বাসায় আসিয়া ছাদের উপর বসিল। একখানা খারা কুড়াইয়া আনিয়া ভাবিল—আচ্ছা, দেখি দিকি কোন্ পিঠটা পড়ে? পরে নিশ্চিন্দিপুরে বাল্যে দিদির কাছে যেমন শিখিয়াছিল, সেইভাবে চোখ বুজিয়া খারাটা ঘুড়িয়া ফেলিয়া দেখিল—একবার-দুবারকলিকাতা ছাড়িয়া যাওয়ার দিকটাই পড়ে। তৃতীয়বার ফেলিয়া দেখিতে তাহার সাহস হইল না।
বাল্যকাল হইতে নিশ্চিন্দিপুরের বিশালাক্ষী দেবীর উপর তাহার অসীম শ্রদ্ধা। করুণাময়ী দেবীর কথা কত সে শুনিয়াছে, সে তো তার গ্রামের ছেলে-কলিকাতায় কি তার শক্তি খাটে না?
পরীক্ষা হইবার দিনকয়েক পরে একদিন অনিল তাহাকে জানাইল সায়েন্স সেকশনের মধ্যে সে গণিত ও বস্তুবিজ্ঞানে প্রথম হইয়াছে, প্রফেসরের বাড়ি গিয়া নম্বর জানিয়া আসিয়াছে। অপু শুনিয়া আন্তরিক সুখী হইল, অনিলকে সে ভারি ভালোবাসে, সত্যিকার চবিত্রবান বুদ্ধিমান ও উদারমতি ছাত্র। অনিলের যে জিনিসটা তাহার ভালো লাগে না, সেটা তাহার অপরকে তীব্রভাবে আক্রমণ ও সমালোচনা করিবার একটা দুর্দমনীয় প্রবৃত্তি। কিন্তু এ পর্যন্ত কোন তুচ্ছ কাজে বা জিনিসে অপু তাহার আসক্তি দেখে নাই-কোনও ছোট কথা, কি সুবিধার কথা, কি বাজে খোশগল্প তাহার মুখে শোনে নাই।
অপু দেখিয়াছে সব সময় অনিলের মনে একটা চাঞ্চল্য, একটা অতৃপ্তি—তাহার অধীরে মন মহাভারতের বকপী ধর্মরাজের মতো সব সময়ই ফাদিয়া বসিয়া আছেকা চ বার্তা?
অপুর সহিত এইজন্যেই অনিলের মিলিয়াছিল ভালো। দুজনের আশা আকাঙক্ষা, প্রবৃত্তি এক ধরনের। অপুর বাংলা ও ইংরেজি লেখা খুব ভালো, কবিতা-প্রবন্ধ, মায় একখানা উপন্যাস পর্যন্ত লিখিয়াছে। দু-তিনখানা বাঁধানো খাতা ভর্তি—লেখা এমন কিছু নয়, গল্পগুলি ছেলেমানুষি ধরনের উচ্ছ্বাসে ভরা, কবিতা-রবি ঠাকুরের নকল, উপন্যাসখানাতে-জলদস্যুর দল, প্রেম, আত্মদান, কিছুই বাদ যায় নাই কিন্তু এইগুলি পড়িয়াই অনিল সম্প্রতি অপুর আরও ভক্ত হইয়া উঠিয়াছে।
সপ্তাহের শেষে দুজনে বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াইতে গেল। একটা ঝিলের ধারের ঘন সবুজ লম্বা লম্বা ঘাসের মধ্যে বসিয়া অনিল বন্ধুকে একটা সুসংবাদ দিল। বাগানে আসিয়া গাছের ছায়ায় এইভাবে বসিয়া বলিবে বলিয়াই এতক্ষণ অপেক্ষায় ছিল। তাহার বাবার এক বন্ধু তাহাকে খুব ভালোবাসেন, বড়বনীর অভ্রের খনির তিনি ছিলেন একজন অংশীদার, তিনি গত পরীক্ষার ফলে অনিলের উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া নিজের খরচে বিদেশে পাঠাইতে চাহিতেছেন, আই.এসসি.-টা পাস দিলেই সোজা বিলাত বা ফ্রান্স।
কেমব্রিজে কি ইম্পিরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে পড়ব, রাদারফোর্ড আছেন, টমসন আছেন—এঁদের সব দুবেলা দেখতে পাওয়া একটা পুণ্য-যুদ্ধ থামলে জার্মানিতে যাব, মস্ত জাত-বিরাট ভাইটালিটি—গয়টে, অস্টওয়ালডের দেশ-ওখানে কি আর না যাব?
