–উঃ! সে আপনি মনে করে রেখেছেন এতদিন। সে সব কি আজকের কথা?
অপু অনেকটা আপনমনেই অন্যমনস্কভাবে বলিল—আর একবার তুমি তোমার জন্যে আনা দুধ অর্ধেকটা খাওয়ালে আমায় জোর করে, শুনলে না কিছুতেই—ওঃ, দেখতে দেখতে কত বছর হয়ে গেল!
বলিয়া সে হাসিল, কিন্তু লীলা কোনও কথা বলিল না। অপু একবার পিছন দিকে চাহিল, লীলা অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া কি যেন দেখিতেছে।
ফিরিবার পথে একটা কথা তাহার বারবার মনে আসিতেছিল। অপর্ণা সুন্দরী বটে, কিন্তু লীলার সঙ্গে এ পর্যন্ত দেখা কোন মেয়ের তুলনা হয় না, হওয়া অসম্ভব। লীলার রূপ মানুষের মতো নয় যেন, দেবীর মতো রূপ, মুখের অনুপম শ্রীতে, চোখের ও ভূর ভঙ্গিতে, গায়ের রং-এ, গলার সুরে, গতির ছন্দে।
অপু বুঝিল সে লীলাকে ভালোবাসে, গভীর ভাবে ভালোবাসে, কিন্তু তা আবেগহীন, শান্ত, ধীর ভালোবাসা। মনে তৃপ্তি আনে, স্নিগ্ধ আনন্দ আনে, কিন্তু শিরায় উপশিরায় রক্তের তাণ্ডব নর্তন তোলে না। লীলা তাহার বাল্যের সাথী, তাহার উপর মায়ের পেটের বোনের মতো একটা মমতা, স্নেহ ও অনুকম্পা, একটা মাধুর্য-ভরা ভালোবাসা।
দিন কয়েক পরে, একদিন লীলার দাদামশায়ের এক দারোয়ান আসিয়া তাহাকে একখানা পত্র দিল, উপরে লীলার হাতের ঠিকানা লেখা। পত্ৰখানা সে খুলিয়া পড়িল। দু-লাইনের পত্র, একবার বিশেষ প্রয়োজনে আজ বা কাল ভবানীপুরের বাড়িতে যাইতে লিখিয়াছে।
লীলা সাদাসিধা লালপাড় শাড়ি পরিয়া মাঝের ছোট ঘরে তাহার সঙ্গে দেখা করিল। যাহাই সে পরে, তাহাতেই তাহাকে কি সুন্দর না মানায়! সকাল আটটা, লীলা বোধহয় বেশিক্ষণ ঘুম হইতে উঠে নাই, রাত্রির নিদ্রালুতা এখনও যেন ডাগর ডাগর সুন্দর চোখ হইতে একেবারে মুছিয়া যায় নাই, মাথার চুল অবিন্যস্ত, ঘাড়ের দিকে ঈষৎ এলাইয়া পড়িয়াছে, প্রভাতের পদ্মের মতো মুখের পাশে চুর্ণকুন্তলের দু-এক গাছা। অপু হাসি-মুখে বলিল-থার্ড ইয়ার বলে বুঝি লেখাপড়া ঘুচেছে? আটটার সময় ঘুম ভাঙল? না, এখনও ঠিক ভাঙে নি?
লীলা যে কত পছন্দ করে অপুকে তাহার এই সহজ আনন্দ, খুশি ও হালকা হাসির আবহাওয়ার জন্য! ছেলেবেলাতেও সে দেখিয়াছে, শত দুঃখের মধ্যেও অপুর আনন্দ, উজ্জ্বলতা ও কৌতুকপ্রবণ মনের খুশি কেহ আটকাইয়া রাখিতে পারিত না, এখনও তাই, একরাশ বাহিরের আলো ও তারুণ্যের সজীব জীবনানন্দ সে সঙ্গে করিয়া আনে যেন, যখনই আসে–আপনা-আপনিই এসব কথা লীলার মনে হইল। তাহার মনে পড়িল, মায়ের মৃত্যুর খবরটা সে এই রকম হাসিমুখেই দিয়াছিল লালদিঘির মোড়ে।
—আসুন, বসুন, বসুন। কুড়েমি করে ঘুমুই নি, কাল রাত্রে বড়ো মামিমার সঙ্গে বায়োস্কোপে গিয়েছিলাম সাড়ে-নটার শোতে। ফিরতে হয়ে গেল পৌনে বারো, ঘুম আসতে দেড়টা। বসুন চা আনি।
জাপানী গালার সুদৃশ্য চায়ের বাসনে সে চা আনিল। সঙ্গে পাউরুটি-টোস্ট, খোলসুদ্ধ ডিম, কি এক প্রকার শাক, আধখানা ভাঙা আলু-সব সিদ্ধ, ধোঁয়া উঠিতেছে। অপু বলিল—এসব সাহেবি বন্দোবস্ত বোধ হয় তোমার দাদামশায়ের, লীলা? ডিম, তা আবার খোলাসুদ্ধ, এ শাকটা কি?
