অপু মনে মনে ভাবে—মা আর বাঁচবে না—বেশি দিন। কেমন যেন-কেমন-কি করে থাকব মা মারা গেলে?
অনেক বেলা পড়িয়া যায়–
জানালার পাশেই একটা আতা গাছ। আতা ফুলের মিষ্টি ভুরভুবে গন্ধ বৈকালের বাতাসে। একটু পোড়ড়া জমি। এক ঢিবি সুরকি। একটা চারা জামরুল গাছ। পুরোনো বাড়ির দেওয়ালের ধারে ধারে বনমূলার গাছ। কন্টিকারির ঝাড়। একটা জায়গায় কঞ্চি দিয়া ঘিরিয়া সর্বজয়া শাকের ক্ষেত করিয়াছে।
একটা অদ্ভুত ধরনের মনের ভাব হয় অপুর। কেমন এক ধরনের গভীর বিষাদ…মায়ের এই সব ছোটখাটো আশা, তুচ্ছ সাধ—কত নিষ্ফল।…মা কি ওই শাকের ক্ষেতের শাক খাইতে পারিবে?কালীঘাটের কালীদর্শন করিবে জ্যাঠাইমার বাসায় থাকিয়া!…নিশ্চিন্দিপুরের আমবাগান…
এক ধরনের নির্জনতা-সঙ্গীহীনতার ভাব…মায়ের উপর গভীর করুণা …রাঙা রোদ মিলাইতেছে চারা জামরুল গাছটাতে…সন্ধ্যা ঘনাইতেছে। ছাতারে ও শালিক পাখির দল কিচমিচ ও ঝটাপটি করিতেছে।…।
অপুর চোখে জল আসিল…কি অদ্ভুত নির্জনতা-মাখানো সন্ধ্যাটা! মুখে হাসিয়া সস্নেহে মায়ের গায়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিল,—আচ্ছা, মা, বড়ো বৌয়ের সঙ্গে বাজি রেখেছিলে কি নিয়ে বলল না-বললে না তো সেদিন?…
ছুটি ফুরাইলে অপু বাড়ি হইতে রওনা হইল।
স্টেশনে আসিয়া কিন্তু ট্রেন পাইল না, গহনার নৌকা আসিতে অত্যন্ত দেরি হইয়াছে, ট্রেন আধ ঘণ্টা পূর্বে ছাড়িয়া গিয়াছে।
সর্বজয়া ছেলের বাড়ি হইতে যাইবার দিনটাতে অন্যমনস্ক থাকিবার জন্য কাপড়, বালিশের ওয়াড় সাজিমাটি দিয়া সিদ্ধ করিয়া বাঁশবনের ডোবার জলে কাচিতে নামিয়াছে—সন্ধ্যার কিছু পূর্বে অপু বাড়ির দাওয়ায় জিনিসপত্র নামাইয়া ছুটিয়া ডোবার ধারে গিয়া পিছন হইতে ডাকিল,-মা!…
সর্বজয়া ভুলিয়া থাকিবার জন্য দুপুর হইতে কাপড় সিদ্ধ লইয়া ব্যস্ত আছে, চমকিয়া পিছন দিকে চাহিয়া আনন্দ-মিশ্রিত সুরে বলে,—তুই!-যাওয়া হল না?
