বিস্ময়কে যাঁহারা বলিয়াছেন Mother of philosophy, তাহারা একটু কম বলেন। বিস্ময়ই আসল Philosophy, বাকিটা তাহার অর্থসংগতি মাত্র।
তিনটার পর সুরেশ বাহির হইয়া আসিল। সে হাই তুলিয়া বলিল–কাল রাত্রে ছিল নাইটডিউটি, চোখ মোটে বোজে নিতাই একটু গড়িয়ে নিলাম—চলো, মাঠে ক্যালকাটা টিমের হকি খেলা আছে—একটু দেখে আসা যাক–
অপু মনে মনে সুরেশদাকে ঘুমের জন্য অপরাধী ঠাওর করিবার জন্য লজ্জিত হইল। সারারাত কাল বেচারি ঘুমায় নাই—তাহার ঘুম আসা সম্পূর্ণ স্বাভাবিকই তো!…
সে বলিল—আমি মাঠে যাবো না সুরেশদা, কাল এগজামিন আছে, পড়া তৈরি হয় নি মোটে—আমি যাই ইয়ে-জেঠিমার সঙ্গে একবার দেখা করে গেলে হতো
সুরেশ বলিল—হ্যাঁ হ্যাঁ—বেশ তো—এসো না—
অপু সুরেশের সঙ্গে সংকুচিত ভাবে বাড়ির মধ্যে ঢুকিল। সুরেশের মা ঘরের মধ্যে বসিয়াছিলেন–সুরেশ গিয়া বলিল-এ সেই অপূর্ব মা–নিশ্চিন্দপুরের হরিকাকার ছেলে–তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে
অপূর্ব পায়ের ধুলা লইয়া প্রণাম করিল—সুরেশের কথায় ভাবে তাহার মনে হইল, সে যে এতক্ষণ আসিয়া বাহিরের ঘরে বসিয়া আছে সে কথা সুরেশ বাড়ির মধ্যে আদৌ বলে নাই।
জেঠিমার মাথার চুল অনেক পাকিয়া গিয়াছে বলিয়া অপুর মনে হইল। অপুর প্রণামের উত্তরে তিনি বলিলেন, এসো-এসো–থাক, থাক্-কলকাতায় কি করো?
অপু ইতিপূর্বে কখনও জেঠিমার সম্মুখে কথা বলিতে পারিত না। গম্ভীর ও গর্বিত (যেটুকু সে ধরিতে পারিত না) চালচলনের জন্য জেঠিমাকে সে ভয় করিত। আনাড়ি ও অগোছালো সুরে বলিল, এই এখানে পড়ি, কলেজে পড়ি।
জেঠিমা যেন একটু বিস্মিত হইলেন। বলিলেন, কলেজে পড়? ম্যাট্রিক পাশ দিয়েছ?
—আর বছর ম্যাট্রিক পাশ করেছি-
-তোমার বাবা কোথায়?—তোমরা তো সেই কাশী চলে গিয়েছিলে, না?
–বাবা তো নেই—তিনি তো কাশীতেই…
তারপর অপু সংক্ষেপে বলিল সব কথা। এই সময়ে পাশের ঘর হইতে একটি বাইশ-তেইশ বছরের তরুণী এ ঘরে ঢুকিতেই অপু বলিয়া উঠিল, অতসীদি না?…
অতসী অনেক বড়ো হইয়াছে, তাহাকে চেনা যায় না। সে অপুকে চিনিতে পারিল, বলি, অপূর্ব কখন এলে?
আর একটি মেয়ে ও-ঘর হইতে আসিয়া দোরের কাছে দাঁড়াইল। পনেরো যোল বৎসর বয়স হইবে, বেশ সুশ্রী, বড়ো বড়ো চোখ। কথা বলিতে বলিতে সেদিকে চোখ পড়াতে অপু দেখিল, মেয়েটি তাহার মুখের দিকে চাহিয়া আছে। খানিকটা পরে অতসী বলিল—মণি, দেখে এসে তো দিদি, কুশিকাটাগুলো ও-ঘরের বিছানায় ফেলে এসেছি কি না?
মেয়েটি চলিয়া গেল এবং একটু পরেই আবার দুয়ারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। বলিল-না বড়দি, দেখলাম না তো?
