স্কুলটা কোথায় ছিল চিনিতে পারিল না। একজন লোককে বলিল-মশায়, এখানে শুভঙ্করী পাঠশালা বলে একটা স্কুল কোথায় ছিল জানেন?
–শুভঙ্করী পাঠশালা? কই না, আমি তো এই গলিতে দশ বছর আছি—
—তাতে হবে না, সম্ভবত বাইশ-তেইশ বছর আগেকার কথা।
—ও বসাক মশায়, বসাক মশায়, আসুন একবারটি এদিকে। ওঁকে জিজ্ঞেস করুন, ইনি চল্লিশ বছরের খবর বলতে পারবেন।
বসাক মশায় প্রশ্ন শুনিয়া বলিলেন—বিলক্ষণ! তা আর জানিনে! ওই হরগোবিন্দ শেঠের বাড়িতে স্কুলটা ছিল। ঢুকেই নিচুমতো তো! দুধারে উঁচু রোয়াক?
অপু বলিল–হাঁ-হাঁ ঠিক। সামনে একটা চৌবাচ্চা–
—ঠিক ঠিক–আমাদের আনন্দবাবুর স্কুল। আনন্দবাবু মারাও গিয়েছেন আজ আঠারো-উনিশ বছর। স্কুলও তার সঙ্গে সঙ্গে গিয়েছে। আপনি এসব জানলেন কি করে?
–আমি পড়তুম ছেলেবেলায়। তারপর কাশী থেকে চলে যাই।
একটা বাড়ি খুঁজিয়া বাহির করিল। তাদের বাড়ি মোড়েই। ইহারা তখন সোলার ফুল ও টোপর তৈরি করিয়া বেচিত। অপু বাড়িটার মধ্যে ঢুকিয়া গেল। গৃহিণীকে চিনিল-বলিল, আমাকে চিনতে পারেন? ওই গলির মধ্যে থাকতুম ছেলেবেলায় আমার বাবা মারা গেলেন?–গৃহিণী চিনিতে পারিলেন। বসিতে দিলেন, বলিলেন—তোমার মা কেমন আছেন?
অপু বলল—তাহার মা বাঁচিয়া নাই।
–আহা! বড়ো ভালোমানুষ ছিল! তোমার মার হাতে-সোডার বোতল খুলতে গিয়ে হাত কেটে গিয়েছিল, মনে আছে?
অপু হাসিয়া বলিল—খুব মনে আছে, বাবার অসুখের সময়!
গৃহিণীর ডাকে বত্রিশ-তেত্রিশ বছরের বিধবা মেয়ে আসিল। বলিলেন—একে মনে আছে?…
–আপনার মেয়ে না? উনি কি জন্যে রোজ বিকেলে জানলার ধারে খাটে শুয়ে কাদতেন! তা মনে আছে।
—ঠিক বাবা, তোমার সব মনে আছে দেখছি। আমার প্রথম ছেলে তখন বছরখানেক মারা গিয়েছে—তোমরা যখন এখানে এলে। তার জন্যই কাঁদত। আহা, সে ছেলে আজ বাঁচলে চল্লিশ বছর বয়েস হত।
একবার মণিকর্ণিকার ঘাটে গেল। পিতার নশ্বর দেহের রেণু-মেশানো পবিত্র মণিকর্ণিকা! বৈকালে বহুক্ষণ দশাশ্বমেধ ঘাটে বসিয়া কাটাইল।
ওই সেই শীতলা মন্দির—ওরই সামনে বাবার কথকতা হইত সে-সব দিনে-সঙ্গে সঙ্গে সেই বৃদ্ধ বাঙাল কথক ঠাকুরের কথা মনে হইয়া অপুর মন উদাস হইয়া গেল। কোন্ জাদুবলে তাহার বালকহৃদয়েব দুর্লভ স্নেহটুকু সেই বৃদ্ধ চুরি করিয়াছিল—এখন এতকাল পরেও তাহার উপর অপুর সে স্নেহ অক্ষুন্ন আছে—আজ তাহা সে বুঝিল।
পরদিন সকালে দশাশ্বমেধ ঘাটে সে স্নান করিতে নামিতেছে, হঠাৎ তাহার চোখে পড়িল একজন বৃদ্ধা, একটা পিতলের ঘটিতে গঙ্গাজল ভর্তি করিয়া লইয়া স্নান সারিয়া উঠিতেছেন—চাহিয়া চাহিয়া দেখিয়া সে চিনিল-কলিকাতার সেই জ্যাঠাইমা! সুরেশের মা!…বহুকাল সে আর জ্যাঠাইমাদের বাড়ি যায় নাই, সেই নববর্ষের দিনটার অপমানের পর আর কখনও না। সে আগাইয়া গিয়া পায়ের ধুলা লইয়া প্রণাম করিয়া বলিল—চিনতে পারেন জ্যাঠাইমা? আপনারা কাশীতে আছেন নাকি আজকাল!-বৃদ্ধা খানিকক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন—নিশ্চিন্দিপুরের হরি ঠাকুরপোর ছেলে না?—এসো, এসো, চিরজীবী হও বাবা–আর বাবা চোখেও ভালো দেখিনেতার ওপর দেখো এই বয়সে একা বিদেশে পড়ে থাকা–ভারী ঘটিটা কি নিয়ে উঠতে পারি? ভাড়াটেদের মেয়ে জলটুকু বয়ে দেয়–তো তার আজ তিনদিন জ্বর–
–ও, আপনিই বুঝি একলা কাশীবাস–সুনীলদাদারা কোথায়?
