লীলা ধরা গলায় বলিল—বাবা তো, এই তিন বছর হল—এটা মামার বাড়ি–
অপু বলিল—ও! তাই ঝি বললে দিদিমণি ডাকছেন—মানে উনি?…মিঃ লাহিড়ী কে হন তোমার?
–দাদামশায়—উনি ব্যারিস্টার, তবে আজকাল আর প্র্যাকটিস করেন না—বড়ো মামা হাইকোর্টে বেরুচ্ছেন। ও-বছর বিলেত থেকে এসেছেন।
চা ও খাবার খাইয়া অপু বিদায় লইল। লীলা বলিল—বড়ো মামার মেয়ের নে-ডে পার্টি, সামনের বুধবারে। এখানে বিকালে আসবেন অবিশ্যি অপূর্বাবু—ভুলবেন না যেন—ঠিক কিন্তু ভুলবেন না।
পথে আসিয়া অপুর চোখে প্রায় জল আসিল। অপূর্ববাবু!—
লীলাই বটে, কিন্তু ঠিক কি সেই এগারো বছরের কৌতুকময়ী সরলা স্নেহময়ী লীলা?…সে লীলা কি তাহাকে অপূর্ববাবু বলিয়া ডাকিত? তবুও কি আন্তরিকতা ও আত্মীয়তা। আর নিজের আপনার লোক জ্যাঠাইমাও তো কলিকাতায় আছেন-মেজ-বৌরানী সম্পূর্ণ পর হইয়া আজ তাহার বিষয়েতে যত খুঁটিনাটি আন্তরিক আগ্রহে প্রশ্ন করিলেন, জ্যাঠাইমা কোনও দিন তাহা করিয়াছেন?…
বাসায় ফিরিয়া কেবলই লীলার কথা ভাবিল। তাহার মনের যে স্থান লীলা দখল করিয়া আছে ঠিক সে স্থানটিতে আর কেহই তো নাই? কিন্তু সে এ লীলা নয়। সে লীলা স্বপ্ন হইয়া কোথায় মিলাইয়া গিয়াছে—আর কি তাহার দেখা মিলিবে কোনও কালে? সে ঠিক বুঝিতে পারিল না— আজকার সাক্ষাতে সে আনন্দিত হইয়াছে কি ব্যথিত হইয়াছে।
বুধবারে পার্টির জন্য সে টুইল শার্টটা সাবান দিয়া কাচিয়া লইল। ভাবিল, নিজের যাহা আছে তাহাই পরিয়া যাইবে, চাহিবার চিন্তিবার আবশ্যক নাই। তবুও যেন বড়ো হীনবেশ হইল। মনে মনে ভাবিল, হাতে যখন পয়সা ছিল, তখন লীলার সঙ্গে দেখা হল না—আর এখন একেবারে এই দশা, এখন কিনা–!
লীলার দাদামশায় মিঃ লাহিড়ী খুব মিশুক লোক। অপুকে বৈঠকখানায় বসাইয়া খানিকক্ষণ গল্পগুজব করিলেন। লীলা আসিল, সে ভারি ব্যস্ত, একবার দু-চার কথা বলিয়াই চলিয়া গেল। কোনও পার্টিতে কেহ কখনও তাহাকে নিমন্ত্রণ করে নাই। যখন এক এক করিয়া নিমন্ত্রিত ভদ্রলোক ও মহিলাগণ আসিতে আরম্ভ করিলেন, তখন অপু খুব খুশি হইল। কলিকাতা শহরে এ রকম ধনী উচ্চ শিক্ষিত পরিবারে মিশিবার সুযোগ—এ বুঝি সকলের হয়? মাকে গিয়া গল্প করিবার মতো একটা জিনিস পাইয়াছে এতদিন পরে! মা শুনিয়া কি খুশিই যে হইবেন।
বৈঠকখানায় অনেক সুবেশ যুবকের ভিড়, প্রায় সকলেই বড়োললকের ছেলে, কেহ বা নতুন ব্যারিস্টারি পাশ করিয়া আসিয়াছে, কেহ বা ডাক্তার, বেশির ভাগ বিলাতফেরত। কি লইয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া তর্ক হইতেছিল। কর্পোরেশন ইলেকশন লইয়া কথা কাটাকাটি। অপু এ বিষয়ে কিছু জানে না, সে একপাশে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
পাড়াগাঁয়ের কোন একটা মিউনিসিপ্যালিটির কথায় সেখানকার নানা অসুবিধার কথাও উঠিল।
একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, চোখে সোনা-বাঁধানো চশমা, একটু টানিয়া টানিয়া কথা বলিবার অভ্যাস, মাঝে মাঝে মোটা চুরুটে টান দিয়া কথা বলিতেছিলেন–দেখুন মিঃ সেন, এগ্রিকালচারের কথা যে বলছেন, ও শখের ব্যাপার নয়—ও কাজ আপনার আমার নয়, ইট মাস্ট বি ব্রেড ইন্ দি বোন্জ ন্মগত একটা ধাত গড়ে না উঠলে শুধু কলের লাঙল কিনলে ও হয় না
প্রতিপক্ষ একজন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বৎসরের যুবক, সাহেবি পোশাক-পরা, কেশ সবল ও সুস্থকায়। তিনি অধীরভাবে সামনে ঝুঁকিয়া বলিলেন—মাপ করবেন রমেশবাবু, কিন্তু একথার কোনও ভিত্তি আছে বলে আমার মনে হয় না। আপনি কি বলতে চান তা হলে এডুকেশন, অর্গানিজেশন, ক্যাপিটাল—এসবের মূল্য নেই এগ্রিকালচারে? এই যে–
—আছে, সেকেন্ডারি—
—তবে চাষার ছেলে ভিন্ন কোনও শিক্ষিত লোক কখনও ওসবে যাবে না?…কারণ ইট ইজ নট ব্রেড ইন হিজ বোন্? অদ্ভুত কথা আপনার আমার সঙ্গে কেম্বুিজে একজন আইরিশ ছাত্র পড়ত-লম্বা লম্বা চুল মাথায়, সুন্দর চেহারা, ধরনধারনে টু পোয়েট। হয়তো সারারাত জেগে হল্লা করছে, একটা বেহালা নিয়ে বাজাচ্ছে—আবার হয়তো দেখুন সারাদিন পড়ছে, বসে কি লিখছেনয় তো ভাবছে—ডিগ্রি নিয়ে চলে গেল বেরিয়ে কানাডায়—গবর্নমেন্ট হোমস্টেড ল্যান্ডে জংলী জমি নিলে-ছোট্ট একটা কাঠের কুঁড়েঘরে সেই দুর্ধর্ষ শীতের মধ্যে তিন-চার বৎসর কাটালে হোমস্টেড ল্যান্ডের নিয়ম হচ্ছে টাইট হবার আগে পাঁচ বৎসর জমির ওপব বাস করা চাই–থেকে জমি পরিষ্কার করলে, নিজের হাতে রোজ জমি সাফ করে—লোকজন নেই, দুশো একর জমি, ভাবুন কতদিনে–
ওদিকে একদলের মধ্যে আলোচনা বেশ ঘনাইয়া আসিল। একজন কে বলিয়া উঠিল—এসব মর্যালিটি, আপনি যা বলছেন, সেকেলে হয়ে পড়েছে—এটা তো মানেন যে, ওসব তৈবি হয়েছে বিশেষ কোনও সামাজিক অবস্থায়, সমাজকে বা ইনডিভিজুয়ালকে প্রোটেকশান দেবার জন্যে, সুতরাং–
-বটে, তাহলে সবাই সুবিধাবাদী আপনারা। নর্ম্যাটিভ ভ্যালু বলে কোনও কিছুর স্থান নেই দুনিয়ায়?…ধরুন যদি–
অপু খুব খুশি হইল। কলিকাতার বড়োলোকর বাড়ির পার্টিতে সে নিমন্ত্রিত হইয়া আসিয়াছে, তাহা ছাড়া শিক্ষিত বিলাতফেরত দলের মধ্যে এভাবে। নাটক-নভেলে পড়িয়াছিল বটে, কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতা কখনও হয় নাই। সে অতীব খুশির সহিত চারিধারে চাহিয়া একবার দেখিল মার্বেলের বড়ো ইলেকট্রিক ল্যাম্প কড়ি হইতে ঝুলিতেছে, সুন্দর ফুলকাটা ছিটের কাপড়ে ঢাকা কৌচ, সোফা, দামি আয়না-বড়ো বড়ো গোলাপ, মোরাদাবাদের পিতলের গোলাপদানি। নিজের বসিবার কোঁচখানা সে দু-একবার অপরের অলক্ষিতে টিপিয়া দেখিল। তাহা ছাড়া এ ধরনের কথাবার্তা—এই তো সে চায়! কোথায় সে ছিল পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরের ছেলে—তিন ক্রোশ পথ হাঁটিয়া মাম্জোয়ানের স্কুলে পড়িতে যাইত, সে এখন কোথায় আসিয়া পড়িয়াছে! এ-ধরনের একটা উৎসবের মধ্যে তাহার উপস্থিতি ও পাঁচজনের একজন হইয়া বসিবার আত্মপ্রসাদে ঘরের তাবৎ উপকরণ ও অনুষ্ঠানকে যেন সে সারা দেহ-মন দ্বারা উপভোগ করিতেছিল।
