই কাজ কচ্চেন তো?
–হ্যাঁ। সেখান থেকেই তো এলাম।
–আমাদের কুসুমের সঙ্গে দেখা-টেখা হয়?
হাজারি পাড়াগাঁয়ের লোক, এখানকার লোকের ধাত চেনে। কুসুমের সঙ্গে সর্বদা দেখা শোনা বা তাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি টানের কোন পরিচয় সে এখানে দিতে চায় না। ইহারা হয়তো সহজ ভাবে সেটা গ্রহণ করিতে পারিবে না। গ্রামে কথাটা রাষ্ট্র হইয়া গেলে লোকে নানারূপ কদৰ্থ টানিয়া বাহির করিবার চেষ্টা করিবে তাহা হইতে। সুতরাং সে বলিল
–হ্যাঁ,–দু-একবার হয়েছিল। ভাল আছে।
–এবার যদি দেখা হয়, একবার আসতে বলবেন ইদিকে। তার গাঁয়ে আসবার দিকে তত টান নেই, শহরে দুধ বেচে চালানো যে কি মিষ্টি লেগেছে!
হাজারি কথার গতি অন্য দিকে ঘুরাইবার উদ্দেশ্যে বলিল–এবার আবাদপত্র কি রকম হোল বল?
-ধানের আবাদ করিচি বারো বিঘে আর বাকী সব তরকারি। কুমড়ো দু-বিঘে, আলু, পেঁয়াজ,–তা এবার আকাশের অবস্থা ভাল না বাবাঠাকুর, ক্ষেতে মাটি ফেটে যাচ্চে!