অপু হাসিমুখে বলিল,-গাড়ি পাওয়া গেল না—এসো বাড়ি–
বাঁশবনের ছায়ায় মায়ের মুখে সেদিন যে অপূর্ব আনন্দের ও তৃপ্তির ছাপ পড়িয়াছিল, অপু পূর্বে কোনও দিন তাহা দেখে নাই-বহুকাল পর্যন্ত মায়ের এ মুখখানা তাহার মনে ছিল। সেদিন রাত্রে দু-জনে নানা কথা! অপু আবার ছেলেবেলাকার গল্প শুনিতে চায় মার মুখে—সর্বজয়া লজ্জিত সুরে বলে-হ্যাঁ, আমার আবার গল্প!…সেসব ছেলেবয়সের গল্প-বুঝি এখন শুনে তোর ভালো লাগবে? অপুকে আর সর্বজয়া বুঝিতে পারে না—এ সে ছোট্ট অপু নয়, সে ঠোঁট ফুলাইলেই সর্বজয়া বুঝিত ছেলে কি চাহিতেছে…এ কলেজের ছেলে, তরুণ অপু, এর মন, মতিগতি, আশা আকাঙক্ষা—সর্বজয়ার অভিজ্ঞতার বাহিরে অপু বলেনা মা, তুমি সেই ছেলেবেলার শ্যামলঙ্কার গল্পটা করো। সর্বজয়া বলে,—তা আবার কি শুনবি—তুই বরং তোর বইয়ের একটা গল্প বল্ক ত ভালো গল্প তো পড়িস?…
পরদিন সে কলিকাতায় ফিরিল।
কলেজ সেই দিনই প্রথম খুলিয়াছে, প্রমোশন পাওয়া ছেলেদের তালিকা বাহির হইয়াছে, নোটিশ বোর্ডের কাছে রথযাত্রার ভিড়—সে অধীর আগ্রহে ভিড় ঠেলিয়া নিজের নামটা আছে কিনা দেখিতে গেল।
আছে। দু-তিনবার বেশ ভালো করিয়া দেখিল। আরও আশ্চর্য এই যে, পাশেই যে সব ছেলে পাশ করিয়াছে অথচ বেতন বাকি তাহার দরুন প্রমোশন পায় নাই, তাহাদের একটা তালিকা দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু তাহার মধ্যে অপুর নাম নাই, অথচ অপু জানে তাহারই সর্বাপেক্ষা বেশি বেতন বাকি।
সে ব্যাপারটা বুঝিতে না পারিয়া ভিড়ের বাহিরে আসিল। কেমন করিয়া এরূপ অসম্ভব সম্ভব হইল, নানাদিক হইতে বুঝিবার চেষ্টা করিয়াও তকন কিছু ঠাহর করিতে পারিল না।
দু-তিনদিন পরে তাহার এক সহপাঠী নিজের প্রমোশন বন্ধ হওয়ার কারণ জানিতে অফিসঘরে কেরানীর কাছে গেল, সে-ও গেল সঙ্গে। হেড ক্লার্ক বলিল—এ কি ছেলের হাতের মোয়া হে ছোকরা! কত রোল?…পরে একখানা বাঁধানো খাতা খুলিয়া আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিল—এই দ্যাখো রোল টেনলাল কালির মার্কা মারা রয়েছে—দু-মাসের মাইনে বাকি-মাইনে শোধ না দিলে প্রমোশন দেওয়া হবে না, প্রিন্সিপালের কাছে যাও, আমি আর কি করবো?
অপু তাড়াতাড়ি ঝুঁকিয়া পড়িয়া দেখিতে গেল—তাহার রোল নম্বর কুড়ি—একই পাতায়। দেখিল অনেক ছেলের নামের সঙ্গে সঙ্গে কালিতে ডি লেখা আছে অর্থাৎ ডিফল্টার—মাহিনা দেয় নাই। সঙ্গে সঙ্গে নামের উলটাদিকে মন্তব্যের ঘরে কোন্ কোন্ মাসের মাহিনা বাকি তাহা লেখা আছে। কিন্তু তাহার নামটাতে কোন কিছু দাগ বা আঁচড় নাই—একেবারে পরিষ্কার মুক্তার মতো হাতের লেখা জুলজুল করিতেছে—রায় অপূর্বকুমার-লাল কালির একটা বিন্দু পর্যন্ত নাই…
ঘটনা হয়তো খুব সামান্য, কিছুই না-হয়তো একটা সম্পূর্ণ কমের ভুল, না হয় কেরানীর হিসাবের ভুল, কিন্তু অপুর মনে ঘটনাটা গভীর রেখাপাত করিল।
মনে আছে—অনেকদিন আগে ছেলেবেলায় তাহার দিদি যেবার মারা গিয়াছিল, সেবার শীতের দিনে বৈকালে নদীর ধারে বসিয়া ভাবিত, দিদি কি নরকে গিয়াছে? সেখানকার বর্ণনা সে মহাভারতে পড়িয়াছিল, ঘোর অন্ধকার নরকে শত শত বিকটাকার পাখি ও তাহাদের চেয়েও বিকটাকার যমদুতের হাতে পড়িয়া তাহার দিদির কি অবস্থা হইতেছে! কথাটা মনে আসিতেই বুকের কাছটায় কি একটা আটকাইয়া যেন গলা বন্ধ হইয়া আসিত—চোখের জলে কাশবন শিমুলগাছ ঝাপসা হইয়া আসিত, কি জানি কেন, সে তাহার হাস্যমুখী দিদির সঙ্গে মহাভারতেক্ত নরকের পারিপার্শ্বিক অবস্থার যেন কোন মতেই খাপ খাইয়াইতে পারিত না। তাহার মন বলিত, নানাদিদি সেখানে নাই—সে জায়গা দিদির জন্য নয়।
