প্রীতি অপ্রসন্ন মুখে বলিল, ওটা আমার দাদুমণির দেওয়া বার্থ-ডে গিফট ছিল—
ইহার পর আর কিনিয়া আনিবার প্রস্তাবটা উত্থাপিত করা যায় না, মনে মনে ভাবিল, কাল থেকে ছেড়ে দেবো।এখানে আর চলবে না।
কি একটা ছুটির পরদিন সে পড়াইতে গিয়াছে, প্রীতি জিজ্ঞাসা করিল, কাল যে আসেন নি?
অপু বলিল, কাল ছিল ছুটির দিনটা—তাই আর আসি নি।
প্রীতি ফট করিয়া বলিয়া বসিল—কেন, কাল তো আমাদের সরকার, বাইরের দু-জন চাকর, ড্রাইভার সব এসেছিল? আমার পড়াশুনো কিছু হল না, আজ ডিটেন্ করে রাখলে পাঁচটা
অবধি।
অপুর হঠাৎ বড়ো রাগ হইল, দুঃখও হইল। খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, আমি তোমাদের সরকার কি রাঁধুনীঠাকুর তো নই, প্রীতি! কাল স্কুল কলেজ সব বন্ধ ছিল, এজন্য ভাবলাম আজ যাব না। আমার যদি ভুলই হয়ে থাকে-তোমার সেই রকম মাস্টার রেখো যিনি এখানে বাজার-সরকারের মতো থাকবেন। আমি কাল থেকে আর আসব না বলে যাচ্ছি।
বাড়ির বাহিরে আসিয়া মনে হইল—দেওয়ানপুরের নির্মলাদের কথা। তাহারাও তো অবস্থাপন্ন, তাহাদের বাড়িতেও সে প্রাইভেট মাস্টার ছিল, কিন্তু সেখানে সে ছিল বাড়ির ছেলের মতো-নির্মলার মা দেখিতেন ছেলের চোখে, নির্মলা দেখিত ভাইয়ের চোখে—সে স্নেহ কি পথেঘাটে সুলভ? নির্মলার মতো মমতাময়ীকে তখন সে চিনিয়াও চেনে নাই, আজ নতুন করিয়া তাহাকে আর চিনিয়া লাভ কি? আর লীলা? সে কথা ভাবিতেই বুকের ভিতরটা যেন কেমন করিয়া উঠিল–যাক সে সব কথা।
হাতের টাকায় কিছুদিন চলিল। ইতিমধ্যে কলেজে একটা বড়ো ঘটনা হইয়া গেল, প্রণব লেখাপড়া ছাড়িয়া কি নাকি দেশের কাজ করিতে চলিয়া গেল। সকলে বলিল, সে এনার্কিস্ট দলে যোগ দিয়াছে।
প্রণব চলিয়া যাওয়ার মাসখানেক পর একদিন অপু হোটেলে খাইতে গিয়া দেখিল, সুন্দরঠাকুর হোটেলওয়ালার মুখ ভার-ভার। দু-তিন মাসের টাকা বাকি, পাওনাদার আর কতদিন শোনে? আজ সে স্পষ্ট জানাইল, দেনা শোধ না করিলে আর সে খাইতে পাইবে না। বলিল-বাবু, অন্য খদ্দের হলে মাসের পয়লাটি যেতে দিই নেওই কৃক্টোবাবু খায়, ওদের পাটের কলের হপ্তাটি পেলে দিয়ে দেয়—তুমি বলে আমি কিছু বলছি না—দু-মাসের ওপর আজ নিয়ে সাত দিন। যাক আর পারব না, আপুনি আর আসবেন না-আমার ভাত একজন ভদ্রনোকের ছেলে খেয়েছে ভাবব, আর কি করব?
কথাগুলি খুব ন্যায্য এবং আদৌ অসংগত নয়, কিন্তু খাইতে গিয়া এরুপ বুঢ় প্রত্যাখ্যানে অপুর চোখে জল আসিল। তাহার তো একদিনও ইচ্ছা ছিল না যে, ঠাকুরকে সে ফাঁকি দিবে, কিন্তু সেই প্রীতির টিউশনিটা ছাড়িয়া দেওয়ার পর আজ দুই-তিন মাস একেবারে নিরুপায় অবস্থায় ঘুরিতেছে যে!