লীলা হাসিমুখে বলিল—ওটা লেটু। দাঁড়ান ডিম ছাড়িয়ে দি। আপনার দাড়ির কাছে ও কাটা দাগটা কিসের? কামাবার সময় কেটে ফেলেছিলেন বুঝি?
অপু বলিল-ও কিছু না, এমনি কিসের। বোসো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন, তুমি চা খাবে না?
লীলার ছোট ভাই ঘরে ঢুকিয়া অপুর দিকে চাহিয়া হাসিল, নাম বিমলেন্দু, দশ-এগাবো বছবেব সুশ্রী বালক। লীলা তাহাকে চা ঢালিয়া দিল, পরে তিনজনে নানা গল্প করিল। লীলা নিজের আঁকা কতকগুলি ছবি দেখাইল, নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বলিল। সে এম.এ. পাশ করিবে, নয় তো বি.এ. পাশ করিয়া বিদেশে যাইতে চায়, দাদামশায়কে রাজি করাইয়া লইবে, ইউরোপের বড়ো আর্ট গ্যালারিগুলির ছবি দেখিবে, ফিরিয়া আসিয়া অজন্তা দেখিতে যাইবে, তার আগে নয়। একটা আলমারি দেখাইয়া বলিল—দেখুন না এই বইগুলো?…ভ্যাসারির লাইভস্ এডিশনটা কেমন?…ছবিগুলো দেখুন-সেন্ট অ্যান্টনির ছবিটা আমার বড়ো ভালো লাগে, কেমন একটা তপস্যাস্ত ভাব, না?—ইনস্টলমেন্ট সিসটেমে এগুলো নিছি-আপনি কিনবেন কিছু? ওদের ক্যানভাসার আমাদের বাড়ি আসে, তা হলে বলে দি।
অপু বলিল—কত কবে মাসে?…ভ্যাসারির এডিশনটা তাহলে না হয়—
—এটা কেন কিনবেন? এটা তো আমার কাছেই রয়েছে—আপনার যখন দরকার হবে, নেবেন—আমার কাছে যা যা আছে, তা আপনাকে কিনতে হবে কেন?—দাঁড়ান, আর একটা বইয়ের একখানা ছবি দেখাই
অপু ছবিটার দিক হইতে আর একবার লীলার দিকে চাহিয়া দেখিলবতিচেলির প্রিন্সেস দে খুব সুন্দরী বটে, কিন্তু বতিচেলির বা দ্য ভিঞ্চির প্রতিভা লইয়া যদি লীলার এই অপূর্ব সুন্দর মুখ, এই যৌবন-পুষ্পিত দেহলতা ফুটাইয়া তুলিতে পারিত কেউ!…
কথাটা সে বলিয়াই ফেলিল—আমি কি ভাবছি বলব লীলা? আমি যদি ছবি আঁকতে পারতাম, তোমাকে মডেল করে ছবি আঁকতাম
লীলা সে কথার কোন জবাব না দিয়া হঠাৎ বলিল—ভালো কথা, আ অপূর্ববর, একটা চাকরি কোথাও যদি পাওয়া যায়, তো করবেন?
অপু বলিল—কেন করব না; কিসের চাকরি?
লীলা বিবরণটা বলিয়া গেল। তাহার দাদামশায় একটা বড়ো স্টেটের অ্যাটর্নি, তাদের অফিসে একজন সেক্রেটারি দরকার-মাইনে দেড়শো টাকা, চাকরিটা দাদামশায়ের হাতে, লীলা বলিলে এখনই হইয়া যায়, সেই জন্যই আজ তাহাকে এখানে ডাকিয়া আনা!
