হ্যাঁ, সে হারাইয়া যাইবে! ছাড়িয়া দিলে সে সব জায়গায় যাইতে পারে, পৃথিবীর সর্বত্র একা যাইতে পারে, বাবার কথা শুনিলে তাহার হাসি পায়।
পরদিন সকালে উঠিয়া কাজল প্রথমে ঔষধ আনিল। বাবার জন্য ফুটপাতের দোকান হইতে খেজুর ও কমলালেবু কিনিল। একটু দূরের দুধের দোকান হইতে জ্বাল দেওয়া গরম দুধও কিনিয়া আনিল। দুধেব ঘটি হাতে ছেলে ফিরিলে অপু বলিল—কথা শুনবি নে খোকা? দুধ আনতে গেলি রাস্তা পার হয়ে সেই আমহার্স্ট স্ট্রীটের দোকানে? এখন গাড়ি ঘোড়ার বড়ো ভিড়~-যেয়ো না বাবাদে বাকি পয়সা।
খুচরা পয়সা না থাকায় ছেলেকে সকালে ঔষধের দামের জন্য একটা টাকা দিযাছিল, কাজল টাকাটা ভাঙাইয়া এগুলি কিনিয়াছে, নিজে মাত্র এক পয়সাব বেগুনি খাইয়াছিল, (তেলেভাজা খাবাবেব উপব তাহার বেজায় লোভ) বাকি পয়সা বাবার হাতে ফেবত দিল।
অপু বলিল—একখানা পাউরুটি নিয়ে আয়, ওই দুধেব আমি অতটা তত খাবো না, তুই অর্ধেকটা রুটি দিয়ে খা—
-না বাবা, এই তো কাছেই হোটেল, আমি ওখানে গিয়ে–
–না, না, সেও তো রাস্তা পার হয়ে, আপিসের সময় এখন, মোটবেব ভিড়, এবেলা ওই খাও বাবা, আমি তোমাকে ওবেলা দুটো বেঁধে দেবো।
কিন্তু দুপুরের পর অপুর আবার খুব জ্বর আসিল। রাত্রের দিকে এত বাড়িল, আব কোনও সংজ্ঞা রহিল না। কাজল দোরে চাবি দিয়া ছুটিয়া আবার ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তাব আবার আসিলেন, মাথায় জলপটির ব্যবস্থা দিলেন, ঔষধও দিলেন। জিজ্ঞাসা কবিলেন—এখানে—আর কেউ থাকে না? তোমরা দুজনে মোটে? অসুখ যদি বাড়ে, তবে বাড়িতে টেলিগ্রাম করে দিতে হবে। দেশে কে আছে?
—দেশে কেউ নেই। আমার মা তো নেই।…আমি আর বাবা শুধু–
-মুশকিল। তুমি ছেলেমানুষ কি করবে? হাসপাতালে দিতে হবে তা হলে, দেখি আজ রাতটা–
কাজলের প্রাণ উড়িয়া গেল। হাসপাতাল! সে শুনিয়াছে সেখানে গেলে মানুষ আর ফেরে না! বাবার অসুখ কি এত বেশি যে, হাসপাতালে পাঠাইতে হইবে?