বৃদ্ধা ভারী ঘটিটা ঘাটের রানার উপর নামাইয়া বলিলেন—সব কলকাতায়, আমায় দিয়েছে ভেন্ন করে বাবা! ভালো ঘর দেখে বিয়ে দিলুম সুনীলের, গুপ্তিপাড়ার মুখুজ্যে—ওমা, বৌ এসে বাবা সংসারের হল কাল-সে সব বলব এখন বাবাতিন-এর-এক ব্রজেশ্বরের গলি-মন্দিরের ঠিক বাঁ গায়ে একা থাকি, কারুর সঙ্গে দেখাশুনো হয় না। সুরেশ এসেছিল, পুজোর সময় দুদিন ছিল। থাকতে পারে না–তুমি এসো বাবা, আমার বাসায় আজ বিকেলে, অবিশ্যি অবিশ্যি।
অপু বলিল-দাঁড়ান জ্যাঠাইমা, চট করে ডুব দিয়ে নি, আপনি ঘটিটা ওখানে রাখুন, পেীছে দিচ্ছি।
-না বাবা, থাক, আমিই নিয়ে যাচ্ছি, তুমি বললে এই যথেষ্ট হল–বেঁচে থাকো।
তবুও অপু শুনিল না, স্নান সারিয়া ঘটি হাতে জ্যাঠাইমার সঙ্গে তাহার বাসায় গেল। ছোট্ট একতলা ঘরে থাকেন—পশ্চিম দিকের ঘরে জ্যাঠাইমা থাকেন, পাশের ঘরে আর একজন প্রৌঢ়া থাকেন—তাহার বাড়ি ঢাকা। অন্য ঘরগুলি একটি বাঙালি গৃহস্থ ভাড়া লইয়াছেন, যাঁদের হোট মেয়ের কথা জ্যাঠাইমা বলিতেছিলেন।
তিনি বলিলেন—সুনীল আমার তেমন ছেলে না। ওই যে হাড়হাভাতে ছোটলোকের ঘরের মেয়ে এনেছিলাম, সংসারটাসুদ্ধ উচ্ছন্ন দিলে। কি থেকে শুরু হল শোন। ও বহুর শেষ মাসে নবান্ন করেছি, ঠাকুরঘরের বারকোশে নবান্ন মেখে ঠাকুরদের নিবেদন করে রেখে দিইছি। দুই নাতিকে ডাকছি, ভাবলাম ওদের একটু একটু নবান্ন মুখে দি। বৌটা এমন বদমায়েস, ছেলেদের আমার ঘরে আসতে দিলে না—শিখিয়ে দিয়েছে, ও-ঘরে যাস নি, নবান্নর চাল খেলে নাকি ওদের পেট কামড়াবে। তাই আমি বললাম, বলি হ্যাঁ গা বৌমা, আমি কি ওদের নতুন চাল খাইয়ে মেরে ফেলার মতলব করছি? তা শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, সেকেলে তোক ছেলেপিলে মানুষ করার কি বোঝে? আমার ছেলে আমি যা ভালো বুঝব করব, উনি যেন তার ওপর কথা না কইতে আসেন। এই সব নিয়ে ঝগড়া শুরু, তারপর দেখি ছেলেও তো বৌমার হয়ে কথা বলে। তখন আমি বললাম, আমাকে কাশী পাঠিয়ে দাও, আমি তোমার সংসারে থাকব না! বৌ রাত্রে কানে কি মন্তর দিয়েছে, ছেলে দেখি তাতেই রাজি। তাহলেই বোঝ বাবা, এত করে মানুষ করে শেষে কিনা আমার কপালে—জ্যাঠাইমার দুই চোখ দিয়া টপ টপ করিয়া জল পড়িতে লাগিল।