বিপদের উপর বিপদ। দিন-দুই পরে কলেজে দিয়া দেখিল নোটিশ বোর্ডে লিখিয়া দিয়াছে, যাহাদের মাহিনা বাকি আছে, এক সপ্তাহের মধ্যে শোধ না করিলে কাহাকেও বার্ষিক পরীক্ষা দিতে দেওয়া হইবে না। অপু চক্ষে অন্ধকার দেখিল। প্রায় গোটা এক বৎসরের মাহিনাই যে তাহার বাকি!—মাত্র মাস-দুইয়ের মাহিনা দেওয়া আছে—সেই প্রথম দিকে একবার, আর প্রীতির টিউশনির টাকা হইতে একবার—তাহার পর হইতে খাওয়াই জোটে না তো কলেজের মাহিনা! দশ মাসেব বেতন ছটাকা হিসাবে ষাট টাকা বাকি। কোন দিক হইতে একটা কলঙ্কধরা নিকেলের সিকিও আসিবার সুবিধা নাই যাহার, ষাট টাকা সে এক সপ্তাহের মধ্যে কোথা হইতে জোগাড় করিবে? হয়তো তাহাকে পরীক্ষা দিতে দিবে না, গ্রীষ্মের ছুটির পর সেকেন্ড ইয়ারে উঠিতে দিবে না, সারা বছরের কষ্ট ও পরিশ্রম সব ব্যর্থ নিরর্থক হইয়া যাইবে।
কলেজ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া সন্ধ্যার সময় সে হাত-খরচের পয়সা হইতে চাউল ও আলু কিনিয়া আনিয়া থাকিবার ঘরের সামনের বারান্দাতে রান্নার জোগাড় করিল। হোটেলে খাওয়া বন্ধ হইবার পর হইতে আজ কয়দিন নিজে রাঁধিয়া খাইতেছে। হিসাব করিয়া দেখিয়াছে ইহাতে খুব সস্তায় হয়, কাঠ কিনিতে হয় না। নিচের কারখানার মিস্ত্রিদের ঘর হইতে কাঠের চেঁচ ও টুকরা কুড়াইয়া আনে, পাচ-ছয় পয়সায় খাওয়া-দাওয়া হয়। আলুভাতে ডিমভাতে আর ভাত। ভাত চড়াইয়া ডাক দিল-ও বহুবহু নিয়ে এসো, আমার হয়ে গেল বলে-ছোট কঁসিটাও এনো
কারখানার দারোয়ান শ্যুদত্ত তেওয়ারীর বৌ একখানা বড়ো পিতলের থালা ও কাসি লইয়া উপরে আসিল—এক লোটা জল ও গোটাকতক কাঁচা লঙ্কাও আনিল।
থালা বাসন নাই বলিয়া সে-ই দুই বেলা থালা আনিয়া দেয়। হাসিমুখে বলিল, মছলিকা তরকারি হম নেহি ছুঁয়ে গা বাবুজি
-কোথায় তোমার মছলি?—ও শুধু আলু–একটু হলুদবাটা এনে দ্যাও না বহু? বোজ বোজ আলুভাতে ভালো লাগে না–
বহুকে ভালো বলিতে হইবে, রোজ উচ্ছিষ্ট থালা নামাইয়া লইয়া যায়, নিজে মাজিয়া লয় হিন্দুস্থানী ব্রাহ্মণ যাহা কখনও করে না—অপু বাধা দিয়াছিল, বহু বলে, তুম তো হামারে লেড়কাকে বরাবর হোগে বাবুজী ইসমে ক্যা হ্যায়?–
দিন কতক পর মায়ের একটা চিঠি আসিল, হঠাৎ পিছলাইয়া পড়িয়া সর্বজয়ার পায়ে বড়ো লাগিয়াছে, পয়সার কষ্ট যাইতেছে। মায়ের অভাবের খবর পাইলে অপু বড়ো ব্যস্ত হইয়া উঠে, মায়ের নানা কাল্পনিক দুঃখের চিন্তায় তাহার মনকে অস্থির করিয়া তোলে, হয়তো আজ পয়সার অভাবে মায়ের খাওয়া হইল না, হয়তো কেহ দেখিতেছে না, মা আজ দু-দিন উপবাস করিয়া আছে, এইসব নানা ভাবনা আসিয়া জোটে, নিজের আলুভাতে ভাতও যেন গলা দিয়া নামিতে চায় না।