অনিল অপুর বিদেশে যাইবার টান জানে-বলিল, আপনাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করব। নাহয় দু-জনে আমেরিকায় চলে যাব–আমি সব ঠিক করব দেখবেন।
অনিলের প্রভাব যেমন অপুর জীবনে বিস্তার লাভ করিতেছিল, সঙ্গে সঙ্গে অপুর চরিত্রের পবিত্রতা, মনের ছেলেমানুষি ও ভাবগ্রাহিতা অনিলের কঠোর সমালোচনা ও অযথা আক্রমণপ্রবৃত্তিকে অনেকটা সংযত করিয়া তুলিতেছিল। দূরের পিপাসা অপুর আরও অনেক বেশি, অনেক উদ্দাম-কলিকাতার ধোঁয়াভরা, সংকীর্ণ, ভ্যাপসা-গন্ধ সিওয়ার্ড ডিচের ভিতর হইতে বাহির হইয়া হঠাৎ যেন একটা উদার প্রান্তর, জ্যোৎস্নামাখা মুক্ত আকাশ, পাখিদের আনন্দভরা পক্ষ-সংগীতের, একটা বন-প্রান্তের রহস্যের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় অপুর কথার সুরে, জীবন-পিপাসু নবীন চোখের দৃষ্টিতে, অন্তত অনিলের তো মনে হয়।
কোন্ পথে যাওয়া হইবে সে কথা উঠিল। অপু উৎসাহে অনিলের কাছে ঘেঁষিয়া বলিল–এসো একটা প্যাক্ট করি—দেখি হাত? এসো আমরা কখনো কেরানীগিরি করব না, পয়সা পয়সা করব না কখখনো সামান্য জিনিসে ভুলব না কখনও-ব্যাস?…পরে মাটিতে একটা ঘুষি মারিয়া বলিল-খুব বড় কিছু একটা করব জীবনে।
অনিল সাধারণত অপুর মতো নিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া উঠে না, তবুও আজ উৎসাহের মুখে অনেক কথা বলিয়া ফেলিল, বিলাতে পড়া শেষ করিয়া সে আমেরিকায় যাইবে, জাপান হইয়া দেশে ফিরিবে। বিদেশ হইতে ফিরিয়া সারাজীবন বৈজ্ঞানিক গবেষণা লইয়াই থাকিবে।
অপু বলিল—যখন দেশে ছিলাম, তখন আমার একখানা ‘প্রাকৃতিক ভূগোল’ বলে ছেঁড়া, পুরোনো বই ছিল—তাতে লেখা ছিল, এমন সব নক্ষত্র আছে, যাদের আলো আজও এসে পৃথিবীতে পেীছয় নি, সে-সব এত দূরে-মনে আছে, সন্ধ্যের সময় একটা নদীতে নৌকা ছেড়ে দিয়ে নৌকার ওপর বসে সে কথা ভাবতাম, ওপারে একটা কদম গাছ ছিল, তার মাথাতে একটা তারা উঠত সকলের আগে, তারাটার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখতাম—কি যে একটা ভাব হত মনে! একটা mystery. একটা uplift-এর ভাব—ছেলেমানুষ তখন, সে-সব বুঝতাম না, কিন্তু সেই থেকে যখনই মনে দুঃখ হয়েছে, কি কোনও ছোট কাজে গিয়েছে, তখনই আকাশের নক্ষত্রদের দিকে চাইলেই আবার ছেলেবেলার সেই uplift-এর ভাবটা, একটা joy, বুঝলে? একটা অদ্ভুত transcendental joy–সে ভাই মুখে তোমাকে–
বেলা পড়িলে দু-জনে স্টিমারে কলিকাতায় ফিরিল।
পরদিন কলেজের কমনরুমে অনেকক্ষণ আবার সেই কথা।
কলেজ হইতে উৎফুল্ল মনে বাহির হইয়া অনিল প্রথমে দোকানে এক কাপ চা খাইল, পরে ফুটপাতের ধারে দাঁড়াইয়া একটুখানি ভাবিল, কালীঘাটে মাসির বাড়ি যাওয়ার কথা আছে, এখন যাইবে কিনা। একখানা বই কিনিবার জন্য একবার কলেজ স্ট্রীটেও যাওয়া দরকার। কোথায় আগে যায়? অপূর্ব একমাত্র ছেলে, যার কথা তার সব সময় মনে হয়। যে কোনরূপে হউক অপূর্বকে সে নিশ্চয়ই বিদেশ দেখাইবে।