জেঠিমা অল্প দুই চারিটা কথার পরই কোথায় উঠিয়া গেলেন। অতসী অনেকক্ষণ কথাবার্তা কহিল। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করিল। তারপর সেও চলিয়া গেল। অপু ভাবিতেছিল, এবার সে উঠিবে কিনা। কেহই ঘরে নাই, এ সময় ওঠাটা কি উচিত হইবে?…ক্ষুধা একবার উঠিয়া পড়িয়া গিয়াছে, এখন ক্ষুধা আর নাই, তবে গা ঝিম্ ঝিম্ করিতেছে। যাওয়ার কথা কাহাকেও ডাকিয়া বলিয়া যাইবে?…
দোরের কাছে গিয়া সে দেখিল সেই মেয়েটি বারান্দা দিয়া ও-ঘর হইতে বাহির হইয়া সিঁড়ির দিকে যাইতেছে—আর কেহ কোথাও নাই, তাহাকেই না বলিলে চলে না। উদ্দেশে ডাকিয়া বলিল—এই গিয়ে—আমি যাচ্ছি, আমার আবার কাজ–
মেয়েটি তাহার দিকে ফিরিয়া বলিল—চলে যাবেন? দাঁড়ান, পিসিমাকে ডাকি—চা খেয়েছেন?
অপু বলিল-চা তা-থাক্, বরং অন্য একদিন—
মেয়েটি বলিল—বসুন, বসুন-দাঁড়ান চা আনি—পিসিমাকে ডাকি দাঁড়ান।
কিন্তু খানিকটা পরে মেয়েটিই এক পেয়ালা চা ও একটা প্লেটে কিছু হালুয়া আনিয়া তাহার সামনে বসিল। অপু ক্ষুধার মুখে হালুযাটুকু গোগ্রাসে গিলিল। গরম চা খাইতে গিয়া প্রথম চুমুকে মুখ পুড়াইয়া ফেলিয়া ঢালিয়া ঢালিয়া খাইতে লাগিল।
মেয়েটি বলিল—আপনি বুঝি ওদের খুড়তুতো ভাই? থাক প্লেটটা এখানেই–আর একটু হালুয়া আনব?
—হালুয়া? …না–ইয়ে তেমন ক্ষিদে নেই, সুরেশদার বাবা আমার জ্যাঠামশাই হতেন, জ্ঞাতি-সম্পর্ক
এই সময় অতসী ঘরে ঢোকাতে মেয়েটি চায়ের বাটি ও প্লেট লইযা চলিয়া গেল।
সন্ধ্যার পর ঠাকুরবাড়িতে খাইয়া অনেক রাত্রে সে নিজের থাকিবার স্থানে ফিরিয়া দেখিল আরও একজন তোক সেখানে রাত্রের জন্য আশ্রয় লইয়াছে। মাঝে মাঝে এরকম আসে, কারখানার লোকের দু-একজন আত্মীয়স্বজন মাঝে মাঝে আসে ও দু-চার দিন থাকিয়া যায়। একে ছোট ঘর, থাকিবার কষ্ট, তাহাতে লোক বাড়িলে এইটুকু ঘরের মধ্যে তিষ্ঠানো দায় হইয়া উঠে। পরনের কাপড় এমন ময়লা যে, ঘরের বাতাসে একটা অপ্রীতিকর গন্ধ। অপু সব সহ্য করিতে পারে, এক ঘরে এ-ধরনের নোংরা স্বভাবের লোকের ভিড়ের মধ্যে শুইতে পারে না, জীবনে সে তা কখনও করে নাই ইহা তাহার অসহ্য। কোথায় রাত্রে আসিয়া নির্জনে একটু পড়াশুনা করিবে-না, ইহাদের বকবকের চোটে সে ঘর ছাড়িয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। নতুন লোকটি বড়োবাজারের আলুপোস্তায় আলুর চালান সইয়া আসে—হুগলী জেলার কোন জায়গা হইতে, অপু জানে, আরও একবার আসিয়াছিল। লোকটি বলিল, কোথায় যান, ও মশায়? আবার বেরোন না-কি?
অপু বলিল, এইখানটাতে দাঁড়িয়ে-বেজায় গরম আজ…
একটু পরে লোকটা বলিয়া উঠিলা, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিছানাটা কি মহাশয়ের? আসুন, আসুন, সরিয়ে ন্যান্ একটু—এঘঁকোর জলটা গেল গড়িয়ে পড়ে—দুত্তোর-নাঃ–