ডাক্তার চলিয়া গেল। বাবা শুইয়া আছে—শিয়রের কাছে আধভাঙা ডালিম, গোটাকতক লেবুর কোয়া। পালং শাকের গোড়া বাবা খাইতে ভালোবাসে, বাজার হইতে সেদিন পালং শাকের গোড়া আনিয়াছিল, ঘরের কোণে চুপড়িতে শুকাইতেছে-বাবা যদি আর না ওঠে? না রাঁধে? কাজলের গলায় কিসের একটা ডেলা ঠেলিয়া উঠিল। চোখ ফাটিয়া জল আসিল-ছোট বারান্দাটার এক কোণে গিয়া সে আকুল হইয়া নিঃশব্দে কাঁদিতে লাগিল। ভগবান বাবাকে সারাইয়া তোল, পালং শাকের গোড়া বাবাকে খাইতে না দেখিলে সে বুক ফাটিয়া মরিয়া যাইবে-ভগবান, বাবাকে ভালো করিয়া দাও।
মেজেতে তাহার পড়িবার মাদুরটা পাতিয়া সে শুইয়া পড়িল। ঘরে লণ্ঠনটা জ্বালিয়া রাখিল–একবার নাড়িয়া দেখিল কতটা তেল আছে, সারারাত জ্বলিবে কি না। অন্ধকারে তাহার বড়ো ভয়বিশেষ বাবা আজ নড়ে না, চড়ে না, কথাও বলে না।
দেয়ালে কিসের সব যেন ছায়া! কাজল চক্ষু বুজিল।
মাসদেড় হইল অপু সারিয়া উঠিয়াছে। হাসপাতালে যাইতে হয় নাই, এই গলিরই মধ্যে বাঁড়জ্যেরা বেশ সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ, তাহাদের এক ছেলে ভালো ডাক্তার। তিনি অপুর বাড়িওয়ালার মুখে সব শুনিয়া নিজে দেখিতে আসিলেন ইনজেকশনের ব্যবস্থা করিলেন, শুক্রবার লোক দিলেন, কাজলকে নিজের বাড়ি হইতে খাওয়াইয়া আনিলেন। উহাদের বাড়ি সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ আলাপ হইয়া গয়াছে।
চৈত্রের প্রথম। চাকুরি অনেক খুজিয়াও মিলিল না। তবে আজকাল লিখিয়া কিছু আয় হয়।
সকালে একদিন অপু মেজেতে মাদুর পাতিয়া বসিয়া কাজলকে পড়াইতেছে, একজন কুড়িবাইশ বছরের চোখে-চশমা ছেলে দোরের কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিল—আজ্ঞে আসতে পারি? আপনারই নাম অপূর্বাবু? নমস্কার–
–আসুন, বসুন বসুন। কোথেকে আসছেন?
—আজ্ঞে, আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। আপনার বই পড়ে আপনার সঙ্গে দেখা কবতে এলুম। আমার অনেক বন্ধুবান্ধব সবাই এত মুগ্ধ হয়েছে, তাই আপনার ঠিকানা নিয়ে।
অপু খুব খুশি হইল-বই পড়িয়া এত ভালো লাগিয়াছে যে, বাড়ি খুঁজিয়া দেখা কবিতে আসিয়াছে একজন শিক্ষিত তরুণ যুবক। এ তার জীবনে এই প্রথম।
ছেলেটি চারিদিকে চাহিয়া বলিল—আজ্ঞে, ইয়ে, এই ঘরটাতে আপনি থাকেন বুঝি?
অপু একটু সংকুচিত হইয়া পড়িল, ঘরের আসবাবপত্র অতি হীন, ছেঁড়া মাদুরে পিতাপুত্রে বসিয়া পড়িতেছে। খানিকটা আগে কাজল ও সে দুজনে মুড়ি খাইয়াছে, মেঝের খানিকটাতে তার চিহ্ন। সে ছেলের ঘাড়ে সব দোষটা চাপাইয়া সলজ্জ সুবে বলিল—তুই এমন দুষ্ট হয়ে উঠছিস খোকা, রোজ রোজ তোকে বলি খেয়ে অমন করে ছড়াস নেতা তোর—আর বাটিটা অমন দোরের গোড়ায়
কাজল এ অকারণ তিরস্কারের হেতু না বুঝিয়া কাদফাদ মুখে বলিল—আমি কই বাবা, তুমিই তো বাটিটাতে মুড়ি
-আচ্ছা, আচ্ছা, থাম, লেখ, বানানগুলো লিখে ফে।
যুবকটি বলিল—আমাদের মধ্যে আপনার বই নিয়ে খুব আলোচনা–আজ্ঞে হ্যাঁ। ওবেলা বাড়িতে থাকবেন? বিভাবরী কাগজের এডিটার শ্যামাচরণবাবু আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, আমি—আরও তিন-চারজন সেই সঙ্গে আসব।—তিনটে? আচ্ছা, তিনটেতেই ভালো।
আরও খানিক কথাবার্তার পর যুবক বিদায় লইলে অপু ছেলের দিকে চাহিয়া বলিল,উস্-স্-স্-স্, থোকা?
ছেলে ঠোঁট ফুলাইয়া বলিল—আমি আর তোমার সঙ্গে কথা কব না বাবা—
–না বাপ আমার, লক্ষ্মী আমার, রাগ কোরো না। কিন্তু কি করা যায় বল তো?
—কি বাবা?
—তুই এক্ষুনি ওঠ, পড়া থাক এবেলা, এই ঘরটা ঝেড়ে বেশ ভালো করে সাজাতে হবেআর ওই তোর ছেঁড়া জামাটা তক্তপোশের নিচে লুকিয়ে রাখ দিকি।—ওবেলা বিভাবরীর সম্পাদক আসবে–
